খোদ তত্ত্বাবধায়কের বিরুদ্ধে অভিযোগের তির
ফেনী প্রতিনিধি
ফেনীর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ডের অপারেশন থিয়েটারে ‘রান্নাবান্না’ ঘটনায় তোলপাড় চলছে। কর্মকর্তাদের নাকের ডগায় কিভাবে দিনের পর দিন এহেন অপকর্ম চলেছে, তার হিসেব মিলাতে পারছে না কেউ। অন্যদিকে বিষয়টি জানাজানি হবার পরও জড়িতদের বিরুদ্ধে এখনো কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ডের অপারেশন থিয়েটারে রান্নাবান্না সংক্রান্ত সংবাদটি গত বুধবার স্থানীয় এক দৈনিকে প্রথম প্রকাশ হয়। এরপর থেকেই বিষয়টি আলোচনার শীর্ষে ওঠে আসে। পত্রিকাটির সংবাদে বলা হয়, দুই বছর ধরে সেখানে গ্যাসের চুলায় রান্নাবান্না চলছে। প্রতিদিন এখানে প্রসূতি নারীদের সিজার অপারেশন করা হলেও কিছু সিনিয়র স্টাফ নার্স থিয়েটারের কক্ষ রান্নাঘর ও শয়নকক্ষ হিসেবে ব্যবহার করছেন।
এর সঙ্গে জড়িত নার্সদের মধ্যে রয়েছেন নার্সিং সুপারভাইজার নুর জাহান, কল্পনা রানী, হ্যাপী রানী সূত্রধর, সীমা কর্মকার, রত্না বসাক, রানী বালা ও দেলোয়ারা বেগম। একটি ভিডিওর উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হাসপাতালের সিনিয়র নার্সরা অপারেশন থিয়েটারের কক্ষে শীতের পিঠা তৈরি করছেন, অন্যরাও অবাধে আসা-যাওয়া করছেন। ঠিক পাশের কক্ষে চলছে সিজারিয়ান অপারেশন। সেখানেও রোগীর স্বজন ও বহিরাগতদের অবাধে চলাফেরা করতে দেখা গেছে।

ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, চার-পাঁচ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স রান্নায় ব্যস্ত, আর পাশের কক্ষে চলছে রোগীদের চিকিৎসা।
অভিযোগ রয়েছে, এখানে গাইনি চিকিৎসক তাহিরা খাতুন রোজী, নিলুফা সুলতানা ও তাহমিনা আক্তারসহ একাধিক চিকিৎসক দায়িত্বে রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে লেবার ওয়ার্ডে এসব অনিয়মের ব্যাপারে কর্মরত চিকিৎসকরা অবগত। বিভিন্ন সময়ে এখানে নার্সরা বিরিয়ানি, শীতের পিঠাসহ নানা খাবারদাবার রান্না করে থাকেন। চিকিৎসকরাও এসব খাবার খেয়ে থাকেন।
এসব আয়োজনে ব্যস্ত থাকার কারণে ওয়ার্ডে ভর্তিরত প্রসূতি রোগীরা সঠিক চিকিৎসা পান না। রোগীর স্বজনরা নার্সদের সহায়তার জন্য ডাকলে তারা ক্ষেপে ওঠে। হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার এমন চরম অব্যবস্থাপনায় রোগী ও তাদের স্বজনদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে।
এ বিষয়ে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. রৌকন উদ দৌলা পত্রিকাটির প্রতিবেদককে বলেন, ওটির ভেতর রান্নাবান্না! এটা অসম্ভব ব্যাপার। ওটির ভেতরে কিভাবে রান্নাবান্না করে সংক্রমণের অনেক বিষয় আছে এখানে। আমরা অবশ্যই এ ব্যাপারে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এমন অনিয়ম সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায় এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার চরম লঙ্ঘন।
অন্যদিকে ফেনী সিভিল সার্জন ডা. রুবাইয়াত বিন করিম জানান, অপারেশন থিয়েটারে রান্নাবান্না করার কোন সুযোগ নেই। এতে মারাত্মক সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে। এ ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া হবে।
এদিকে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমি অবগত নই। পরে তাকে এ সংক্রান্ত ভিডিও দেখানো হলে প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, এটা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন চিকিৎসক-নার্স এ বিষয়ে আমার কাগজকে বলেন, কর্তৃপক্ষের সায় না থাকলে অপারেশন থিয়েটারের মতো স্পর্শকাতর স্থানে দীর্ঘদিন রান্নাবান্নার মতো অপকর্ম সম্ভব নয়। এতেই হাসপাতালের ব্যবস্থাপনার চিত্র ফুটে ওঠে। বিশেষ করে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক ডা. সাইফুল ইসলাম গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি যোগদান করার পর থেকে অব্যবস্থাপনা চরমে ওঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সকাল থেকে ব্যস্ত থাকেন হাসপাতালের গাড়িতে করে সন্তানকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আনা-নেয়ায়। ১১-১২টার দিকে হাসপাতালে এলেও তদারকির সময় পাননা। ফেনীবাসী এ অব্যবস্থাপনা থেকে পরিত্রাণে স্বাস্থ্য সচিবের আশু দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
