Oplus_16908288
আলি জামশেদ, কিশোরগঞ্জ
কটিয়াদী উপজেলার অধীনস্থ জালালপুর ও লোহাজুরী ইউনিয়নের মধ্যবর্তী সড়কের পাশে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত একটি খাল। এই খালের পুনঃখনন কাজের শুভ উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ সংসদীয় আসন -১৬৩ এর কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য এ্যাড.জালাল উদ্দিন। উদ্বোধন মুহূর্তে স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ ও উদ্দীপনা দেখা যায়।
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলাধীন জালালপুর ও লোহাজুরী ইউনিয়নের মাঝামাঝি সীমানায় অবস্থিত ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল পুনঃ খননের খননের বিষয়ে স্থানীয় কৃষক ও সাধারণ জনগণের দাবি দীর্ঘদিন থেকেই। দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রকল্প চালু বিষয়ে সেখানকার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্থানীয় বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষের জমজমাট উপস্থিতি চোখে পড়ার মতোই ছিলো।
গত বুধবার ৬ মে, বিকাল প্রায় ৪ টার দিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে (ইজিপিপি) প্রকল্পের আওতাধীন স্থানীয় কৃষি ও কৃষকের কল্যাণার্থে এই খালের পুনঃ খনন কাজের শুভ উদ্বোধন করা হয়। এ সময়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা আফরোজ মারলিজের সভাপতিত্বে ও ১০নং জালালপুর ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল আলমের সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথি ছিলেন, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোঃ বদরুদ্দোজা। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন, কটিয়াদী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ রফিকুল ইসলাম, উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব তোফাজ্জল হোসেন খাঁন দিলীপ, সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান কাঞ্চন, পৌর বিএনপির সভাপতি আশরাফুল হক দাদন ও সাধারণ সম্পাদক সাজেদুর রহমান সজল সরকার, উপজেলা বিএনপির সহ সভাপতি মিজানুর রহমান স্বপন, শেখ জসিম উদ্দিন মেনু, শফিকুর রহমান বাদল, আতিকুর রহমান আতিক, উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক সাইফুল্লাহ জাইদুল, মাহফুজুর রহমান মিঠু, শফিকুল ইসলাম ফুলু, সাংগঠনিক সম্পাদক খলিলুর রহমান ও হাজী মোহাম্মদ আলী, উপজেলা যুব দলের আহবায়ক মাহবুবুল আলম মাসুদ ও সদস্য সচিব রফিকুল ইসলাম সেতুসহ বিএনপি ও সকল অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য যে, সত্তর দশকের শেষভাগে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান স্ব-নির্ভর বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন। সেই কর্মসূচির অংশ হিসেবে তার উপস্থিতিতে এ খালটি খনন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সংস্কারের অভাবে খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের সেচ সংকটের ভোগান্তিতে পরতে হয়। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, খালটি পুনঃখনন সম্পন্ন হলে কয়েক হাজার হেক্টর ফসলি জমি সেচ সুবিধার আওতায় আসবে। শহীদ জিয়ার এই দৃষ্টান্তকারি উদ্যোগকে পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে কৃষিতে নতুন জোয়ার আসবে। স্থানীয়রা বলেন এই খাল খননের মাধ্যমে এসব এলাকায় জলাবদ্ধতা দূর হওয়ার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও সময়ের ব্যবধানে দেশের অসংখ্য খাল, জলাশয় ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনার কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। একসময় গ্রামবাংলার প্রাণ হিসেবে পরিচিত অসংখ্য খাল বিভিন্ন স্থানে আজ মৃতপ্রায়। বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা, কৃষিজমিতে পানি সংকট, নৌপথে প্রতিবন্ধকতা এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে খাল ভরাট ও নাব্যতা হ্রাসকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন পরিস্থিতিতে খাল খনন ও পুনরুদ্ধারে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা—বিশেষ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), বিআইডব্লিউটিএ এবং সিটি করপোরেশনগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাল পুনঃখনন ও সংস্কারে নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে এবং নতুন করে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা হিতে নিয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় খাল উদ্ধারে অভিযানও পরিচালিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাল খনন শুধু পানি নিষ্কাশনের জন্য নয়; এটি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হাওর ও নিম্নাঞ্চলে খাল সচল থাকলে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন সম্ভব হয়, ফলে বন্যা ও ফসলহানির ঝুঁকি কমে।
সরকারি তথ্যমতে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছোট-বড় বহু খাল পুনঃখননের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা কমাতে কাজ চলছে। বিশেষ করে উপকূলীয় ও হাওরাঞ্চলে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে একাধিক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। অনেক এলাকায় খাল পুনঃখননের ফলে কৃষকরা সেচ সুবিধা পাচ্ছেন এবং শুকনো মৌসুমেও জমিতে পানি ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে।
তবে বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক স্থানে খাল খননের কাজ শুরু হলেও তা টেকসইভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। কোথাও কোথাও খননের কয়েক মাস পরই আবার দখল ও ভরাট শুরু হয়। অপরিকল্পিত স্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্বল নজরদারির কারণে বহু খাল আবারও সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, শুধু খাল খনন করলেই হবে না; খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশ রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, নিয়মিত মনিটরিং এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য খাল পুনরুদ্ধার এখন শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং টিকে থাকার লড়াইয়ের অংশ। কার্যকর পরিকল্পনা ও সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে খালগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা গেলে দেশের পরিবেশ, কৃষি ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, খাল খননকে সাময়িক প্রকল্প হিসেবে না দেখে জাতীয় পানি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তাহলেই দেশের হারিয়ে যাওয়া খালগুলো আবারও প্রাণ ফিরে পেতে পারে।
কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য জালাল উদ্দিন ত্রাণ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে (ইজিপিপি) প্রকল্পের আওতাধীন স্থানীয় কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে এই বিশেষ খাল পুনঃ খনন কাজের শুভ উদ্বোধন করে বলে জানান। এই খালটি খনন করা হলে কৃষকসহ স্থানীয়দের অনেক উপকারে আসবে বলে তিনি এর গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি কৃষকদের বোরো ধান চাষের সুবিধা, বর্ষায় পানি নিষ্কাশন এবং জলাবন্ধতা দূর করে বছরে একাধিক ফসল ফলানোর লক্ষ্যে এই পুনঃখননে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
