বিশেষ প্রতিনিধি
অনেক সরকারি কর্মকর্তারই বিদেশ ভ্রমণের আসক্তি আছে। আর তা যদি হয় সরকারি টাকায় তাহলে তো কোনো কথাই নেই। নানা কৌশলে ইনিয়ে-বিনিয়ে গত ৬৯ দিনে ভ্রমণপিপাসু এমন এক কর্মকর্তাই ছয়টি দেশ সফর করেছেন। বিসিএস (প্রশাসন) ২৪ তম ব্যাচের এই কর্মকর্তার নাম রেবেকা খান। তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব পদে রাজনৈতিক-১ অধিশাখা এবং সীমান্ত শাখার দায়িত্ব পালন করছেন। তার ঘনঘন বিদেশ যাত্রা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের ঊধ্বর্তন কর্মকর্তারাও অস্বস্তিতে আছেন। যদিও তার কিছু সফর রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
বৈশ্বিক আর্থিক সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ নানা কারণে দেশের অর্থনীতি চাপের মুখে আছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মকর্তাদের সব ধরনের বিদেশ ভ্রমণ স্থগিত করা হয়েছে। এরপরও রেবেকা খান নানাভাবে তদবির চালিয়ে বিদেশ সফর অব্যাহত রেখেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, যুগ্মসচিব রেবেকা খানের নামে ছয়টি দেশ সফরের সরকারি আদেশ (জিও) জারি করা হয়েছে। নতুন পণ্য বাজারজাতের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, অভিবাসী পাচার প্রতিরোধ বিষয়ক সেমিনার, বিজিবি–বিএসএফ বৈঠক, আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সমন্বয় সভা ও আইনি সহায়তা বিষয়ক আঞ্চলিক প্রশিক্ষণে অংশ নিতে তার বিদেশ ভ্রমণ অনুমোদনে এসব জিও জারি করা হয়। তিনি গত মে, জুন ও জুলাই মাসে ভারত, চীন, অস্ট্রিয়া, মালদ্বীপ, তুরস্ক ও থাইল্যান্ড ভ্রমণ করেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৮-১১ মে চীন সফর করেন যুগ্মসচিব রেবেকা খান, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ–বিজিবির মহাপরিচালকসহ তিনজনের একটি প্রতিনিধি দল। ওই তিন দিনে তারা দেশটিতে আয়োজিত পণ্য বাজারজাতের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং পণ্য প্রর্দশনী কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এ বিষয়ে গত ৬ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন–৫ শাখা জিও জারি করে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৮–১১ জুন নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত সমন্বয় বিষয়ক মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলনে অংশ নেন রেবেকা খান। গত ২৩ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে জিও জারি হয়।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক দপ্তরের (ইউএনওডিসি) উদ্যোগে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় অভিবাসী পাচার প্রতিরোধ বিষয়ক দুটি বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করতে যান যুগ্মসচিব রেবেকা খান। এর মধ্যে অভিবাসী পাচার সংক্রান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপের ১৩তম সভা গত ২৯-৩০ জুন অনুষ্ঠিত হয়। আর অভিবাসী পাচার প্রতিরোধ বিষয়ক বৈশ্বিক জোটের ঊধ্বর্তন কর্মকর্তাদের সভা গত ১ জুলাই ভিয়েনা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়। এ বিষয়ে গত ২৫ মে মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা-৩ থেকে জিও জারি করা হয়।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, তুরস্কের আন্তালিয়া শহরে গত ২৫–২৬ জুন আন্তর্জাতিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় অংশ নিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলকে পাঠানো হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক-৫ শাখা থেকে এ বিষয়ে গত ১৭ জুন জিও জারি করে তাদের বিদেশ সফর অনুমোদন করা হয়।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন নীতি উন্নয়ন কেন্দ্র (আইসিএমডিপি)-এর আয়োজনে গত ২৫–২৬ জুন গুরুত্বপূর্ণ সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ দমনে বুদাপেস্ট প্রক্রিয়ার অধীন বিভিন্ন কৌশলগত বিষয়ে আলোচনা ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করা হয় ওই বৈঠকে। ওই বৈঠকে পুলিশের বিশেষ শাখার উপমহাপরিদর্শক, যুগ্মসচিব রেবেকা খান এবং এসবির অতিরিক্ত একজন এসপি অংশ নেন।
ডিজিটাল আলামত সংগ্রহে যৌথ আইনি সহায়তা বিষয়ক আঞ্চলিক প্রশিক্ষণে অংশ নিতে মালদ্বীপের রাজধানী মালেতে যান রেবেকা খানসহ চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক কার্যালয় এই প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। গত ২৮ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক-৩ শাখা থেকে এই বিষয়ে জিও জারি করা হয়। মালেতে গত ১৩–১৬ জুলাই এই প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়। এতে আরও অংশ নেন মন্ত্রণালয়েল উপসচিব কে এম ইয়াসির আরাফাত, সিআইডির অতিরিক্ত এসপি ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ডা. মো. আবু সাঈদ মিয়া।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে আরও জানা গেছে, চলতি বছরের ১১–১২ জুন থাইল্যান্ডে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের সাত দেশের আঞ্চলিক জোট- বিমসটেকের ‘সাব-গ্রুপ অন হিউম্যান ট্রাফিকিং’-এর চতুর্থ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন রেবেকা খান। গত ২৬ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (প্রশাসন-৫ শাখা) এই বিষয়ে জিও জারি করে।
অর্থনৈতিক কৃচ্ছতা সাধনের কারণে যেখানে অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে সরকারের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, সেখানে একই ব্যক্তি এতোবার কিসের কারণে বিদেশ সফর করেছেন। এ বিষয়ে অভিজ্ঞ মহল তদন্তের দাবি জানান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব রেবেকা খান আজ বৃহস্পতিবার আমার কাগজকে বলেন, ‘মন্ত্রী ও সচিবের অনুমোদন ছাড়া বর্হিবিশ্বের জিও হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে ছয়টি জিওর মধ্যে দুটি বাতিল করে অন্য কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে, হয়তো সেটি আপনাদের কাছে নেই।’
বিদেশ সফরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি কোনো পিএসআই (প্রাক-জাহাজীকরণ মান যাচাই) ও সরকারি ট্যুর নয়। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য আমি বিজিবির সঙ্গে নয়াদিল্লি এবং বিমসটেক সভায় অংশ নিতে থাইল্যান্ড গিয়েছিলাম। সেখানে রাষ্ট্রের পক্ষে একটি প্রেজেনটেশন দিয়েছিলাম।’
