মিনহাজ আবেদীন দুর্জয়
শিকার ও ফলমূল সংগ্রহের যাযাবর জীবন ছেড়ে, মানুষ যখন কৃষিকাজের মাধ্যমে স্থায়ী বসতি গড়ে তুলতে শুরু করল, তখন নদী হয়ে উঠল সেই নতুন জীবনব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। নদীর পানি, উর্বর পলি ও প্রাকৃতিক সম্পদকে কেন্দ্র করেই ধীরে ধীরে বিকশিত হয় মানবসভ্যতার নানা রূপ। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরেই গড়ে উঠেছিল মেসোপটেমিয়ার মতো প্রাচীন সভ্যতা। সেখানে নদী শুধু পানির উৎস ছিল না বরং মানুষকে দিয়েছে উর্বর ভূমি, খাদ্যের নিশ্চয়তা, যোগাযোগের পথ ও বাণিজ্যের সুযোগ। এমনকি সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনেও নদী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
নৃবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে নদী কেবল একটি প্রাকৃতিক জলধারা বা সম্পদ নয়। নদী হলো একটি ‘social space’ অর্থাৎ এমন এক স্থান, যেখানে মানুষের জীবনযাপন, জীবিকা, সামাজিক সম্পর্ক ও পরিচয় গড়ে ওঠে। একইসঙ্গে নদী একটি ‘cultural landscape’ যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের দীর্ঘদিনের পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে সংস্কৃতি, ইতিহাস, স্মৃতি ও জীবনধারার ছাপ ফুটে ওঠে।
নদীমাতৃক বাংলাদেশের ইতিহাসও নদী ছাড়া কল্পনা করা যায় না। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার মতো নদ-নদী এই বদ্বীপের সভ্যতা ও সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। এই নদীকেন্দ্রিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো বুড়িগঙ্গা। বুড়িগঙ্গা কেবল ঢাকার পাশ দিয়ে বয়ে চলা কোনো সাধারণ নদী নয়, এটি ঢাকার জন্ম, বিস্তার, বাণিজ্য, স্মৃতি ও জনজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। একসময় এই নদীটি ছিল ঢাকার প্রাণভোমরা, যা এই অঞ্চলের অর্থনীতি ও পরিবহনকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।
কিন্তু যে নদী একসময় ঢাকার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, সেই নদীকেই মানুষ আধুনিক নগরায়ণ, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, দখল ও অবহেলার মাধ্যমে আজ গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বুড়িগঙ্গার এই বর্তমান অবস্থাকে তাই শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না, এটি একই সঙ্গে একটি নৃবৈজ্ঞানিক ও সামাজিক সংকট। কারণ নদীর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা মানুষের জীবনযাত্রা, পেশা, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন সম্পর্ক।
বুড়িগঙ্গার বিষয়টিকে যদি আমরা নৃবিজ্ঞানের Political Ecology এবং Environmental Justice-এর আলোকে বিশ্লেষণ করি, তবে এর সংকটকে নতুনভাবে বোঝা যায়। Political Ecology-এর দৃষ্টিতে বুড়িগঙ্গার পরিবেশগত সংকট শুধু প্রকৃতির কারণে সৃষ্টি হয়নি; এর পেছনে ক্ষমতার রাজনীতি, উন্নয়ননীতি, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে Environmental Justice-এর দৃষ্টিতে দেখা যায়, পরিবেশ দূষণের ক্ষতি সমাজের সব মানুষের ওপর সমানভাবে পড়ে না বরং প্রান্তিক ও নদীনির্ভর জনগোষ্ঠীই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দীর্ঘদিনের ট্যানারি বর্জ্য, শিল্পকারখানার দূষণ, নগরের অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য এবং পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ বুড়িগঙ্গাকে প্রায় একটি পরিবেশগত মৃত অঞ্চলে (ecological dead zone) পরিণত করেছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, নদীর পানিতে লেড, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের মতো বিষাক্ত ভারী ধাতুর উপস্থিতি রয়েছে। এর ফলে কামরাঙ্গীরচরের মতো নদীতীরবর্তী এলাকার নিম্নআয়ের মানুষ, যারা গোসল বা দৈনন্দিন কাজে নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল, তারা প্রতিনিয়ত চর্মরোগ, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছেন। এটি পরিবেশগত অবিচারের একটি স্পষ্ট উদাহরণ, যেখানে শিল্পায়নের সুবিধা ভোগ করে মুষ্টিমেয় গোষ্ঠী, অথচ সেই উন্নয়নের পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত খরচ বহন করতে হয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উদাহরণ থেকে আমরা দেখতে পাই, সদিচ্ছা থাকলে মৃতপ্রায় নদীকেও বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব। একসময় যুক্তরাজ্যের টেমস নদী দূষণের চরম মাত্রায় পৌঁছে ‘The Great Stink’ বা ‘মহা দুর্গন্ধ’ নামে পরিচিতি পেয়েছিল। কিন্তু কঠোর পরিবেশ আইন প্রয়োগ, উন্নত বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আজ সেখানে জলজ প্রাণ ফিরে এসেছে। জার্মানির রাইন নদীকে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে দূষণমুক্ত করা হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে একসময় কংক্রিটের নিচে চাপা পড়ে যাওয়া চেওংগিয়েচিওন (Cheonggyecheon) নদীকে আবার উন্মুক্ত করা হয়েছে। নদীটি পুনরুদ্ধারের পর শুধু দূষণই কমেনি, শহরের পরিবেশও অনেক উন্নত হয়েছে। মানুষের জন্য তৈরি হয়েছে সবুজ উন্মুক্ত স্থান, বেড়েছে পর্যটন, আর নগরজীবনও হয়েছে আরও বাসযোগ্য। এই অভিজ্ঞতাগুলো দেখায়, নদী রক্ষা শুধু প্রযুক্তি বা অবকাঠামোর বিষয় নয় এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর আইন প্রয়োগ, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ। বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে বাংলাদেশও এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে।
“বুড়িগঙ্গা না বাঁচলে ঢাকা কী হারাবে?” এই প্রশ্নের উত্তর শুধু পরিবেশের ক্ষতি দিয়ে পরিমাপ করা যাবে না। বুড়িগঙ্গা হারালে ঢাকা হারাবে তার ৪০০ বছরের ইতিহাস, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। নদীর সাথে মানুষের যে আত্মিক সংযোগ, বিনোদন ও সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার পরিসর ছিল, তা চিরতরে মুছে যাবে। বুড়িগঙ্গার মৃত্যু মানে শহরের অর্থনৈতিক ক্ষতি, নৌ-পরিবহনের পতন এবং সর্বোপরি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের আত্মপরিচয়ের সংকট।
বুড়িগঙ্গার এই বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলায় শুধু নদী পরিষ্কার করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মানুষ, রাষ্ট্র ও সমাজকে সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ। নৃবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে নদী পুনরুদ্ধার মানে শুধু একটি জলধারাকে দূষণমুক্ত করা নয়; বরং নদীকেন্দ্রিক জীবন, সংস্কৃতি, স্মৃতি ও সামাজিক সম্পর্ককে পুনর্গঠনের চেষ্টা। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে নদী সংরক্ষণকে Climate Adaptation কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখতে হবে। সে জন্য কয়েকটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ জরুরি। নদী ব্যবস্থাপনা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ: যেসব শিল্পকারখানা তরল বর্জ্য নির্গত করে, সেসব কারখানায় কার্যকর ইটিপি (ETP) স্থাপন ও নিয়মিত পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে উচ্চ দূষণকারী শিল্পকে নদীতীর থেকে পর্যায়ক্রমে সরিয়ে নেওয়া বা কঠোর পরিবেশগত মানদণ্ডের আওতায় আনতে হবে।
নদীর আইনি অধিকার ও দখলমুক্তকরণ: ২০১৯ সালে বাংলাদেশের হাইকোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে তুরাগ নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ (Living Entity) হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং একই নীতি দেশের সব নদ-নদীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলে ঘোষণা করেন। এই রায়ের আলোকে নদীর আইনি অধিকার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং দূষণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে নদীতীরে সবুজ বেষ্টনী (Buffer Zone) গড়ে তুলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশ রক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ: নদী পুনরুদ্ধারের প্রতিটি উদ্যোগে স্থানীয় জনগণ, বিশেষ করে মাঝি, জেলে ও নদীনির্ভর মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ নদী সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতা, স্থানীয় জ্ঞান এবং সাংস্কৃতিক স্মৃতি নদী ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নতুন প্রজন্মের নদীচেতনা: শিক্ষা, গবেষণা, গণমাধ্যম ও নাগরিক উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে নদী সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা নদীকে শুধু পানির উৎস নয়, বরং সমাজ, সংস্কৃতি ও জীববৈচিত্র্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে শেখে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সমন্বিত নদী পরিকল্পনা: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, নদীর প্রবাহের পরিবর্তন ও দূষণের ঝুঁকি আরও বাড়ছে। তাই নদী সংরক্ষণকে জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে নদী পুনরুদ্ধারের নীতিতে স্থানীয় মাঝি, জেলে ও নদীনির্ভর জনগোষ্ঠীর প্রজন্মান্তরে সঞ্চিত পরিবেশগত জ্ঞান (Local Ecological Knowledge)কে গুরুত্ব দিতে হবে। সবশেষে মনে রাখতে হবে, বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানো মানে শুধু একটি নদীকে রক্ষা করা নয়; বরং মানুষ ও নদীর হাজার বছরের সহাবস্থান এবং সেই সম্পর্ক থেকে গড়ে ওঠা সংস্কৃতি, ইতিহাস ও জীবনধারাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা।
লেখক: নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক, minhazdurjoy@gmail.com
