আমার কাগজ প্রতিবেদক
‘মা আজ মারা গেলেন, কিংবা হয়তো গতকাল, আমি ঠিক জানি না’, আলবেয়ার কাম্যু রচিত এই লাইনগুলো পৃথিবীর ইতিহাসে যেকোনো উপন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী শুরু বলে অনেকে অভিমত দেন। অস্তিত্ববাদী কাম্যু আধুনিক সমাজে মানুষে-মানুষে বিচ্ছিন্নতা নিয়ে যে চরম শক্তিশালী বার্তা দেন তা ধ্রুপদি।
সম্প্রতি বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টালমাটাল করা এক ঘটনায় জানা যায়, এক বয়োবৃদ্ধ মা, একাকী এক নোংরা ঘরে মারা গেছেন এবং উনি মারা যাওয়ার অনেক পরে ওনার লাশ উদ্ধার হয়। মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মানুষেরা ওনার প্রতিষ্ঠিত ও প্রতিপত্তিওয়ালা সন্তানদের প্রতি ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে। এর প্রভাবে ওনার এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সন্তানের বদলি হয় বলে জানা গেছে। তবে এ ঘটনায় সন্তানদের বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কাউকে দোষী বা নির্দোষ বানানোর বাইনারি তর্ক এড়িয়ে একে সমাজতাত্ত্বিক লেন্সে দেখা জরুরি।
বাংলাদেশের সমাজ আজ এক অদ্ভুত দ্বিধাবিভক্ত অবস্থানে দাঁড়িয়ে। একদিকে বৈশ্বিক পুঁজিবাদী অর্থনীতির টানে নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ঢেউ; অন্যদিকে শতাব্দীপ্রাচীন পারিবারিক বন্ধন, ধর্মীয় আদর্শ ও সামষ্টিক মূল্যবোধের শিকড়। এই টানাপোড়েনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকাশ ঘটে যখন কেউ বৃদ্ধ মা-বাবাকে ওল্ড হোমে বা শিশুকে ডে-কেয়ারে রাখার কথা বলেন। সমাজ তখন একযোগে নিন্দার আঙুল তোলে। কিন্তু এই নিন্দার পেছনে কী আছে? শুধুই ভালোবাসা, নাকি ক্ষমতা, কাঠামো ও ইতিহাসের জটিল বুনন?
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দিয়ে শুরু করা যাক। বাংলার ভূমিব্যবস্থা ও কৃষি অর্থনীতি যৌথ পরিবারকে একটি কার্যকর উৎপাদন একক হিসেবে গড়ে তুলেছিল। মোগল ও ব্রিটিশ আমলে জমিদারি ব্যবস্থায় পরিবারই ছিল সম্পদের ধারক ও বাহক। জমি অবিভক্ত রাখতে হলে পরিবার অবিভক্ত থাকা জরুরি ছিল। ফলে প্রবীণ সদস্যরা ছিলেন কেবল ‘বোঝা’ নন, তাঁরা ছিলেন জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সম্পদের কেন্দ্রীয় সংরক্ষক।
বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোকে মাথায় রেখেই কল্পনা করা যায় যে আমরা একই সঙ্গে প্রচুর ডে-কেয়ার ও ওল্ড হোম তৈরি করতে পারি, যেখানে দাদু-নাতিরা আমাদের পুরোনো কাঠামোর নস্টালজিয়াকে অনেকখানি অক্ষুণ্ন রেখেও নতুন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে পারবে।
আর আদিকাল থেকেই একটি কথা প্রচলিত আছে—ইট টেকস আ ভিলেজ টু রেইজ আ চাইল্ড। একটা শিশুকে বড় করার দায়িত্ব পুরো সমাজের। আর পুরোনো সামাজিক কাঠামোতে সেই কাজটাই হতো। একান্নবর্তী পরিবারের দাদি, নানি, চাচি, খালা তো বটেই, পাড়া প্রতিবেশীসহ সবাই মিলে শিশুর বেড়ে ওঠায় ভূমিকা রাখতেন। একক মায়ের ওপর সম্পূর্ণ চাপ পড়ার ধারণাটিই ছিল অনুপস্থিত। অর্থাৎ যৌথ পরিবার ছিল তৎকালীন সমাজের একটি কার্যকর সামাজিক বিমা ব্যবস্থা।
তবে, ব্রিটিশ আমলে ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৪৭-এর দেশভাগ বাংলার পারিবারিক কাঠামোয় বড় ধাক্কা দেয়। ভিটেমাটি হারানো মানুষ শহরে আসতে বাধ্য হন, কিন্তু মানসিকতায় যৌথ পরিবারের আদর্শ অক্ষুণ্ন থাকে। সমাজের কাঠামো ভেঙে পুঁজিবাদ প্রচুর ফ্রি শ্রমিক তৈরি করল ঠিকই, কিন্তু তাদের জন্য সেফটি নেট দিল না। ফলে এই বিচ্ছিন্নতা ও আদর্শের মধ্যে ফাঁক তৈরি হয়। মানুষ তার পুরোনো সামাজিক কাঠামোর জন্য হাহাকার করতে থাকে; কিন্তু বাধ্য হয় নতুন একক ব্যবস্থায় টিকে থাকার।
