এ টি এম মোস্তফা কামাল
স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থায় সংবিধান লংঘন করে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের সরকারী চাকুরীতে বৈষম্যযুক্ত অযৌক্তিক কোটা সুবিধা প্রদান করায় সাধারণ ছাত্র সমাজ সংক্ষুব্দ হয়ে শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে কোটা বিরোধী আন্দোলন শুরু করে-যা ক্রমান্বয়ে জোরদার হতে হতে শেষ পর্যন্ত সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে রুপান্তরিত হয়। ছাত্র জনতার প্রচন্ড শক্তিশালী গণঅভ্যুত্থানের মুখে প্রাণ ভয়ে ভীত শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করে দিল্লীতে আশ্রয় গ্রহণ করে। আন্দোলনে অত্যন্ত সফলভাবে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র নেতারা নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ডঃ মুহাম্মদ ইউনুসকে বিদেশ থেকে ডেকে এনে তাঁর নেতৃত্বে অর্ন্তবর্তী সরকার গঠন করে। দেশের ঐ ক্রান্তিলগ্নে সেনাবাহিনী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দীর্ঘদিন যাবত প্রেস ক্লাব এলাকা ঘিরে চলতে থাকে। জুলাই আন্দোলনের মূল সুর ছিল বৈষম্য বিরোধী অপশাসন থেকে দেশকে মুক্ত করা।
অন্তর্র্বতী সরকারের প্রধান দায়িত্ব ছিল দেশ থেকে অপশাসন দুর করে চাঁদাবাজি মুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন কায়েমে ব্রতী হওয়া- দেশে আইনের শাসন কায়েম করা- সর্বোপরি জুলাই গণঅভ্যুত্থান পূর্ববর্তী সরকারগুলো সংবিধান লংঘন করে দেশের নাগরিকদের সংগে যতো ধরণের বৈষম্য মূলক আচরণ করেছে সেগুলো সমূলে উৎপাটন করা।
উল্লেখ্য, কোটা বিরোধী তথা বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমেই স্বৈরাচারকে উৎখাত করা হয়েছিল। কোটা বৈষম্যের সঙ্গে সংবিধান বিরোধী সকল বৈষম্য এবং অপশাসন সম্পৃক্ত- এটাই জুলাই বিপ্লবের মূল চেতনা।
অন্তর্বর্তী সরকারের সকল কর্মকান্ডের শ্লোগান হওয়া উচিৎ ছিল- পাবলিক চেয়ারে বসে কেউ দুর্নীতি করতে পারবে না- অপশাসন চালাতে পারবে না। এরূপ কাজ জনগণের কাছে দৃশ্যমান করানোর জন্য ৬ মাস সময়ই যথেষ্ট। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেভাবে কাজ কর্ম শুরু না করে বিভিন্ন কমিশন গঠন করে দিয়ে সময় ক্ষেপণের আশ্রয় নিলেন- বিষয়টা এমন যে কমিশন রিপোর্ট পাবার আগে তাঁরা যেন কোন কাজ শুরুই করতে পারছিলেন না।
ইতোমধ্যে জুলাই যোদ্ধাদের পক্ষ থেকে দাবী উঠলো জুলাই ঘোষণা নিয়ে। তাঁদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল সরকার কর্তৃক জুলাই ঘোষণা দেয়া না হলে তাঁরা নিজেরাই সেটা ঘোষণা করবেন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হোল সরকারই জুলাই ঘোষণা জারী করবেন। অথচ শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করার পুর্বেই ছাত্র নেতৃত্বের পক্ষ থেকে ৬ দফা/১১ দফার মতো করে জুলাই ঘোষণা (July Declaration) জারী করা অসম্ভব কিছু ছিলো না। সরকারের পক্ষ থেকে সুদীর্ঘ সময় নিয়ে বিভিন্ন কমিশনের রিপোর্টকে সমন্বিত করে ঐক্যমত্য কমিশন গঠন করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংগে সুদীর্ঘ সময় আলাপ আলোচনা করে জাতীয় সনদ প্রস্তুত করে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫নাম দিয়ে জাতীয় সনদ প্রকাশ করা হলো। জুলাই জাতীয় সনদ একটা বিতর্কিত সনদ। জুলাই সনদের শিরোনামটাকে ও বিতর্কিত করা হয়েছে।
জুলাই বিপ্লব অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০২৪ সালে আর জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন কর্তৃক ১৭ অক্টোবর- ২০২৫ তারিখে মুদ্রিত বইয়ের প্রচ্ছদে নাম দেয়া হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫। ইহার দ্বারা তো জুলাই বিপ্লবের ইতিহাসকে বিকৃত করা হলো। এই নামকরণের মাধ্যমে ঐক্যমত্য কমিশন কি জুলাই বিপ্লব ২০২৪কে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছেন?
