এ টি এম মোস্তফা কামাল
রাষ্ট্রের শাসন ও বিচার বিভাগকে স্বাধীন ভাবে কাজ করতে দিতে হবে। তাঁদের কাজে কোন রাজনৈতিক আমলার/রাজনৈতিক নেতার/প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর/ প্রভাবশালী এনজিও ব্যক্তিত্বের হস্তক্ষেপ থাকা চলবে না। রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা সঠিকভাবে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গের-বিভাগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও দায়িত্ব রয়েছে। প্রত্যেকটা অঙ্গ ও বিভাগকে স্বাধীনভাবে তাদের স্বীয় দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে হবে। স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে- একটি অঙ্গ আরেকটি অঙ্গের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু দলীয়করণের ফলে রাষ্ট্র নামক রেলগাড়ীটা একবার লাইনচ্যুত হয়ে গেলে সেখানেই তাকে অবস্থান করতে হবে। একই সংগে রাষ্ট্রকে আর একটি বিষয় অত্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে সেটি হচ্ছে এমপিদের একমাত্র অধিক্ষেত্র হচ্ছে সংসদ ভবন- তাঁদেরকে কোন ভাবেই এই অধিক্ষেত্র অতিক্রম করতে দেয়া যাবে না।
১৯৯০ সাল অবধি বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থা মোটামুটি একটা ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চলেছিল। ১৯৯০ সালের পূর্ব পর্যন্ত সংসদ সদস্যরা তাঁদের অধিক্ষেত্রের বাহিরে কর্মকান্ড সম্প্রসারণের কোন সুযোগ পায়নি। কিন্তু, ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর সংসদ সদস্যরা ভাল নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত দাবী তুলে তাঁদের অধিক্ষেত্রের বাইরে হস্তক্ষেপ করা শুরু করেছিলেন। প্রথম তাঁরা হস্তক্ষেপ করা শুরু করেছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার বদলীর তদবির দিয়ে। নুরুল হুদা তখন সংস্থাপন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর আমলে একজন উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে একাধিক বার বদলী করে ও বদলীকৃত কর্মস্থলে যোগদান করানো বেশ কঠিন হয়ে পড়েছিল- কারণ ছিল স্থানীয় সংসদ সদস্যের তদবীর। বিএনপি’র সে সময়কার শাসনামলে দলীয় করণের পরিমাণ যদি ধরে নিই ১০ শতাংশ ছিল ১৯৯৬ পরবর্তী আওয়ামী শাসনামলে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ২০ শতাংশে। ২ হাজার সাল অবধি দলীয়করণ রাষ্ট্র যন্ত্রকে খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারেনি। ২০০১ পরবর্তী বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময় সেটা বৃদ্ধি পেয়ে যদি দাঁড়ায় ৫০ শতাংশে ২০০৯ পরবর্তী আওয়ামী শাসনামলে তা বৃদ্ধি পেয়ে শতভাগে উন্নীত হয়। ২০০৯ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত সময়ে দলীয়করণের প্রভাবে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান প্রচন্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
২০০১ পরবর্তী সময়কালে সরকারী প্রশাসনযন্ত্র মোটামুটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। এক দলে ছিল বিএনপিপন্থী কর্মকর্তাদের অবস্থান আর অন্য দলে আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তাদের অবস্থান। বিএনপি’র শাসনামলে আওয়ামী পন্থী কর্মকর্তারা পোস্টিং-পদোন্নতি জটিলতাসহ নানামুখী হয়রানির শিকার হতেন আর আওয়ামী শাসনামলে বিএনপিপন্থী কর্মকর্তারা একই ধরণের হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। আওয়ামী শাসনকাল অনেক বেশী দীর্ঘায়িত হবার কারণে বিএনপিপন্থী কর্মকর্তাদের হয়রানির সময়কালও দীর্ঘায়িত হয়েছিল। দলীয় করণের এই সময়কালে সরকারের অনেক সিনিয়র কর্মকর্তাকে সুদীর্ঘকাল বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে কর্মহীন অবস্থায় বেতন ভাতা উত্তোলন করতে হয়েছিল। পদোন্নতি বঞ্চিত হয়ে অনেক কর্মকর্তাকে মানষিক যন্ত্রণায় ভুগতে হয়েছিল।
আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, ২০০৯ পরবর্তী আওয়ামী শাসনামলে আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তাদের মধ্যে যারা পদোন্নতি পেতেন তাঁরা বঙ্গবন্ধুর মাজার জিয়ারত করে শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিতে ভুলতেন না। সরকারী কর্মকর্তাদের মাঝে বিষয়টা এমনভাবে উপস্থাপিত হতো যেন শেখ হাসিনার করুণাতে তাঁদের পদোন্নতি হয়েছে-ওটা তাঁদের প্রাপ্য ছিলো না। জুনিয়র- সিনিয়র সকল কর্মকর্তার মাঝে এমন একটা ভাবের উদ্রেক হতো- শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ ছাড়া তাঁদের যেন কোন গতি নেই। এতে সরকারী কর্মকর্তাদের মাঝে আওয়ামী লীগের সংগে সংশ্লিষ্ট হবার প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এতে করে যারা ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী-এমপিদের নকট আত্মসমর্পণ করে নিজেদেরকে তাঁদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর সঁপে দিয়েছিলেন তাঁরা ভালো পোস্টিং-অন্যায্য পদোন্নতি ভাগিয়ে নিতে পেরেছিলেন। বিনিময়ে তাঁরা মন্ত্রী-এমপিদের এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতা কর্মীদের অন্যায্য আবদার রক্ষায় সিপাহশালার-এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তবে ভালো পোস্টিং-পদোন্নতি তো সবার ভাগ্যে জোটেনি- কিন্তু সবাই একটা জিনিস বুঝে নিয়েছিল ক্ষমতাসীন দলের আনুকূল্য ছাড়া এবং ক্ষমতাসীন দলের আনুকূল্য প্রাপ্ত উর্ধবতন কর্মকর্তাদের তোষামোদ করা ছাড়া পোস্টিংসহ সরকারী চাকুরীতে টিকে থাকা অনেকটা অসম্ভব। তাই অধস্তন কর্মকর্তা কর্মচারীরাও ক্ষমতাসীন দলের চাওয়া পাওয়া এবং সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কাছে অবনত মস্তকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
স্বৈরতান্ত্রিক শাসনামলে দলীয় করণের মাত্রা যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হলো তখন সচিবালয় নির্দেশমালা শতভাগ উপেক্ষিত হতে থাকলো- দেশে প্রচলিত অন্যান্য আইন কানুনকেও সচিব এবং সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অবজ্ঞা করতে শুরু করে দিলেন। অনেক মন্ত্রণালয়/বিভাগে সচিবের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে নথি উপস্থাপন করতে হোত এবং সচিবকে খসড়া দেখিয়ে নিয়ে নথি উপস্থাপন করা লাগতো। নোটের পরিচ্ছন্ন কপিতে স্বাক্ষর করে দেয়া ছাড়া কেউ ভিন্নরুপ মন্তব্য করার কোন সুযোগ ছিলো না। প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী-সংসদ সদস্যরা সচিবদেরকে ক্ষমতাসীন দলের একজন প্রভাবশালী নেতার মতোই বিবেচনা করতে থাকলেন। সচিবরাও অধস্তনদেরকে এটুকু বুঝানোর চেষ্টা করতেন নম্বর এক-এর সংগে তাঁদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। এরূপ অবস্থায় আইন কানুন নির্ভর প্রশাসন ব্যবস্থার পরিবর্তে রাজনৈতিক আমলাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা নির্ভর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল।
স্বৈরতান্ত্রিক শাসনামলে সচিবালয়ের কর্মপরিবেশ কেমন ছিল? সচিবরা তখন ১১-১২টার দিকে অফিসে আসতেন। তাঁদের ভাবখানা এমন যে সকাল বেলা যেন প্রধানমন্ত্রীর সংগে দেখা করে তাঁর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা নিয়ে তাঁরা অফিসে পদার্পণ করেছেন। সচিবের আগমনের ২০-৩০ মিনিট পূর্বে জুনিয়র কর্মকর্তারা তাঁদের অফিসে হাজির হতেন আর সচিব আসার সংগে সংগে তাঁরা সবাই সচিবের কক্ষে প্রবেশ করে উনার তোষামদিতে এক থেকে দেড় ঘন্টা সময় কাটিয়ে দিতেন। কোন কর্মকর্তার জন্মদিন থাকলে সেটাও সে সময়ে উদযাপিত হয়ে যেত। তারপর সচিব কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিতে স্বাক্ষর করে লাঞ্চ সেরে ৩টা সাড়ে ৩টার দিকে অফিস ত্যাগ করতেন। সচিবের প্রস্থানের পর অন্যান্য কর্মকর্তাদেরকেও অফিস কক্ষে পাওয়া দুষ্কর ছিল।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, শেখ হাসিনার শাসনামলকে দীর্ঘায়িত করার ক্ষেত্রে অরাজনৈতিক সিভিল আমলাদের একটা শক্তিশালী ভূমিকা ছিল। সরকারের প্রভাবশালী কর্মকর্তারা ভাবতো- রেজিম চেঞ্জ হলে তাঁদেরকে নানা রকম বেকায়দায় পড়তে হবে- তাই শেখ হাসিনার সরকারকে যে কোন পন্থায় ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে তাঁদের প্রচেষ্টার কমতি ছিল না। দলীয়করণের প্রভাবে সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা আইন কানুনের পরিবর্তে দলীয় আনুগত্যকেই বেশী প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তাতে ব্যুরোক্রেসীর কর্মদক্ষতায় বিপর্যয় নেমে আসে।
