এ টি এম মোস্তফা কামাল
সংবিধান মতে সংসদ সদস্য তথা MEMBER OF THE PARLIAMENT এর একমাত্র অধিক্ষেত্র হচ্ছে সংসদ ভবন। রাষ্ট্র পরিচালনায় আইন প্রণয়নের জন্যে তাঁদেরকে নির্বাচিত করা হয়েছে- উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্যে তাঁদেরকে নির্বাচিত করা হয়নি। সংবিধান সংশোধন ব্যতিরেকে তাঁদেরকে উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্যে নিয়োগ করা সঠিক হয়নি। –IT’S A GREAT MISTAKE & amp; DEFECT.
উল্লেখ্য, উপজেলা পরিষদ আইন, ১৯৯৮ এবং উপজেলা পরিষদ আইন, ২০১১ এর ২৫ নং অণুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে-
পরিষদের উপদেষ্টা-
(১) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৫-এর অধীন একক আঞ্চলিক এলাকা হইতে নির্বাচিত সংশ্লিষ্ট সংসদ-সদস্য পরিষদের উপদেষ্টা হইবেন এবং পরিষদ উপদেষ্টার পরামর্শ গ্রহণ করিবে।
(২) সরকারের সহিত কোন বিষয়ে পরিষদের যোগাযোগের ক্ষেত্রে পরিষদকে উক্ত বিষয়টি সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ-সদস্যকে অবহিত রাখিতে হইবে।
২৭(৪)- পরিষদ প্রত্যেক সভার কার্যবিবিরণীর একটি করিয়া অনুলিপি সভা অনুষ্ঠিত হইবার তারিখের ১৪ দিনের মধ্যে সরকারের [ও সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্যের] নিকট প্রেরণ করিতে হইবে।
সংবিধানের কত অণুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার কর্তৃক উপজেলা পরিষদ আইনে এরূপ সংশোধণী এনে সংসদ সদস্যগণকে উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা বানালেন তার উল্লেখ থাকা বাঞ্চনীয় ছিল।
সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত WARRANT OF PRECEDENCE এর ১৩ নং ক্রমিকে থাকা অতি উচ্চ মর্যাদার কোন ব্যক্তি কি WARRANT OF PRECEDENCE এর ২৫ নং ক্রমিকে থাকা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা হতে পারেন? উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান/ উপজেলা পরিষদ কি স্থানীয় সাংসদকে উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা হিসেবে পেতে চেয়েছেন? যদি না চেয়ে থাকেন তাহলে সরকার কেন তাঁকে উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা বানাতে গেলেন? উপজেলা পরিষদ তো উপজেলার সকল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান- উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যানগণ- উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানকে একত্রে বুঝায়- তাঁরা সকলেই তো জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করতে গেলে পরিষদের সভায় উপস্থিত থাকার আবশ্যকতা রয়েছে। আর পরিষদ সভায় উপস্থিত থাকলে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এবং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানগণ তাঁদের নিজস্ব ভ‚মিকা সঠিক ভাবে পালন করতে সক্ষম হবেন না। সাংসদের অভিপ্রায় অনুযায়ী সকল সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে- সাংসদের ভ‚মিকা হয়ে যাবে অনেকটা স্বৈরাচার এর অনুরূপ। এটা উপজেলা পরিষদ সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছে।
উপদেষ্টার এই দায়িত্ব কি সার্বক্ষণিক নাকি খন্ডকালীন সেটার কোন কিছু উল্লেখ নেই। এজন্য তিনি উপজেলা পরিষদ থেকে কোন সন্মানী পাবেন কিনা সেটা ও উল্লেখ করা হয়নি। অন্য সকল ক্ষেত্রে উপদেষ্টার আর্থিক সন্মানীর ব্যবস্থা থাকে কিন্তু সংসদ সদস্যের ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম। বিনা পারিশ্রমিকে উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনে সংসদ সদস্যগণের এতো আগ্রহের হেতু কি?
