লালমনিরহাট প্রতিনিধি
লালমনিরহাটের পাটগ্রামের চার তরুণকে পোশাক কারখানায় উচ্চ বেতনে চাকরির কথা বলে রাশিয়া নিয়ে সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জামায়াতের যুব বিভাগের দুই নেতার বিরুদ্ধে।
চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটানো যুবকদের পরিবারের সদস্যরা বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও সন্তানদের উদ্ধারে ব্যর্থ হয়ে মঙ্গলবার পাটগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছেন।
ভুক্তভোগীরা হলেন, পাটগ্রাম সদর ইউনিয়নের টেপুরগাড়ী এলাকার দেলদার রহমানের ছেলে নাজমুল হক সৌরভ (২১), একই এলাকার রাবিউল ইসলামের ছেলে মেহেদী হাসান (২১), সর্দারপাড়া এলাকার আফজাল হোসেনের ছেলে আল আমিন (২০) এবং একই এলাকার আব্দুল মজিদের ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুন (২২)।
তরুণদের পরিবারগুলোর অভিযোগ, ঢাকা উত্তরার ‘আর এস ইন্টারন্যাশনাল’ (আরএল-১৪২৮) নামের একটি এজেন্সির মাধ্যমে রাশিয়ায় নিরাপদ ও বৈধ কাজের সুযোগ রয়েছে বলে তরুণদের প্রলোভন দেখান পাটগ্রাম উপজেলা যুব বিভাগের সভাপতি (সদ্য অব্যাহতিপ্রাপ্ত) ইউনুস আলী এবং পৌর যুব বিভাগের সাধারণ সম্পাদক মাহিন ইসলাম। ইউনুস জেলা শিবিরের সাবেক সভাপতি।
পরে ভিসা, টিকিট ও চাকরির ব্যবস্থা করার কথা বলে চার পরিবারের কাছ থেকে জনপ্রতি সাড়ে ৯ লাখ টাকা করে নেন তারা।
ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ৪ মে ওই চার তরুণকে বাড়ি থেকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ৭ মে রাশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে বাহরাইনে ১২ ঘণ্টার ট্রানজিট শেষে ৮ মে সকালে তারা মস্কো পৌঁছান। বিমানবন্দর থেকে তারা ভিডিও কলে পরিবারের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলেন।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, বিমানবন্দর থেকে রুশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা তরুণদের একটি হোটেলে নিয়ে গিয়ে পাসপোর্ট, ভিসা ও মোবাইল কেড়ে নেয়। তখনই তরুণরা জানতে পারেন, চাকরির পরিবর্তে তাদের রুশ সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এরপর থেকেই পরিবারের সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
অভিভাবকেরা জানান, পরবর্তীতে এক পণ্য সরবরাহকারীর (ডেলিভারি ম্যান) মোবাইল ব্যবহার করে যুবকেরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাড়িতে কল দিয়ে নিজেদের জীবনঝুঁকির কথা জানান। বিভিন্ন সময়ে ক্ষুদে বার্তায় (এসএমএস) জীবন বাঁচানোর আকুতিও জানান তারা।
ভুক্তভোগীদের পরিবার জানায়, এই বিষয়ে জামায়াত নেতা ইউনুস ও মাহিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা প্রথমে ঘটনাটি অস্বীকার করেন।
পরবর্তীতে ১৪ মে পরিবারের সদস্যরা ঢাকার উত্তরায় ‘আর এস ইন্টারন্যাশনাল’ এজেন্সির কার্যালয়ে গেলে কর্তৃপক্ষ কয়েকদিনের মধ্যে যুবকদের নিরাপদ স্থানে নেওয়ার আশ্বাস দেয়। তবে এর কিছুদিন পরেই এজেন্সির কার্যালয়টি তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়।
উপায়ান্তর না পেয়ে ২১ মে ঢাকায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সামনে পাটগ্রামের ভুক্তভোগী পরিবারসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় ৩০টি পরিবার মানববন্ধন করে এবং সন্তানদের দেশে ফিরিয়ে আনার দাবিতে মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানায়।
সর্বশেষ মঙ্গলবার পাটগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে নাজমুল হক সৌরভের বাবা দেলদার হোসেন বলেন, “আমার ছেলেকে ইউনুস সাড়ে নয় লাখ টাকা নিয়ে রাশিয়ায় পাঠিয়েছে। এখন শুনছি সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। আমরা দিন-রাত দুশ্চিন্তায় আছি।”
মেহেদী হাসানের বাবা রাবিউল ইসলাম বলেন, “রাশিয়ায় ভালো চাকরির কথা বলে ইউনুস আমার ছেলেকে পাঠিয়েছে। এখন ছেলের কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। সে নিখোঁজ।”
এদিকে অভিযোগ ওঠার পর গত ২০ মে পাটগ্রাম উপজেলা জামায়াতে ইসলামী ইউনুস ও মাহিনকে সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেয়।
ইউনুস আলী তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বলেন, “তাঁরা বৈধ কাগজপত্র নিয়ে গেছে। সেখানে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছে। এজেন্সির সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ে এবং দুই দেশের দূতাবাসে যোগাযোগ করা হয়েছে। সবাইকে নিরাপদ স্থানে আনার চেষ্টা চলছে।”
টাকা লেনদেনের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, “পরিবারগুলোর কাছ থেকে যে টাকা নিয়েছি, সব মাহিনকে দিয়েছি। মাহিন এজেন্সিকে দিয়েছে।”
তবে অপর অভিযুক্ত মাহিন ইসলাম তাঁর সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে বলেন, “পরিবারগুলোর সঙ্গে আমার কোনো পরিচয় নেই। ইউনুসের সঙ্গে এজেন্সির পরিচয় থাকলেও পুরো কাজ সে নিজেই করেছে। এখানে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।”
যোগাযোগ করা হলে পাটগ্রাম উপজেলা জামায়াতের আমীর হাফেজ শোয়াইব আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, “এ ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর কোনো দায় নেই। এটি ব্যক্তিগত বিষয়। সংগঠন ঘটনা জানার পরপরই তাদের দুজনকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছে।”
এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য জানার চেষ্টা করছে গণমাধ্যম।
পাটগ্রাম থানার ওসি নাজমুল হক জানান, “ঘটনাটি আমি শুনেছি। তবে এখন পর্যন্ত ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ থানায় লিখিত অভিযোগ করেনি। লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
