আন্তর্জাতিক ডেস্ক
উন্নয়ন মানবসমাজের চিরন্তন লক্ষ্য। উন্নয়নের সুফল ভাগাভাগি করে নেওয়াই একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বিশ্ব গঠনের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। ২১-২২ এপ্রিল বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হয় ‘গ্লোবাল শেয়ার্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যাকশন ফোরামের’ তৃতীয় উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন। ‘কর্মমুখী দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করে উন্নয়নের বৈশ্বিক অভিন্ন ভবিষ্যতের সম্প্রদায় গঠনে এগিয়ে যাওয়া’—প্রতিপাদ্যে ১৪০টিরও বেশি দেশ, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থা এবং বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের ছয় শতাধিক প্রতিনিধি অনলাইন ও অফলাইনে বৈশ্বিক উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, চীনের প্রস্তাবিত বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগে উন্নয়নকে অগ্রাধিকার, অন্তর্ভুক্তিমূলক পারস্পরিক শিক্ষাকে সেতু এবং জয়-জয় সহযোগিতাকে মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। মোটকথা, বৈশ্বিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে চীনা শক্তিকে যুক্ত করেছে এটি।
জ্ঞান ভাগাভাগি ও সহযোগিতার প্লাটফর্ম
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৬তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ প্রস্তাব করেন। অভিন্ন উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া এবং মানবজাতির অভিন্ন ভবিষ্যতের সম্প্রদায় গঠনে নেতৃত্বদানকারী ভূমিকা রেখেছে এটি। ফোরামটির আগের দুটি উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ২০২৩ ও ২০২৪ সালে।
প্রায় পাঁচ বছরে বিভিন্ন পক্ষের প্রচেষ্টায় বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ চীনের প্রস্তাবনা থেকে আন্তর্জাতিক ঐকমত্যে পরিণত হয়েছে। সেইসঙ্গে এটি সহযোগিতার ধারণা থেকে বিস্তৃত হয়েছে সমৃদ্ধ বাস্তব অভিজ্ঞতায়। বৈশ্বিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে এনেছে নতুন পদক্ষেপ ও সাফল্য।
বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও জনগণের মর্যাদা নিশ্চিতের মূল ভিত্তি উন্নয়ন
মোজাম্বিকের প্রেসিডেন্ট ফিলিপে জাসিন্তো নিউসি বলেন, বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জন, জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জনগণের মর্যাদা নিশ্চিত করার মৌলিক ভিত্তি হলো উন্নয়ন। তিনি বলেন, দারিদ্র্য দূরীকরণ, খাদ্য নিরাপত্তা, শিল্পায়ন, উদ্ভাবন ও টেকসই উন্নয়নের মতো অগ্রাধিকার ইস্যুকে সামনে রেখে উন্নয়নকে বৈশ্বিক এজেন্ডার কেন্দ্রে আনার ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সুবিধা ও বাস্তব ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে অংশীদারত্বমূলক মডেলের দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত। এই চেতনায় চীনের সঙ্গে সহযোগিতাকে রূপান্তর ও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখে মোজাম্বিক। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরে বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগের নেতৃত্ব প্রদানে তার দেশ চীনকে পূর্ণ সমর্থন দিতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
ঘানার প্রেসিডেন্ট জন দ্রামানি মাহামা বলেন, বর্তমান বিশ্ব নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এসব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমাজের যৌথ প্রজ্ঞা, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাধান প্রয়োজন। তার মতে, এই ফোরাম জ্ঞান ভাগাভাগি ও সহযোগিতা জোরদারে একটি মূল্যবান প্লাটফর্ম। তিনি বলেন, বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ, বৈশ্বিক উন্নয়ন প্রচার কেন্দ্র নেটওয়ার্কের ভূমিকার প্রশংসা করে ঘানা, যা বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর যৌথ উন্নয়নের পথ প্রসারণেও গুরুত্বপূর্ণ।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ এমন একটি বিশ্বাসকে প্রতিফলিত করে, যাতে বলা হয়েছে—অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং সমান সুযোগের ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয় টেকসই শান্তি ও স্থিতিশীলতা।
তিনি আরও বলেন, চীনের সঙ্গে বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ, উচ্চমানের বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতা, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের মতো কাঠামোয় সহযোগিতা জোরদার করতে এবং যৌথ স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তরিত করে সার্বিক কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও সুদৃঢ় করতে প্রস্তুত পাকিস্তান।
‘চীনের উন্নয়ন বিশ্বের জন্য সুযোগ’
সম্মেলনে ‘ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে বৈশ্বিক দক্ষিণের উচ্চমানের উন্নয়ন’, ‘জলবায়ু সহনশীল ভবিষ্যৎ নির্মাণ’ এবং ‘বহুপাক্ষিক সহযোগিতার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন’ শীর্ষক তিনটি বিশেষ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
সেনেগালের প্রচার, টেলিযোগাযোগ ও ডিজিটাল বিষয়ক মন্ত্রী মুসা সারে গত বছর চীন সফরে আসেন। চেচিয়াংয়ের হাংচৌ শহরের ডিজিটাল ইকোসিস্টেম ব্যবস্থা এবং থিয়েনচিনের ইকো-বন্দরের টেকসই উন্নয়ন তাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করে।
‘জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নেতৃত্ব দেখিয়েছে চীন’।‘জলবায়ু তথ্যের প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থা’, দাবানল প্রতিরোধ, টেকসই উন্নয়নের জন্য সামুদ্রিক সরঞ্জাম বাক্সের মতো প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার সক্ষমতা জোরদারে সহায়তা করছে চীন।