তাছাড়া জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ এর পটভূমি-তে ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে কোটা বিরোধী আন্দোলনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোটা ও বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন সম্পর্কে কিছুই উল্লেখ করা হয়নি (পৃষ্ঠা ২ এর প্রথম অনুচ্ছেদ)। ইহার মাধ্যমে ২০২৪ সালের কোটা বিরোধী আন্দোলনকে তো অস্বীকার করা হলো। বিষয়টি কি জুলাই যোদ্ধা, এনসিপি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের কারো নজরে আসেনি।
জুলাই সনদ প্রণয়নের জন্যে ৬টি কমিশন গঠনের কোন আবশ্যকতা ছিলো না। অন্তর্বর্তী সরকার তাঁদের ইচ্ছা মাফিক বিভিন্ন কমিশন গঠন করেছে। কিন্তু কোটাসহ সংবিধান লংঘন করে নাগরিকদের মাঝে বৈষম্য সৃষ্টি করে যতো আইন কানুন প্রণয়ন করা হয়েছে সেগুলো চিহ্নিত করার জন্যে কোন কমিশন গঠন করাই হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার নিজে ও সেগুলো চিহ্নিত করার কোন ব্যবস্থা নেয়নি। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনামলে সংবিধান লংঘন করে বিশেষ শ্রেণী/গোষ্ঠীকে চাকুরীর কোটাসহ বৈষম্য মূলক যে সকল সুযোগ/সুবিধা প্রদান করা হয়েছে জাতীয় সনদে সে বিষয়ে কোন কিছুই উল্লেখ করা হয়নি।
জুলাই সনদে সংবিধান-নির্বাচন ব্যবস্থা-বিচার বিভাগ-জনপ্রশাসন-পুলিশ-দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত বিষয়ে ৮৪টি সুপারিশ রয়েছে। তন্মধ্যে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত সুপারিশ হচ্ছে ৪৮টি যা মোট সুপারিশের ৫৭%। এর মধ্যে চাকুরীর কোটা সংক্রান্ত কিংবা সংবিধান বিরোধী অন্যান্য বৈষম্য সম্পর্কে একটা সুপারিশ ও নেই। জুলাই সনদে জুলাই আন্দোলনের মূল চেতনা পুরোপুরি উপেক্ষিত।
সংবিধান বাতিল (REPEAL) না করে সংবিধান সংস্কার পরিষদ হয় কি ভাবে? সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ হয় কি করে? যতক্ষণ পর্যন্ত সংবিধান বহাল থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সকল কর্মকান্ড পরিচালিত হবে সংবিধান অনুযায়ী। সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে সংবিধান অনুসরণ করে। কাজেই, নবনির্বাচিত সংসদের কার্যক্রম চলবে সংবিধান অনুসরণ করে।
বাংলাদেশের সংবিধান তো বিশ্বমানের সংবিধান, তবে শতভাগ ত্রুটিমুক্ত নহে। সংবিধানের একটা বিশাল ত্রুটি হচ্ছে – পার্বত্য চট্টগ্রাম Hill Tracts Regulation ১৯০০ অনুযায়ী শাসিত হবে – সেটা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত না করা। পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য পৃথক প্রজাস্বত্ব আইন এবং ভ‚মি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল প্রণয়ন করা অত্যাবশ্যক। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে জাতীয় সনদে কোন কিছু উল্লেখ করা হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাদ দিয়ে যে সনদ সেটাকে জাতীয় সনদ বলা যাবে কি? অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক ১৩ নভেম্বর, ২০২৫ তারিখে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ জারী করা হয়েছে। জাতীয় সনদ তো জাতীয় সনদ সেটা জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) হতে যাবে কেন? এতে প্রতীয়মান হয় যে জাতীয় সনদের অন্যান্য সুপারিশ বাস্তবায়নে অন্তর্র্বতী সরকারের কোন ইচ্ছে ছিল না।
সংবিধান মোতাবেক নির্বাচিত জাতীয় সংসদ একটা স্বাধীন সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান- আইন প্রণয়নের একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। সংবিধান সংশোধনের INHERENT POWER তো জাতীয় সংসদের রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত সংবিধান সংস্কারের সুপারিশ সমূহ মোতাবেক সংবিধান সংশোধনে নবনির্বাচিত জাতীয় সংসদ বাধ্য নহে- তাতে ইহার স্বাধীন অস্তিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তবে সংবিধান সংস্কারের সুপারিশ সমূহের মাঝে কোন সুপারিশ গ্রহণযোগ্য মনে করলে নবনির্বাচিত সংসদ সেটা তাঁদের বিবেচনায় নিতে পারেন।
শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনামলে উপজেলা পরিষদ আইন সংশোধন করে জাতীয় সংসদ সদস্যগণকে নিজস্ব নির্বাচনী এলাকার উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা বানানো হয়েছে। এতে সংবিধান লংঘিত হয়েছে। এটা বৈষম্য মূলক আইন। এই আইন বাতিলের কোন উদ্যোগ অন্তর্বর্তী সরকার গ্রহণ করেনি। এই আইন বহাল রেখে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি অনুসরণে অতিরিক্ত ১০০ সদস্যের উচ্চ কক্ষ গঠিত হলে দেশে চাঁদাবাজি এবং দুর্নীতি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবার সম্ভাবনা রয়েছে। সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি অনুসরণে ৪০০ সদস্যের দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ গঠিত হলে সকল দলের ক্ষমতার অংশীদার হবার সুযোগ সৃষ্টি হবে – সরকারী অপশাসনের বিরোধিতা করার মত কোন দল আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
তাতে স্বৈরাচারী অপশাসন তথা মাফিয়াতন্ত্র দীর্ঘায়িত হবার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। এটাই ছিল ক্ষমতালিপ্সু স্বৈরাচার শেখ হাসিনার ২০৪১ সাল পর্যন্ত দেশ শাসন করার মহাপরিকল্পনা। একমাত্র বিএনপি সহযোগিতা না করায় শেখ হাসিনার পক্ষে সেটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
তাছাড়া দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ চালু করার মতো সামর্থ্য এবং পরিবেশ কোনটাই বাংলাদেশের নেই। তাছাড়া, সংবিধান সংস্কারের ৪৮টা সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হলে বাংলাদেশে যে সিঙ্গাপুরের মতো সুশাসন কায়েম হয়ে যাবে এরূপ কোন গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে না। অধিকন্তু, অন্তর্বতী সরকার চাঁদাবাজি বন্ধে- দূর্নীতি বন্ধে- দেশে সুশাসন কায়েমে কোন উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিতে পারেনি। বরং অন্তর্বতী সরকারের কোন কোন সদস্য নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের জন্য কর অব্যাহতির সুযোগসহ নানাবিধ অনৈতিক সুবিধা গ্রহণে ও কার্পণ্য করেননি। তাছাড়া অন্তর্বতী সরকারের অরো কিছু উল্লেখযোগ্য ব্যর্থতা রয়েছে- অনেক দিন যাবত কোম্পানিগঞ্জের সাদা পাথর চুরি হয়েছে-দেশের অন্যত্র পাচার হয়েছে – সাদা পাথর নিঃশেষ হবার আগে সেটা বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নজরে আসেনি। কোন আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবান না করে আলোচনার মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালকে দুবাই ভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড এর হাতে তুলে দেবার জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালিয়েছিল- বন্দর সংশ্লিষ্ট কিছু সংগঠনের প্রবল বিরোধিতার মুখে সেটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
সংবিধান সংস্কার কমিশন তাঁদের রিপোর্ট দাখিলে সময় নিয়েছে প্রায় এক বছর। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো তাঁদের মতামত দিতে সময় নিয়েছিল এক মাসের বেশী। ঐক্যমত্য কমিশন তাঁদের রিপোর্ট দিতে সময় নিয়েছে কয়েক মাস। আর ১ জন ভোটার হ্যা/না ভোটে সিল মারতে সময় নিয়েছে কয়েক সেকেন্ড। কাজেই কেউ বুঝে শুনে হ্যাঁ ভোটে সীল দিয়েছে দাবী করার কোন অবকাশ নেই। সরকারের পক্ষ থেকে জনগণকে গণভোটের বিষয় বস্তু সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেবার আবশ্যকতা ছিল। না জেনে/না বুঝে দেয়া সীলের কোন তাতপর্য/মূল্য নেই। তদুপরি এক তৃতীয়াংশ ভোটার না ভোটে সীল দিয়েছে- তার মানে বিশাল জনগোষ্ঠী সংবিধান সংস্কারের বিপক্ষে মতামত