আমার কাগজ ডেস্ক
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার বক্তব্য ঘিরে জাতীয় সংসদে ব্যাপক হট্টগোল হয়েছে। রুমিন বিএনপি সরকারের সমালোচনা করে বক্তব্য দিলে সরকারি দলের সদস্যরা হইচই-হট্টগোল করে প্রতিবাদ জানান। এ সময় হঠাৎ করেই কিছু সময়ের জন্য সংসদ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রুমিনকে উদ্দেশ করে গালাগাল করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
বুধবার ব্যাংক রেজোল্যুশন (সংশোধন) বিল পাসের আলোচনায় এ ঘটনা ঘটে। হইচই-হট্টগোলে কিছু সময়ের জন্য সংসদের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। একাদশ সংসদে বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সদস্য ছিলেন রুমিন। এবার তিনি স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য।
বিলের আলোচনায় অংশ নিয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘প্রত্যেকটা সরকারের একটা চরিত্র থাকে। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর গ্যাস–বিদ্যুৎ সংকট হবে না, এটা হইতে পারে না। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আবার সারের সংকট হবে না, গরিব কৃষক সারকারখানায় গিয়ে সেটা লুট করবেন না; সেটাও হতে পারে না।’
রুমিনের এমন বক্তব্যে বিএনপির সংসদ সদস্যরা হইচই করে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। রুমিন বলতে থাকেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর দুর্নীতিতে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হবে না, সেটাও হওয়া সম্ভব না, মাননীয় স্পিকার।’
এ সময় বিএনপির সংসদ সদস্যরা আরও বেশি হইচই শুরু করেন। রুমিন বলেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ঋণখেলাপিতে সর্বোচ্চ স্থান অর্জন করবে না, সেটাও হইতে পারে না। সুতরাং বিএনপি ক্ষমতায় আসা মানে ঋণখেলাপিতে সর্বোচ্চ হওয়া, ৬ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার ওপরে ঋণখেলাপি হওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি।’
সরকারি দলের সদস্যদের হট্টগোলের মধ্যে রুমিন বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, এত অসহিষ্ণু সংসদ, মনে হয় যেন আওয়ামী লীগের আমলে ফিরে গেছি আমরা। মজা, মন্দ না। আওয়ামী লীগকে যখন বলতাম, তখন তারাও হট্টগোল করত। এখন বিএনপি একই ধরনের আচরণ করছে। আরও খারাপ আচরণ।’
হইচইয়ের মধ্যেই রুমিন বলতে থাকেন, ‘এই সংসদে বেশির ভাগ সংসদ সদস্য ঋণখেলাপি হিসেবে পরিচিত। নির্বাচনের আগে নামটা কাটানোর জন্য হাইকোর্টে গিয়ে রিট করা, এগুলো আমাদের পুরোনো সংস্কৃতি। এগুলো আমরা বহুত দেখেছি।’
এ সময় রুমিনের জন্য নির্ধারিত সময় শেষ হলে মাইক বন্ধ হয়ে যায়। তবে সংসদে হইচই-হট্টগোল চলতে থাকে। রুমিনও মাইক ছাড়া কথা বলতে থাকেন। স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে অশালীন ভাষায় গালি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করতে থাকেন তিনি। স্পিকার বারবার বসার অনুরোধ জানালেও তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন।
এ সময় এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদও দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে থাকেন। মাইক ছাড়া তাঁকে বলতে শোনা যায়, একজন সংসদ সদস্যকে এভাবে গালি দেওয়া যায় না।
হট্টগোলের মধ্যে সভাপতির আসনে থাকা ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বারবার সংসদ সদস্যদের শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু কেউই থামছিলেন না। চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনিও দাঁড়িয়ে কিছু বলছিলেন। ডেপুটি স্পিকার সব সদস্যকে শান্ত হওয়ার অনুরোধ করেন।
কথা বলার স্বাধীনতা আছে
ডেপুটি স্পিকার বলেন, একজন সদস্য বক্তব্য রাখছেন। তাঁর কথা বলার স্বাধীনতা আছে। কিন্তু অন্য সদস্যরা ওনার বক্তব্যে বাধা প্রদান, সেটা কিন্তু গণতান্ত্রিক রীতিনীতির বাইরে।
রুমিন এ সময়ও দাঁড়িয়ে কিছু বলতে চাইছিলেন। তাঁকে বসার অনুরোধ করেন ডেপুটি স্পিকার।
চিফ হুইপের উদ্দেশে কায়সার কামাল বলেন, ‘সংসদ সদস্যদের প্রত্যেকের এখানে লিবার্টি আছে, তাঁরা তাঁদের বক্তব্য উপস্থাপন করবেন। আপনাদের টার্ন যখন আসে, আপনারা তখন সেটা খণ্ডন করবেন। কিন্তু বক্তব্য প্রদানে বাধা কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়।’
এরপর বিলের আলোচনায় অংশ নেওয়ার জন্য আরেক স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমানকে আহ্বান জানান। তখনো হইচই চলছিল। এ সময় রুমিন ফারহানা ও হান্নান মাসউদকে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে দেখা যায়। স্পিকার তাঁদের বসতে অনুরোধ করেন। এরপর শেখ মুজিবুর রহমান বক্তব্য দেন।
পরে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান দাঁড়িয়ে বলেন, সংসদ সদস্যের বক্তব্য অসংসদীয় হলে সেটা স্পিকার রুলিং দিতে পারেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী জবাব দিতে পারেন।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন,‘ আজকে উনি কী বললেন, আমরা তো একেবারেই বুঝতে পারলাম না। উনি কি গালি দিলেন না দোয়া দিলেন, কিছুই বুঝলাম না। এখন আসলেই কি তিনি বক্তব্য রাখতে পারলেন?’
এ পর্যায়ে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, তাঁরা সংসদে সব সমস্যার সমাধান চান। কিন্তু নিজেরাই সমস্যা তৈরি করলে সেটা সমস্যা।
বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, ভঙ্গুর রাজনীতি পেয়েছে উল্লেখ করে চিফ হুইপ বলেন, একজন সদস্য যখন কথা বলেন, তাঁর নিজেরও দৃষ্টি রাখা দরকার। মাত্র কয়েক দিন আগে উনি (রুমিন) বিএনপির পক্ষে কথা বলেছেন।
এ পর্যায়ে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, ‘চিফ হুইপ হিসেবে আপনারও কিন্তু রেসপন্সিবিলিটি আছে, হুইপিং দ্য মেম্বারস অব দ্য পার্লামেন্ট। একজন সম্মানিত সদস্য, উনি কথা বলতে পারবেন, অসংসদীয় হলে সেটা এই চেয়ার থেকে এক্সপাঞ্জ করা হবে। কিন্তু সেটাকে বাধাগ্রস্ত করা, এটা ঠিক না। আর চিফ হুইপ হিসাবে আপনার মূল দায়িত্ব হাউসের শৃঙ্খলা রাখা।’
পরে বিলের আলোচনায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমি তো বিষয় কী, সেটাই বুঝতে পারছি না। আমি কী বললাম, আলোচনা কী হলো?’ তিনি বলেন, দুঃখজনক, একটা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক আলোচনা এখানে চলে আসছে।
পরে রুমিন ফারহানা বলেন, বিএনপির সংসদ সদস্যরা তাঁকে অশালীন ভাষায় গালাগাল করেছেন। এ সময় চিফ হুইপের ভূমিকা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