পুলিশ বাহিনীর দলীয় করণের ফলে দেশের আইন শৃংখলা পরিস্থিতি অনেকটাই ভেংগে পড়েছিল। শেখ হাসিনা পুলিশ বাহিনীকে অনেকাংশে দলীয় বাহিনী হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ করে নিয়েছিলেন। রাজপথে বিএনপি’র সরকার বিরোধী আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগের সমর্থনে অতিমাত্রায় বাড়াবাড়ি এবং জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্রলীগের পক্ষে পুলিশ সদস্যদের অংশ গ্রহণের কারণে আন্দোলনকারী বিশাল জনতার রোষানলে পড়ে তাঁদেরকে মারাত্মক ধরণের ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তাছাড়া শেখ হাসিনার পতনের পর পুলিশকে বড় ধরণের ইমেজ সঙ্কটে পড়তে হয়েছিল। র্যাবকে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের হত্যা গুমের কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল। সামরিক বাহিনীকেও দলীয় করণের বাতাস স্পর্শ করেছিল বলেই সেনা প্রধানের জ্ঞাতসারে ইতিহাসের জঘন্যতম পিলখানা হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছিল। ডিজিএফআই এর তত্ত্বাবধানে আয়নাঘর নির্যাতন চালানো হয়েছিল। বিচার বিভাগও দলীয়করণের প্রভাবমুক্ত থাকতে পারেনি বিধায় বিএনপি’র চেয়ারপার্সন ও তিন বারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বানোয়াট অজুহাতে দীর্ঘ সময় কারাবরণ করতে হয়েছিল।
ব্যক্তি স্বার্থ, দলীয় স্বার্থ, ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের স্বার্থকে কখনোই রাষ্ট্রীয় স্বার্থের উর্ধেব স্থান দেয়া যাবে না। দলীয়করণকে ইবোলা এবং করোণা ভাইরাসের সংগে তুলনা করা যেতে পারে। দলীয়করণের ফলে দলীয় স্বার্থ সিদ্ধি হতে পারে কিন্তু তাতে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ উপেক্ষিত হবে- এটা নিশ্চিত। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো দলীয় গঠনতন্ত্রে কিংবা দলীয় কর্মসূচীতে রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের উর্ধ্বে স্থান দিয়ে থাকে- কিন্তু ক্ষমতার মসনদে আরোহণ করে তাঁরাই ব্যক্তি স্বার্থ ও দলীয় স্বার্থকে অধিক প্রাধান্য দিয়ে থাকে। প্রত্যেক রাজনীতিবিদ নির্বাচনের সময় কিংবা নির্বাচনের আগে/পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা- থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা- ডিসি-এসপি’র সহযোগিতা পেতে অতি আগ্রহী। এতে বুঝতে বাকি থাকে না যে তাঁরা জনসমর্থন-এর চেয়ে কর্মকর্তাদের সহযোগিতা বেশি প্রত্যাশা করে থাকেন।
দলীয়করণের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় দেশের সিভিল প্রশাসন-পুলিশ বাহিনি-সমারিক বাহিনীর শৃঙ্খলা প্রচন্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্ত- এরূপ শাসন ব্যবস্থা দিয়ে দেশ সম্মুখপানে এগিয়ে যেতে পারে না। এ থেকে রাষ্ট্রকে মুক্তি দিতে চাইলে প্রশাসন-পুলিশ- সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের যৌথভাবে ঘোষণা দিতে হবে যে এদেশে দলীয়করণ চলবে না। ক্ষমতাসীন সরকারের প্রধানমন্ত্রীকেও ঘোষণা দিতে হবে তাঁর দল ক্ষমতায় থাকাকালে দলীয়করণকে তাঁরা সর্বোতভাবে বর্জন করবেন এবং সংসদ সদস্যরদেরকে তাঁদের অধিক্ষেত্র অতিক্রম করতে দেয়া হবে না। সেটা করা সম্ভব হলে দেশ ঘানা-উগান্ডার চেয়ে পিছিয়ে না থেকে কমপক্ষে মালয়েশিয়ার পর্যায়ে উন্নীত হবে।
প্রতিবেশী ভারতের শাসনব্যবস্থা আমাদের চাইতেও অনেক উন্নত। ভারতের রাজনৈতিক আমলারা ভারতীয় সিভিল সার্ভিসকে পদানত করতে পুরোমাত্রায় ব্যর্থ হয়েছে। ভারতে দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে- কোন রাজনৈতিক দলের তেমন কোন অভিযোগ নেই। ভারতীয় সিভিল সার্ভিসও অতীত ঐতিহ্যকে কঠিনভাবে আঁকড়ে ধরে রয়েছে। তাঁরা রাজনৈতিক আমলাদের অন্যায্য আবদারকে কোন রূপ পাত্তা দেয়নি।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব ।
