আমার কাগজ ডেস্ক
অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে এক বছরে জ্বালানি তেল আমদানির খরচ ১০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক পেরিয়েছে।
৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (জুলাই-জুন) ১ হাজার ৬৩ কোটি ৫০ লাখ (১০.৬৩ বিলিয়ন) ডলারের জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছে, যা আগের আর্থিক বছরের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে ৫১৩ কোটি ৭৯ লাখ (৫.১৪ বিলিয়ন) ডলার খরচ হয়েছিল। শতাংশ হিসাবে ব্যয় বেড়েছে ১০৭ শতাংশ।
বর্তমান বিনিময় হার (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৮০ পয়সা) হিসাবে টাকার অঙ্কে গত অর্থবছরে জ্বালানি তেল আমদানিতে ১ লাখ ৩১ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা।
বাংলাদেশে কখনোই জ্বালানি তেলে এত অর্থ খরচ হয়নি। এর আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৮৯৮ কোটি ৫০ লাখ (৮.৯৮ বিলিয়ন) ব্যয় হয়েছিল; যা ছিল এতদিন সবচেয়ে বেশি।
ওই আর্থিক বছরে কোভিড মহামারীর প্রাথমিক ধাক্কা কেটে যাওয়ার পর বৈশ্বিক অর্থনীতি ও শিল্পকারখানা সচল হতে শুরু করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও অন্যান্য জ্বালানির চাহিদা হঠাৎ বৃদ্ধি পায়; তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমদানির পরিমাণ ও মূল্যও বেড়ে যায়।
সে কারণেই ২০২০-২১ আর্থিক বছরে জ্বালানি তেল আমদানিতে খরচ প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারে উঠেছিল।
২০২০ সালের মার্চে দেশে দেশে কোভিড প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, তখন সবকিছু বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমতে কমতে একেবারে তলানিতে নেমেছিল। মহামারীর ধাক্কা কাটতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে দামও বাড়তে থাকে। ২০২১ সালের শেষের দিকে প্রতি ব্যারেল তেলে দাম প্রায় ৯০ ডলারে উঠেছিল।
কোভিডের ধকল কাটতে না কাটতেই ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয় রাশিয়া–ইউক্রেইন যুদ্ধ। তার প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। ওই বছরের মার্চে ১৩৯ ডলার অতিক্রম করে।
চাহিদা বৃদ্ধি ও দাম বাড়ার কারণেই ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে জ্বালানি তেল আমদানি ব্যয় বেড়েছিল বলে জানান জ্বালানি বিশ্লেষকরা।
একই কারণে গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় বেড়ে সাড়ে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে শুরু করে; একপর্যায়ে প্রতি ব্যারেল ১২০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। পরে অবশ্য তা কমে ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে। তার আগে অবশ্য কমতে কমতে ৬৫ ডলারে নেমেছিল।
সোমবার (১০ অগাস্ট) বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড (অপরিশোধিত) তেলের দাম ছিল ৮৬ ডলার ৭২ সেন্ট। আর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ছিল ৮১ ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংক সোমবার পণ্য আমদানির সবশেষ যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন) পণ্য আমদানিতে মোট ৭ হাজার ৫২৪ কোটি (৭৫.২৪ বিলিয়ন) ডলার ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে অপরিশোধিত তেল এবং পেট্রোলিয়াম, তেল ও লুব্রিকেন্ট (পিওএল) আমদানিতে ১ হাজার ৬৩ কোটি ৫০ লাখ (১০.৬৩ বিলিয়ন) ডলার ব্যয় হয়েছে বাংলাদেশের।
এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, গত অর্থবছরে আমদানি খাতে মোট যত অর্থ ব্যয় হয়েছে, তার ১৪ দশমিক ১৩ শতাংশ খরচ হয়েছে জ্বালানি তেলে।