ইউরোপ যখন এই টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যায়, তখন এ বিষয়টাকে বিশ্লেষণ করেছিলেন আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের জনক এমিল ডুর্খেইম। তিনি দেখান যে সমাজে দুই ধরনের সংহতি অবস্থান করে; একটি হচ্ছে যান্ত্রিক সংহতি, যাতে মানুষ একই বিশ্বাস ও মূল্যবোধ শেয়ার করে সংযুক্ত থাকে এবং আরেকটি জৈব সংহতি, যাতে বিভিন্নতা ও বিশেষায়িত ভূমিকার মাধ্যমে সমাজ টিকে থাকে।
বাংলাদেশ এখন এই দুইয়ের মাঝামাঝি এক ক্রান্তিকালে। পুরোনো জৈব সংহতির ভিত্তি তথা যৌথ পরিবার ও বৃহত্তর সামাজিক কাঠামোর মূল্যবোধ দুর্বল হচ্ছে, কিন্তু নতুন যান্ত্রিক সংহতির প্রতিষ্ঠান (রাষ্ট্রীয় সামাজিক সুরক্ষা, পেশাদার পরিচর্যা ব্যবস্থা) এখনো শক্তিশালী হয়নি।
আরেক সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বোর্দিওর হ্যাবিটাস তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের আচরণ ও রুচি তার শ্রেণিগত অবস্থান ও সামাজিকীকরণ থেকে তৈরি হওয়া এক গভীর অভ্যন্তরীণ ছাঁচ থেকে আসে। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজে ‘সন্তান নিজে মানুষ করা’ এবং ‘বাবা-মাকে ঘরে রাখা’ হলো উচ্চ সাংস্কৃতিক পুঁজির প্রতীক।
ওল্ড হোমে রাখা মানে এই পুঁজি হারানো। এর ফলাফল সামাজিক মর্যাদার অবনমন। তাই মানুষ অনেক সময় নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়েও পরিচর্যার ভার বহন করেন, কারণ সামাজিক লজ্জার ভয় অর্থনৈতিক যুক্তির চেয়ে শক্তিশালী।
এর বড় শিকার হচ্ছেন শিশু, বৃদ্ধ ও নারীরা। শিশুর বেড়ে ওঠায় সমাজ যেই দায়িত্ব পালন করত, তা করতে পারছে না রাষ্ট্র কিংবা বাজার। এমনকি এই প্রচেষ্টাগুলোও প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে, কারণ ডে-কেয়ার বা ওল্ড হোমের মতো ব্যাপারগুলো পুরোনো কাঠামোর জন্য হাহাকার করা মানুষদের অপরাধ উসকে দিচ্ছেন। তাঁরা সেই নস্টালজিয়ায় ভুগে ভাবছেন, ওল্ড হোম সন্তান ও সমাজের জন্য ব্যর্থতার চিহ্ন, আর ডে-কেয়ারে রাখা শিশুদের মায়েরা দায়িত্বে অবহেলা করছেন। ফলে এই বৃদ্ধরা না পাচ্ছেন ওল্ড হোমের সুবিধা, না পাচ্ছেন পুরোনো কাঠামোর আশীর্বাদ।
শিশুদের বেলায় একই সঙ্গে এই অবস্থার শিকার মা ও শিশু। মার্ক্সীয় তাত্ত্বিকেরা দেখিয়েছেন যে পুঁজিবাদ পরিবারকে বিনা মজুরির পুনরুৎপাদন শ্রমের কেন্দ্র বানিয়ে রাখে। শিশু পালন, বৃদ্ধ সেবা এই কাজগুলো পরিবারের মধ্যে (প্রধানত নারীর মাধ্যমে) বিনা মূল্যে সম্পন্ন হলে রাষ্ট্র ও পুঁজির বিশাল খরচ বেঁচে যায়। অন্যদিকে সামাজিক কাঠামো ভেঙে একক পরিবার হওয়ায় নারীর ওপর চাপও আছে—রোজগার করেন।
বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতায় বৃদ্ধ পরিচর্যা ও শিশু পালন উভয়টিকেই মূলত নারীর কাজ হিসেবে দেখা হয়। পুত্রবধূ, মা কিংবা বোন এই ভার বহন করবেন বলে আশা করা হয়। এর ফলে যখন কোনো পরিবার ওল্ড হোম বা ডে-কেয়ারের সিদ্ধান্ত নেন, সমালোচনার তিরটা বিদ্ধ করে মূলত নারীকে। এই প্রক্রিয়ায় নারীকে একই সঙ্গে একক পরিবারের জন্য উপার্জনকারী এবং সন্তান ও বৃদ্ধদের সার্বক্ষণিক লালন-পালনের এক অসম্ভব দায়িত্ব দেওয়া হয়। পুরোনো কাঠামোর প্রতি নস্টালজিয়া এবং নতুন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা—দুটির সমন্বয়ের ইউটোপিক মনস্তত্ত্বের শিকার হয়ে পড়েন নারীরা।
