আমার কাগজ প্রতিবেদক
দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে ঢাকা মহানগর। জলাভূমি ভরাট করা হয়েছে, নিচু এলাকায় স্থাপনা গড়ে উঠেছে এবং এমন সব বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যেগুলো হয়তো বড় ভূমিকম্প সামলাতে পারবে না। দ্য ডেইলি স্টার-এর ছয় পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে আজ উঠে এসেছে, কীভাবে একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর গ্যাস লাইনের লিকেজ বা বিস্ফোরণ, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট এবং পানি সরবরাহব্যবস্থা মিলে আরও ভয়াবহ একটি বিপর্যয়ের সৃষ্টি করতে পারে।
একটি বড় ধরনের ভূমিকম্প রাজধানী ঢাকায় শুধু ব্যাপক ভবনধসই ঘটাবে না, বরং গ্যাসলাইন ছিঁড়ে যাওয়া, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট ও অন্যান্য ঝুঁকির কারণে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সৃষ্টি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, ভূমিকম্পের পর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে; বিশেষ করে যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না থাকলে, প্রাণহানির সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়।
শক্তিশালী ভূমিকম্পের সময় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির মতো ইউটিলিটি সেবাগুলো দ্রুতই বড় হুমকিতে পরিণত হতে পারে। বিদ্যুতের লাইনে শর্ট সার্কিট হতে পারে, গ্যাস লিকেজ থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং পানির সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে আগুন নেভানোর জন্য প্রয়োজনীয় পানির সংকট দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটির সাবেক সহসভাপতি এবং সেন্টার ফর হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবু সাদেক বলেন, ‘ভূমিকম্পপ্রবণ শহরগুলোতে শক্তিশালী ভূমিকম্পের সবচেয়ে বিপজ্জনক গৌণ প্রভাবগুলোর একটি হলো অগ্নিকাণ্ড।’
‘সাধারণত বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ড শুরু হয়। রান্নার সময় ভূমিকম্প হলে গ্যাসের চুলা থেকেও আগুন লাগতে পারে। আর রাতের বেলায় বৈদ্যুতিক ত্রুটিই প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গ্যাস পাইপলাইন ফেটে গেলে এবং সেখান থেকে গ্যাস বের হতে থাকলে আগুন আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে,’ বলেন তিনি।
একই সময়ে পানির পাইপলাইন ভেঙে সঞ্চিত পানি বেরিয়ে যাওয়ায় তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়। যাদের সংরক্ষিত পানি থাকে না, তারা তাৎক্ষণিকভাবে দুর্ভোগে পড়েন বলে জানান সাদেক।
তিনি আরও জানান, অতীতে দেখা গেছে, অনেক শহরে ভূমিকম্পের চেয়ে পরবর্তী অগ্নিকাণ্ডে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ১৯০৬ সালের সান ফ্রান্সিসকো ভূমিকম্পে মোট ক্ষয়ক্ষতির প্রায় ৮০ শতাংশই আগুনের কারণে হয়েছিল, আর মাত্র ২০ শতাংশ হয়েছিল ভবন ধসে।
সাদেক বলেন, ‘ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামের মতো শহরগুলোতে ঝুঁকি আরও বেশি, কারণ এসব শহরের সড়কের নিচে বিস্তৃত গ্যাস পাইপলাইনের নেটওয়ার্ক রয়েছে।’
‘আদর্শিকভাবে ভূমিকম্পপ্রবণ শহরগুলোতে পাইপলাইনের গ্যাসের বদলে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির অনেক আগেই পাইপলাইনের গ্যাস চালু করা হয়েছিল। ফলে গ্যাস পাইপলাইনের বর্তমান এ নেটওয়ার্ক এখন বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে,’ বলেন সাদেক।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বিদ্যুৎব্যবস্থাও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে বস্তি ও ঘনবসতিপূর্ণ অনেক জায়গায় বৈদ্যুতিক সংযোগ স্থাপনে মানদণ্ড অনুসরণ করা হয় না। ফলে শর্ট সার্কিটের ঝুঁকি অনেক বেশি।’
সাদেক জানান, ভবনের মূল বৈদ্যুতিক সংযোগে স্বয়ংক্রিয় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নকারী (অটোমেটিক শাট-অফ) যন্ত্র বসানোর মাধ্যমে শর্ট সার্কিট থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ করা সম্ভব।
তিনি বলেন, ‘ভূমিকম্পের তরঙ্গ ধাপে ধাপে আসে। প্রথমে আসা পি-ওয়েভ খুব বেশি ক্ষতি করে না, কিন্তু পরবর্তী এস-ওয়েভ ধ্বংসাত্মক। স্বয়ংক্রিয় শাট-অফ যন্ত্র পি-ওয়েভ শনাক্ত করে বড় কম্পন শুরুর আগেই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পারে।’