উল্লেখ্য, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব পদাধিকার বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। তেমনি সংবিধানে সংশোধনী এনে যদি এরূপ ব্যবস্থা করা যায় যে সংসদ সদস্য্যগণ পদাধিকারবলে তাঁর সংসদীয় উপজেলার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। সেক্ষেত্রে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এর পদ নির্বাচনের মাধ্যমে পুরণ করার দরকার
হবে না। সংসদ সদস্যগন এরূপ ব্যবস্থায় সন্মত থাকবেন কিনা সেটা জানতে চাওয়া হলে কতো জন তাতে সন্মতি/অসন্মতি জ্ঞাপণ করে থাকবেন সেটা পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। সরকারী/বেসরকারী সর্বক্ষেত্রে উপদেষ্টার পদমর্যাদা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের (যার উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে তার) পদমর্যাদার নিচেই হয়ে থাকে। যেমন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, প্রধান উপদেষ্টার উপদেষ্টা, বিএনপি’র চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা, কোন কোম্পানীর চেয়ারম্যান/এমডি’র উপদেষ্টা, ব্রাকের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা, ইত্যাদি। সর্বক্ষেত্রে, যাকে উপদেশ/ পরামর্শ দেবার জন্য উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়ে থাকে তার পদমর্যাদা উপদেষ্টার পদমর্যাদার উপরেই হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম হচ্ছে উপজেলা পরিষদের ক্ষেত্রে। উপজেলা পরিষদের ক্ষেত্রে ১২ ধাপ উঁচু পদমর্যাদার সংসদ সদস্যকে উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা বানানো হয়েছে।
কিন্তু তা হতে যাবে কেন? এর উত্তর খুঁজে বের করার আবশ্যকতা রয়েছে। অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে উপদেষ্টার উপদেশ/ পরামর্শ গ্রহণের বিষয়টি প্রায় ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই ঐচ্ছিক অর্থাৎ কর্তৃপক্ষ উপদেষ্টার উপদেশ/ পরামর্শ মেনে চলতে বাধ্য নহেন। কিন্তু উপজেলা পরিষদের ক্ষেত্রে সাংসদের উপদেশ / পরামর্শ মেনে চলতে উপজেলা পরিষদ বাধ্য। শুধু সাংসদ নহেন সাংসদের অনুসারী দলীয় নেতা কর্মীদের কথা শুনতে ও উপজেলা পরিষদ অনেকটা বাধ্য।
কার্যতঃ সাংসদ উপজেলা পরিষদের নির্ধারিত কোন মাসিক সভায় উপস্থিত থাকেন না। তিনি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা প্রকৌশলী, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা কিংবা অন্য যে কোন কর্মকর্তার সংগে টেলিফোনে কিংবা এলাকায় গেলে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে উনার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করে থাকেন। এভাবে যদি উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করা হয়ে থাকে তাহলে তো উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা না হয়ে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এবং উপজেলার অন্যান্য কর্মকর্তাদের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হয়ে থাকে। এভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাংসদকে তার উপদেষ্টা হিসেবে মেনে নিয়ে তাঁর নির্দেশনা মোতাবেক দায়িত্ব পালনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন- উপজেলা পরিষদ আইন সংশোধনীর পূর্বে যেটা অনেকটাই অকল্পনীয় ছিল।
সাংসদের এখন দুটো অধিক্ষেত্র- সংসদ ভবন আর উপজেলা পরিষদ। দুটো অধিক্ষেত্রের মধ্যে কোনটা উনার কাছে অধিক প্রাধান্য পাবে? উনি যদি উপজেলা পরিষদ নিয়ে বেশী ব্যস্ত হয়ে পড়েন তাহলে সংসদীয় কার্যক্রম উনার কাছে হয়ে পড়তে পারে কম গুরুত্বপূর্ণ – অনেকটাই গতানুগতিক।
সংসদীয় কার্যক্রমকে ক্ষতিগ্রস্থ করে উপজেলা পরিষদের কার্যক্রমে অধিক মাত্রায় জড়িয়ে পড়ার কারণে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান স্বাধীনভাবে তার দায়ত্ব পালন করতে পারছেন না। নিকট প্রতিবেশী ভারতে কি একই ধরনের পরিবর্তন সাধন করা হয়েছে? ইউরোপ/ অ্যামেরিকায় কি সাংসদরা স্থানীয় সরকারী প্রতিষ্ঠান সমূহে উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন? যদি না করে থাকেন তাহলে শুধু আমাদের দেশে আমরা সেটা করতে যাব কেন?