দিয়েছে- সংবিধান সংস্কারের সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে চাইলে তাঁদেরকে ও পক্ষে আনতে হবে এবং পুনরায় গণভোটের আয়োজন করতে হবে। কমপক্ষে শতকরা ৯০-৯৫ ভাগ ভোটারকে পক্ষে আনার আগে সংবিধান সংস্কারের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা সঠিক হবে না। সিঙ্গাপুরে ক্যাসিনো স্থাপন করা নিয়ে বিতর্কের অবসানে একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে- ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে বিপক্ষে রেখে তাঁরা ক্যসিনো বসানোর কাজে হাত দেয়নি।
ভারতের প্রত্যক্ষ/পরোক্ষ সহযোগিতায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দেশে গুম-খুন- চাদাবাজি-পর্বতসম দুর্নীতি- মাফিয়াতন্ত্র এবং সমগ্র দেশে অপশাসন কায়েম করেছিল। ভারতের সংগে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেমন হবে সে ব্যাপারে জাতির কাছে গ্রহনযোগ্য একটা রূপরেখা তৈরী করে জাতীয় সনদে সেটার উল্লেখ থাকা বাঞ্চনীয় ছিল। ভারতের সংগে বাংলাদেশের সম্পর্কের একটা RED LINE টানা থাকতে হবে যা অতিক্রম করা কারো জন্যেই উচিৎ হবে না।
সংবিধানের ১৯(১) অণুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে-“সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন। “কিন্তু স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সরকার সংবিধানের উক্ত বিধান লংঘন করে বিশেষ শ্রেণীর মানুষ/ গোষ্ঠীকে বৈষম্য মূলক যে সব সুবিধা দিয়ে গেছে তার কিছু নমুনা নিম্নে উল্লেখ করা হলো- ১- বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের বিশেষ সুযোগ দিয়ে সরকারী চাকুরীর কোটা সুবিধা প্রদান; ২- বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরকে মাসিক সন্মানী ভাতা কবে থেকে প্রদান করা হচ্ছে? সেটা সংবিধান সন্মত কিনা ক্ষতিয়ে দেখার আবশ্যকতা রয়েছে; ৩- সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের আয়ের ৫০% অকারণে বেসরকারী নন-লাইফ বিমা কোম্পানী সমূহের মাঝে প্রতি ৩ মাস অন্তর সমহারে বন্টন করে দেয়া হচ্ছে; এটাকে অবিলম্বে বন্ধ করে এ অর্থ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সূচিত ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে যে অর্থ দেয়া হবে সে খাতে ব্যয় করা যায়; ৪- লার্জ ট্যাক্স পেয়ার-দের যে আয়কর অব্যাহতি দেয়া হচ্ছে তার পরিমাণ বছরে প্রায় ১ লক্ষ ৫০ হাজার কোটি টাকার মতো- তাঁরা পেতে পারলে ক্ষুদ্র ও মাঝারী ব্যবসায়ীরা সে সুযোগ পাবে না কেন? সরকারী কর্মকর্তাসহ অন্যরা আয়কর দিতে যাবে কেন? ৫- বড় বড় এনজিও-দেরকে কেন আয়কর অব্যাহতি দেয়া হবে? TAXABLE INCOME থাকলেই আয়কর দিতে হবে- এটাই হওয়া উচিৎ রাষ্ট্রের অনুসৃত নীতি; ৬- বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হার যদি হয় ১৫% সেক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ঋণের সুদের হার কেন হবে ২৩- ৩০%? বাণিজ্যিক ঋণ যদি বাৎসরিক কিস্তিতে পরিশোধ করা হয় তাহলে ক্ষুদ্র ঋণ কেন মাসিক কিস্তিতে পরিশোধ করা হবে? কিস্তি পরিশোধের চাপ সইতে না পেরে অনেক ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহীতা আত্বহননের পথ বেঁচে নেবে কেন? ব্যংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ক্ষুদ্র ঋণের সুদের হার ৫% নির্ধারণ করে দেয়া উচিৎ। ৭- পরিবার পিছু ১০০ বিঘা (১৯৭২ সালের আইন) এবং ৬০ বিঘা (১৯৮৪/২০২৩ সালের আইন) সিলিং মাঠ পর্যায়ে এখনো বাস্তবায়ন না করাতে সামাজিক বৈষম্য ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। একারণে দেশে চাঁদাবাজি/দূর্নীতি প্রচুর পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। অবিলম্বে ১০০/৬০ বিঘা সীলিং বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
৮- সংসদ সদস্যরা ট্যাক্স ফ্রি গাড়ীর সুবিধা পেলে সাধারণ নাগরিকরা সেই সুযোগ পাবে না কেন?