‘একই প্রযুক্তি গ্যাস, এমনকি পানির লাইনেও ব্যবহার করা যায়। বিশ্বের অধিকাংশ বড় ভূমিকম্পপ্রবণ শহরে এসব ব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়,’ যোগ করেন তিনি।
হাসপাতালেও আগাম সতর্কীকরণ অ্যালার্ম ব্যবহার করা হয়। অস্ত্রোপচারের সময় অ্যালার্ম বেজে উঠলে চিকিৎসকেরা কিছু সময়ের জন্য কাজ থামিয়ে রোগীকে নিরাপদ রাখতে পারেন। অক্সিজেন সিলিন্ডারের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতিও সঠিকভাবে রাখতে হবে, যাতে সেগুলো পড়ে না যায়।
সাদেক বলেন, ‘গ্যাস পাইপলাইন রাতারাতি বদলানো সম্ভব নয়, আর মানুষও সহজে পাইপলাইনের গ্যাস ছেড়ে সিলিন্ডারে যাবে না। অন্তত গ্যাস ও পানির পাইপলাইনের প্রতিটি বাঁক ও সংযোগস্থলে নমনীয় (ফ্লেক্সিবল) জয়েন্ট বসানো উচিত, যাতে পাইপ ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি কমে।’
তিনি আরও বলেন, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি নেটওয়ার্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে পয়োবর্জ্য উপচে পড়তে পারে।
যোগাযোগ টাওয়ার অচল হয়ে যেতে পারে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, ফায়ার স্টেশন, টেলিভিশন স্টুডিও এবং সংবাদপত্র অফিসও ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ অনেক ভবনের এখনো যথাযথ কাঠামোগত পরিদর্শনই হয়নি।
স্বয়ংক্রিয় শাট-অফ ব্যবস্থাকে স্বল্প ব্যয়ের সমাধান উল্লেখ করে সাদেক জানান, এসব যন্ত্র বসাতে অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম কিংবা দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনের তুলনায় অনেক কম খরচ হবে।
তিনি বলেন, ‘ঢাকার মতো একটি শহরের ক্ষেত্রে এসব প্রতিরোধী ব্যবস্থা যে সুরক্ষা দেবে তার তুলনায় এগুলো স্থাপনের খরচ একেবারেই নগণ্য।’
তার উদ্বেগের সঙ্গে একমত পোষণ করে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ‘২০১৫ সালের পর আমরা একটি ইমার্জেন্সি শাটডাউন সিস্টেমের প্রস্তাব দিয়েছিলাম, যেখানে কম্পন নির্দিষ্ট মাত্রা ছাড়ালে সেন্সরের মাধ্যমে গ্যাস ও পানির সংযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।’
‘প্রযুক্তিটি ব্যয়বহুল না হলেও উদ্যোগটি মাত্র ১৫ দিনের মধ্যেই থেমে যায়। আমাদের প্রয়োজন শক্তিশালী রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সর্বোচ্চ পর্যায়ের সমর্থন। ভূমিকম্পের পর বড় দুর্ঘটনা এড়াতে ১৫ সেকেন্ডের মধ্যে গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ করতে হবে,’ বলেন তিনি।
আর্কিটেকচারাল কনসালটেন্সির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ মুক্তা বলেন, ‘বাসিন্দাদের অবশ্যই জানতে হবে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের শাট-অফ পয়েন্ট কোথায় রয়েছে। এসব স্থান স্পষ্টভাবে চিহ্নিত থাকতে হবে এবং গ্যাস লিকেজ বা বৈদ্যুতিক স্পার্ক দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংযোগ বন্ধ করতে হবে।’
তিতাস গ্যাসের অপারেশন ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, ‘স্বয়ংক্রিয় শাটডাউন ব্যবস্থা চালু করতে কম্পন শনাক্তকারী সেন্সরযুক্ত ভালভ প্রয়োজন, যা নির্দিষ্ট মাত্রার কম্পন শনাক্ত করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। বিকল্প হিসেবে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে দূরবর্তীভাবে (রিমোটলি) ভালভ নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সুপারভাইজরি কন্ট্রোল অ্যান্ড ডেটা অ্যাকুইজিশন (এসসিএডিএ) নামে পরিচিত এই ব্যবস্থা বর্তমানে তিতাসে নেই। তবে ভবিষ্যতে ফ্লো-কন্ট্রোল ভালভগুলোকে এসসিএডিএর আওতায় আনার কাজ চলছে।’
ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগের সময় প্রধান গ্যাস স্টেশনগুলোর ভালভ দূর থেকে পরিচালনা করার সুযোগ বর্তমানে নেই বলেও জানান এ কর্মকর্তা।
আরেকটি বিকল্প হলো কম্পন-সংবেদনশীল স্বয়ংক্রিয় শাট-অফ ভালভ। এটিও বর্তমানে মূল নেটওয়ার্কে নেই। এখন শুধু প্রিপেইড আবাসিক স্মার্ট মিটারগুলোতে এ ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানান তিনি।
সাইদুল হাসান বলেন, ‘আমরা এই প্রযুক্তি গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করছি। তবে এর জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অর্থায়ন প্রয়োজন।’
তিনি জানান, এ ব্যবস্থা চালু করতে হলে সবগুলো প্রধান স্টেশনের ভালভ বদলাতে হবে। কেননা বর্তমানে ব্যবহৃত সব ভালভই সম্পূর্ণ ম্যানুয়াল পদ্ধতির।