২০২৫-২৬ আর্থিক বছরে অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম আমদানির ব্যয় ৯২ শতাংশ বেড়ে ১১৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে পিওএল বাবদ ব্যয় ১০৯ দশমিক ১০ শতাংশ বেড়ে ৯৪৩ কোটি ৬০ লাখ (৯.৪৪ বিলিয়ন) ডলারে দাঁড়িয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে অপরিশোধিত তেল এবং পেট্রোলিয়াম, তেল ও লুব্রিকেন্ট (পিওএল) আমদানিতে মোট ৫ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছিল। যার মধ্যে ৬২ কোটি ৪৫ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছিল অপরিশোধিত তেল আমদানিতে। আর ৪ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল পিওএল আমদানি বাবদ।
গত অর্থবছরে জ্বালানি তেল আমদানিতে রেকর্ড ব্যয় কেন হয়েছে—এ প্রশ্নে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিম গণমাধ্যমকে বলেন, “মূলত দাম বৃদ্ধি ও চাহিদা বাড়ার কারণে এই ব্যয় বেড়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম এখন আবার বাড়তির দিকে; কমবে বলে মনে হচ্ছে না।
“সেক্ষেত্রে আগামী মাসগুলোতে এ খাতে ব্যয় আরও বাড়বে বলে মনে হচ্ছে।”
কিছু দিন আগে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছিল, পেট্টোল পাম্পগুলোতে লম্বা লাইন—এমন পরিস্থিতি এড়াতে সরকারের কী করা উচিৎ?
একে তো যুদ্ধের প্রভাব আছেই, তার উপর বেড়েছে জ্বালানি চাহিদা। ফলে আমদানি ব্যয় রেকর্ড বেড়েছে।
জবাবে ম তামিম বলেন, “আতঙ্কের কারণে ওই পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল। সবাই ভেবেছিল তেল আর পাওয়া যাবে না, সে কারণেই সবাই লাইনে দাঁড়িয়েছিল। অনেকে প্রয়োজনের বেশি কিনে মজুত করেছিল।”
এমন পরিস্থিতি যাতে আর না হয়, সেজন্য বিশ্ব পরিস্থিতি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে কমপক্ষে দেড় মাসের মজুত রাখার পরামর্শ দেন এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান গণমাধ্যমকে বলেন, “প্রতি বছরই তেলের চাহিদা বাড়ে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাজার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে; দাম বেড়ে যায়। সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে তেল আমদানিতে অনেক বেশি অর্থ খরচ হয়েছে।”
দেশে এখন ভোক্তা পর্যায়ে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা; অকটেন ১৪৫, পেট্রোল ১৪০ এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
গত ১ জুন ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা অপরিবর্তিত রেখে অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়েছিল। পরে জুলাই ও অগাস্টেও সেই দাম অপরিবর্তিত রেখেছে সরকার।
কেবল দামে নয়, পরিমাণের দিক দিয়েও জ্বালানি তেল আমদানি ব্যয় বেড়েছে। তবে পরিমাণের দিক দিয়ে গত অর্থবছরের পুরো সময়ে মোট কত জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছে তা প্রকাশ করা হয়নি।
নয় মাসের (জুলাই-মার্চ) তথ্য পাওয়া গেছে। তাতে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ ৫৭ লাখ ৪০ হাজার টন জ্বালানি আমদানি করেছে। ২০২৪-১৫ অর্থবছরের একই সময়ে এই আমদানির পরিমাণ ছিল ৫০ লাখ ৫ হাজার টন।
আমদানিকৃত জ্বালানির তালিকায় রয়েছে ডিজেল, ক্রুড তেল, ফার্নেস তেল, পেট্রোল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও বেস অয়েল।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রাক্কলন অনুযায়ী, গত অর্থবছরে দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা ছিল ৭৪ লাখ টন।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে সব মিলিয়ে ৬২ লাখ ১৫ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছিল, যার মধ্যে ২৪ শতাংশ ছিল অপরিশোধিত তেল। বাকি ৭৬ শতাংশই ছিল পরিশোধিত তেল, যা সরাসরি ব্যবহারযোগ্য।
