আমার কাগজ ডেস্ক
২০১৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতিবছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছেন প্রায় ২০ লাখ মানুষ, যার বিপরীতে নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে মাত্র ৯ লাখ। কর্মসংস্থানের এই ধীরগতির মধ্যে নতুন কাজের প্রতি ১০টির ৭টিই তৈরি হয়েছে কৃষি খাতে।
অন্যদিকে, শিল্প খাতে কর্মসংস্থান উল্টো কমেছে। বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ ২০২৬’ প্রতিবেদনের বিশেষ অধ্যায়ে এই ‘উৎপাদনশীলতার বৈপরীত্য’ তুলে ধরা হয়েছে। গত এক দশকে গড়ে ৬ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও সেই অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান বাড়েনি।
উৎপাদনশীলতায় শীর্ষ ১০ শতাংশ ‘ফ্রন্টিয়ার’ বা অগ্রসর প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিক খাতের মোট বিক্রির ৭৫ শতাংশ এবং রপ্তানি আয়ের ৬৯ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। অথচ আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে তাদের অবদান মাত্র ১৫ শতাংশ। অধিকাংশ কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে দেশের বাজারনির্ভর নন-ফ্রন্টিয়ার ও ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোতে, যাদের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং বড় হওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। তৈরি পোশাক খাতেও ফ্রন্টিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো মোট বিক্রির অর্ধেক তৈরি করলেও, এই খাতের প্রতি ১২টি চাকরির মাত্র ১টি এসব প্রতিষ্ঠানে সৃষ্টি হচ্ছে।
ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশের পথে প্রধান বাধা হিসেবে জটিল সরকারি প্রক্রিয়া, বিদ্যুৎ সংকট, অর্থায়নের অভাব এবং অসম প্রতিযোগিতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। একটি পরিচালন লাইসেন্স পেতে দেশে গড়ে ২৮ দিন এবং নির্মাণ বা আমদানি অনুমতি পেতে ৪৯ দিন সময় লাগে, যা প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
সরকারি নিয়মকানুন সামলাতেই জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপকদের গড়ে ১৩ শতাংশ সময় ব্যয় হয়। এছাড়া, ৭১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান অনির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহের শিকার। মাসে গড়ে ২৬ বার বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের মুখে পড়ে তারা বার্ষিক বিক্রির প্রায় ৯ শতাংশ ক্ষতির সম্মুখীন হয়। অর্থায়নের দিক থেকে ২২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান আংশিক এবং ৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি ঋণসুবিধা থেকে বঞ্চিত।
কর ও নীতি সহায়তার ক্ষেত্রে দেশে বড় ধরনের বৈষম্য বিরাজমান। সাধারণ করপোরেট আয়করের হার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ হলেও তৈরি পোশাক খাত ১২ থেকে ১৫ শতাংশ হারে কর দেওয়ার সুবিধা পায়। বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার ৯০ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক ও সংশ্লিষ্ট খাতেই কেন্দ্রীভূত।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো কম উৎপাদনশীল হয়েও সুরক্ষামূলক শুল্ক ও বিশেষ সুবিধার কারণে বাজারে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে, যা নতুন ও বেশি উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানের বাজারে প্রবেশ ও টিকে থাকাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
কর্মসংস্থান বাড়াতে ও ব্যবসার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরিতে বিশ্বব্যাংক ‘স্মার্ট ডিরেগুলেশন’ বা বুদ্ধিদীপ্তভাবে নিয়ন্ত্রণ সহজ করার প্রস্তাব দিয়েছে। স্বল্প মেয়াদে লাইসেন্স দেওয়ার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া ডিজিটাল করে সারা দেশে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস (এক দরজায় সেবা) কার্যকর করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানকে দেশীয় ও বহুজাতিক বড় প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা, কর ও নীতি সহায়তায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং কাঠামোগত রপ্তানিবিরোধী পক্ষপাত দূর করে সবার জন্য প্রতিযোগিতার সমান পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