মিসরের আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রধান মাহমুদ শাহীন বলেন, চীন সরকার বৈশ্বিক আবহাওয়া সহযোগিতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। সর্বজনীন প্রাথমিক সতর্কবার্তার চীনা সমাধান ‘মাজু’ মিসরে স্থাপন করা হয়েছে। এখন এর কাস্টমাইজেশন চলছে। এ ছাড়া অনেক মিসরীয় আবহাওয়া গবেষক চীনে এসে আবহাওয়া আধুনিকায়নের উন্নত অভিজ্ঞতা নিয়েছেন।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো বলেন, চীন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নবায়নযোগ্য শক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্যাটেলাইট অ্যাপ্লিকেশনের ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করেছে। তিনি বলেন, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা চীনের সঙ্গে বাস্তব সহযোগিতা জোরদার করবে এবং আরও উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিস্তৃত পরিসরে জনগণকে সুবিধা দেবে বলে আশা করছে।
এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের (এআইআইবি) প্রেসিডেন্ট জৌ চিয়া ই বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিবছর ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল ঘাটতি রয়েছে। বিশ্বের এখন একসঙ্গে কাজ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অবকাঠামো ও উৎপাদন খাতের উন্নয়নে সমর্থন দেওয়া প্রয়োজন। তার মতে, বহুপাক্ষিক পদক্ষেপকে একত্রিত করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য রাখে চীনের বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ, যেখানে এআইআইবি সক্রিয় ভূমিকা রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
পূর্ব তিমুরের উপপ্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো আসানসিয়াও লোপেস নাম বলেন, গত কয়েক দশকে চীনের দ্রুত উন্নয়ন কেবল নিজের জনগণকেই সুবিধা দেয়নি, বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও উন্নয়ন সহযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তার মতে, চীনের অভিজ্ঞতা থেকে পূর্ব তিমুরের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিখতে পারে।
‘উন্নয়নের জন্য ঐক্য ও বাস্তব পদক্ষেপ জরুরি’ বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি জটিল ও পরিবর্তনশীল। উন্নয়নের ঘাটতি ক্রমশ বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, ডিজিটাল বিভাজন, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার সমস্যা তীব্রতর হচ্ছে এবং বৈশ্বিক উন্নয়ন প্রতিনিয়ত নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।
এই সম্মেলন ‘ভবিষ্যৎ সৃষ্টির জন্য যৌথ কর্ম পরিকল্পনার ফলাফল তালিকা’ প্রকাশ করেছে, যা বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগের আটটি মূল ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে আরও প্লাটফর্ম গঠন, সম্পদ সংগ্রহ, পদক্ষেপ ত্বরান্বিত ও সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে বৈশ্বিক উন্নয়নে অবদান রাখবে।
তালিকায় ৫০টি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ রয়েছে, যেমন ‘বৈশ্বিক নারী সক্ষমতা কেন্দ্র’ নির্মাণ, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৃষি উদ্ভাবন কেন্দ্র নির্মাণ, ‘মাজু’ ক্লাউড পাবলিক সংস্করণের নতুন প্রজন্ম প্রকাশ, ‘ডিজিটাল সাউথ’ ব্র্যান্ড সৃষ্টি ইত্যাদি।
ভানুয়াতুর ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রী মার্ক আটি মাহের বলেন, ২০২৪ সালে ‘বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগের বন্ধুদের দলে’ যোগ দেওয়ার পর ভানুয়াতু গভীর সহযোগিতা, জ্ঞান ভাগাভাগি ও নিজস্ব অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বাস্তব সমর্থন থেকে অনেক উপকৃত হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু অভিযোজন ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ একটি প্লাটফর্ম হলো বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ। এটি বৈশ্বিক অংশীদারত্বের চেতনা প্রতিফলিত করে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর যৌথ স্বপ্নকে বাস্তব ফলাফলে রূপান্তরে সক্রিয় ভূমিকা রাখে।’
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের উন্নত অবকাঠামো নির্মাণ প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নত হয়েছে। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের পুরো পথ চালু হয়েছে, যা আট কোটি মানুষের প্রত্যক্ষ উপকার করছে এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সহযোগিতার আদর্শ উদাহরণ হয়ে উঠেছে। তিনি চীনের প্রস্তাবিত চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধারণার উচ্চ প্রশংসা করেন। চীনের সঙ্গে যৌথভাবে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, উন্নয়নের সুযোগ গ্রহণ এবং বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন রক্ষায় বাংলাদেশ প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
হাজার মাইলের পথও শুরু হয় প্রথম পদক্ষেপ দিয়ে: চীনা প্রবাদ
গ্রেনাডার পর্যটন, সৃজনশীল অর্থনীতি ও সংস্কৃতি মন্ত্রী অ্যাড্রিয়ান টমাস বলেন, চীন সব সময় বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা করেছে, বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণ করেছে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর উদ্বেগের বিষয়কে সম্মান ও বিবেচনা করেছে। তিনি জানান, ‘আমরা উচ্চমানের বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক উন্নয়ন এজেন্ডার অধীনে উচ্চমানের সহযোগিতা সমর্থন করি।’
তার দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল রূপান্তর, জলবায়ু সহনশীলতা, স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করে জনগণের যৌথ কল্যাণ রক্ষায় প্রস্তুত বলেও জানান টমাস।
সূত্র: স্বর্ণা-ফয়সল-লিলি,চায়না মিডিয়া গ্রুপ।