PRIVELEGE ACT এ এরূপ সুবিধা রাখা হবে কেন? কেন PRIVELEGE ACT সংশোধন করে এরূপ সুবিধা রহিত করা হবে না? ৯- সংসদ সদস্যদের একমাত্র অধিক্ষেত্র হচ্ছে সংসদ ভবন। সংবিধান লংঘন করে কেন তাঁদেরকে উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা বানানো হলো? অবিলম্বে সেটা রহিত করা অত্যাবশ্যক। ১০- Hill Tracts Regulation ১৯০০ অনুযায়ী পার্বত্য এলাকা শাসিত হবে- পার্বত্য এলাকার জন্যে পৃথক প্রজাস্বত্ব আইন এবং ভ‚মি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল প্রণয়ন করতে হবে- এরূপ বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি কেন? ১১- চাঁদাবাজিকে ফৌজদারী অপরাধ গণ্য করে কঠোর সাজার ব্যবস্থা রেখে দন্ড বিধি সংশোধন করার আবশ্যকতা রয়েছে; ১৩- পাবলিক অফিসে বসে কোন রকম দুর্নীতি করা যাবে না। মন্ত্রী- প্রতিমন্ত্রী-উপদেষ্টা-সকল ১ম শ্রেণীর সরকারী কর্মকর্তাদের ব্যাংক হিসাব এবং ব্যাংকিং লেনদেন সার্বক্ষণিক তদারকীর জন্যে উন্মুক্ত করে দিতে হবে।
১৪- সরকার কর্তৃক নিয়োজিত কোন ডাক্তার অফিস সময়ের পর প্রাইভেট চেম্বার করতে চাইলে নিজ হাসপাতালে সুনির্দিষ্ট স্থানে বসে সেটা করতে হবে- তাঁরা কোন প্রাইভেট ক্লিনিক/ হাসপাতালে গিয়ে পাইভেট প্রাক্টিস করতে পারবেন না- স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে এরূপ প্রজ্ঞাপণ জারী করার আবশ্যকতা রয়েছে; ১৫- MCQ Szstem বাদ দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে জার্মান/অষ্ট্রেলিয়া/যুক্তরাজ্য/ যুক্তরাষ্ট্র/ সিঙ্গাপুর- যে কোন একটি দেশের স্ট্যান্ডার্ডে গড়ে তুলতে হবে। ১৬- বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুরের ন্যায় জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতি অনুসরণ করতে হবে। ভারতের সংগে সম্পর্কের একটা রেড লাইন নির্ধারণ করতে হবে। ভারতের অনুকরণে সীমান্ত সড়ক নির্মাণ করতে হবে।
১৭- পৌরসভা-সিটি কর্পোরেশন- চট্টগ্রাম বন্দর- স্থল বন্দর কর্তৃপক্ষসহ যাদের নিজস্ব আয়ের উৎস রয়েছে তাঁদের জন্যে বৈদেশিক ঋণের অর্থায়নে কোন প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে না। দক্ষতা উন্নয়নের নামে বিদেশে প্রমোদ ভ্রমণের জন্যে বৈদেশিক ঋণে কোন প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে না। বৈদেশিক ঋণের অর্থে গৃহীত প্রকল্পে নতুন গাড়ী ক্রয়- বিদেশ প্রশিক্ষণ এবং পরামর্শক নিয়োগের কোন কম্পোনেন্ট থাকতে পারবে না। বৈদেশিক ঋণে কোন অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে না। ১৮- উন্নয়নের ঋণাত্বক তত্ব অনুসরণে দেশ যতোদিন পর্যন্ত ম্যাক্রো লেভেলে 1 st Quadrant এ প্রবেশ করতে না পারবে ততোদিন পর্যন্ত বাংলাদেশকে LDC status Maintain করে যেতে হবে; ১৯- সর্বক্ষেত্রে সুশাসন কায়েমের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
এ কাজগুলো অন্তবর্তী সরকারই শুরু করতে পারতো। তাঁরা এবিষয়ে কোন কিছুই করেনি। বরং ২০২৪ এর ছাত্র জনতার জুলাই বিপ্লবের পৃষ্ঠে চাবুক মারতে তাঁরা একটু ও কার্পণ্য করেনি। জুলাই বিপ্লব ২০২৪ কে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলতে তাঁরা জাতীয় সনদ ২০২৫ তৈরী করেছেন। এখন এ সকল বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের দায়িত্ব পড়েছে জননেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারের উপর। নতুন সরকারকে অত্যন্ত সতর্কভাবে এ বিষয়গুলো বাস্তবায়নে উদ্যোগী হতে হবে অন্যথায় ২য় জুলাই বিপ্লবের সন্মুখীন হতে হবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব।