এই অবস্থায় দেখা যায় যে গার্মেন্টস শিল্পে ৪০ লাখেরও বেশি নারী শ্রমিক কাজ করেন, কিন্তু রাষ্ট্র সাশ্রয়ী মানের ডে-কেয়ার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেনি। ফলে এই নারীরা সন্তান রাখবেন কোথায়—এই প্রশ্নটি পুরোপুরি কাঠামোগত সংকট, কিন্তু উত্তরটি চাপানো হচ্ছে ব্যক্তির নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে। ‘ভালো মা’ হওয়ার সামাজিক চাপ আসলে পুঁজির স্বার্থ রক্ষার একটি মতাদর্শগত হাতিয়ার।
এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ‘লোকে কী বলবে’র ভয়। মিশেল ফুকো দেখিয়েছেন কীভাবে সমাজে ‘স্বাভাবিক’ ও ‘অস্বাভাবিক’-এর সংজ্ঞা নির্মিত হয় ক্ষমতার মাধ্যমে। এখানে নানা ধরনের সামাজিক আদর্শের আধিপত্য চাপানোর চেষ্টা হয়। পুরোনো প্রথা অকেজো হয়ে গেলেও একে আদর্শ ধরে সামাজিক লজ্জা দেওয়া হয়। ধর্মের নাম করে ডিসকোর্স তৈরি করা হয়ে যে সন্তান লালন-পালন কিংবা বৃদ্ধ পিতামাতার যত্ন পুরোনো কাঠামোর মতো করেই করতে হবে। ধর্মীয় বক্তৃতা, মিডিয়া ডিসকোর্স ও সামাজিক গসিপ মিলে একধরনের প্যানোপটিকন তৈরি করে, এই নজরদারির দুনিয়ায় সামাজিক স্কোর খুব জরুরি হয়ে ওঠে।
এর ফলে যে পরিবার বৃদ্ধ বাবাকে ওল্ড হোমে রাখে, সন্তানকে ডে-কেয়ারে রাখে, তারা সব সময় একটা মানসিক পীড়নে থাকে যে প্রতিবেশী, আত্মীয়, এমনকি রাস্তার লোকও বিচার করছে। এই অদৃশ্য নজরদারি মানুষকে সামাজিকভাবে ‘অনুমোদিত’ আচরণে বাধ্য করে। এই চাপ এতটাই যে এর ফলে মানুষ তাঁর নিজের, সন্তানের বা পিতামাতার ভালোর চেয়ে সমাজের চোখে ভালো মানুষ হওয়ার পারফরম্যান্সকে বেশি গুরুত্ব দিতে থাকে।
সব মিলিয়ে এর মূল্য চুকাতে হচ্ছে আমাদের পরিবারগুলোকে। শিশুরা না পারছে ঠিকঠাক বেড়ে উঠতে, আর বৃদ্ধরা না পাচ্ছেন প্রয়োজনীয় যত্ন। ওল্ড হোম ও ডে-কেয়ার এই শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা করছে, কিন্তু সমাজ তা বিচ্যুতি হিসেবে দেখছে, কারণ পুরোনো কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসার মানসিক প্রস্তুতি এখনো হয়নি।
চীনসহ পূর্ব এশিয়ার কনফুসীয় মূল্যবোধের সমাজগুলোও একসময় ওল্ড হোমকে পারিবারিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখত। কিন্তু রাষ্ট্রীয় পরিচর্যা নীতি, পেশাদার প্রশিক্ষণ ও সামাজিক মনোভাব পরিবর্তনের মাধ্যমে এই দেশগুলো এমন একটি ব্যবস্থা গড়েছে, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক পরিচর্যা পরিবারের পরিপূরক হিসেবে স্বীকৃত। এই সমাজগুলো মেনে নিয়েছে যে আমাদের পুরোনো কাঠামোর প্রতি অক্ষম নস্টালজিয়ার শিকার আমাদের শিশু, বৃদ্ধ ও নারীরা হতে পারে না।
ওল্ড হোম বা ডে-কেয়ারকে নৈতিক বিতর্কের বিষয় বানানো আসলে আসল প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া। আসল প্রশ্ন হচ্ছে, বাজার ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামোতে কে পরিচর্যা করবে, কীভাবে করবে, এবং সেই পরিচর্যার মূল্য কে দেবে?
বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোকে মাথায় রেখেই কল্পনা করা যায় যে আমরা একই সঙ্গে প্রচুর ডে-কেয়ার ও ওল্ড হোম তৈরি করতে পারি, যেখানে দাদু-নাতিরা আমাদের পুরোনো কাঠামোর নস্টালজিয়াকে অনেকখানি অক্ষুণ্ন রেখেও নতুন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে পারবে।