সিটি কর্পোরেশন এবং পৌর সভার ক্ষেত্রে কি সাংসদগণ উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন? উপজেলা পরিষদের ক্ষেত্রে যদি সাংসদের উপদেশের অপরিহার্যতা থেকে থাকে তাহলে সিটি কর্পোরেশন কিংবা পৌরসভার ক্ষেত্রে সেরূপ অপরিহার্যতা থাকবে না কেন? স্থানীয় সাংসদকে উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টার দায়িত্ব প্রদানের পর থেকে উপজেলা পরিষদের তহবিল ব্যবস্থাপনায় এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গুনগত মানের উন্নতি সাধিত হয়েছে কিনা সেটা নিরীক্ষা করে দেখার আবশ্যকতা রয়েছে।
বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের সংগে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে চাইলে সংসদ সদস্যগণকে তাঁদের নিজস্ব অধিক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে ব্রতী হওয়ার আবশ্যকতা অনস্বীঃকার্য। দুটো নৌকায় দুই পা রেখে গন্তব্যে পৌছানো অসম্ভব। এক দিকে সংসদীয় কার্যক্রম অন্যদিকে উপজেলা পরিষদের নানাবিধ কার্যক্রমে এক সংগে মনোযোগ দেওয়া অনেকটাই অসম্ভব। প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এবং উপজেলা প্রকৌশলীর কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণে অধিক মাত্রায় আগ্রহী হলে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া অধিক যুক্তিযুক্ত। উপজেলা পরিষদকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দেবার আবশ্যকতা ও রয়েছে। উপজেলা পরিষদ যদি তাদের নিজস্ব কোন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উপদেষ্টা নিয়োগের আবশ্যকতা অনুভব করে থাকেন তাহলে উপজেলা পরিষদে সিদ্ধান্ত গ্রহণক্রমে সুনির্দিষ্ট শর্তাবলী উল্লেখ করে উপদেষ্টা নিয়োগ দিতে পারেন। সর্বোপরি এক জন অতি সন্মানিত সংসদ সদস্যের WARRANT OF PRECEDENCE এ যার অবস্থান ১৩ নং ক্রমিকে তাঁকে তার অবস্থানের বহু নিম্নে অবস্থানকারী কারো উপদেষ্টা বানানোর সিদ্ধান্ত সুবিবেচনা প্রসূত নহে।
উপজেলা পরিষদ সৃষ্টির পর হতে উপজেলা পরিষদের উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্য উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ ছিল এক কোটি টাকার নীচে। অথচ সংসদ সদস্যগণের ইচ্ছামতো সংসদীয় এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের জন্য বরাদ্দের পরিমাণ বাড়িয়ে করা হলো প্রায় ২০ কোটি টাকা। উপজেলার উন্নয়ন অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে উক্ত অর্থ দিয়ে সঠিকভাবে উপজেলার খাল খনন/ বেকার ভাতাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে সাধারণ জনগণের আর্থিক অবস্থার অনেক উন্নয়ন সাধন করা সম্ভব হোত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে উক্ত অর্থের সঠিক ব্যয় নিশ্চিত করা যায়নি। আওয়ামী লীগের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনামলে প্রত্যেক সংসদীয় এলাকার জন্য সর্বমোট কত কোটি টাকার অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল এবং সেই অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় হয়েছে কিনা তা তদন্ত করে দেখার আবশ্যকতা রয়েছে।
সংসদ সদস্যগণকে উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা বানানোর পর থেকে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ উপজেলার কোন কর্মকর্তাই স্বাধীনভাবে তাঁদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। চাঁদাবাজি এবং দূর্নীতি উপজেলার সর্বত্র ব্যাপক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। বিএনপি’র নেতৃত্বে গঠিত নব-নির্বাচিত সরকার দেশ থেকে চাঁদাবাজি এবং দূর্নীতি নির্মূল করতে চাইলে এবং উপজেলা পরিষদকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে চাইলে সংসদ সদস্যকে উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে হবে।
উপজেলায় কোন রাস্তা ঘাট-ব্রীজ কাল্ভার্ট নির্মাণের প্রয়োজনীতা অনুভব করলে সাংসদ কর্তৃক একটা অনানুষ্ঠানিক পত্র লিখে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান/ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করাই যথেষ্ট। সেজন্য কি উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা হবার আবশ্যকতা রয়েছে?
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব।
