ফেনী প্রতিনিধি
প্রকৌশলী আজিজুলকে নারায়ণগঞ্জের তারাব পৌরসভা থেকে ফেনী পৌরসভায় বদলির আদেশ জারি হওয়ার পর থেকে ফেনীজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টির হয়। ফলে তার বদলির আদেশটি স্থগিত করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। আজ রোববার স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি করা হয়।
একই সাথে পৃথক আদেশে নির্বাহী প্রকৌশলী আজিজুলের দুর্নীতির বিষয়ে তদন্তের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে কমিটি করা হয়েছে।
জানা যায়, প্রকৌশলী আজিজুল ঘোষণা দিয়েছিলেন যে কোন মূল্যে ফেনী পৌরসভায় ফের বদলি হয়ে ফেরার। টাকার জোরে সেই অসম্ভবকে সম্ভবও করেছিলেন আলোচিত নির্বাহী প্রকৌশলী আজিজুল হক। ফেনী বাসী তার ইচ্ছে পূরণ হতে দেয়নি। একই সাথে তার দাম্ভিকতার পতন হলো।
গত ৩ জুন তাকে নারায়ণগঞ্জের তারাব পৌরসভা থেকে ফেনী পৌরসভায় বদলির আদেশ জারি হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের পৌর-১ শাখার উপসচিব মো. সগীর হোসেন স্বাক্ষরিত একই আদেশে ফেনী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাকির উদ্দিনকে ফেনী পৌরসভায় বদলি করা হয়েছে। এ বদলির সংবাদ প্রকাশ হলে ফেনীবাসীর মধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আজিজুল হক ছিলেন একজন আপাদমস্তক দুর্নীতিবাজ। ফেনীতে তিনি ‘মধুর হাড়ি’ পেয়েছিলেন বলেই বারবার এখানে আসতে ব্যাকুল থাকেন। তাছাড়া তার অবৈধ সম্পদের অধিকাংশের অবস্থান ফেনী জেলায়। এ কারণেই অন্যত্র বদলি করা হলে তিনি নানা কূটকৌশলে ফের ফেনীতেই ফিরে আসেন।
প্রাপ্ত তথ্য মতে, আজিজুল হক ফেনী পৌরসভায় সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন ২০০৭ সালে। ছয় বছর পর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে থেকে যান একই পৌরসভায়। টানা দেড় যুগ একই স্থানে থেকে হয়ে ওঠেন দুর্নীতির বরপুত্র। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে তৎকালীন সংসদ সদস্য নিজাম হাজারীকে ‘মামা’ পরিচয় দিয়ে নিজেকে ক্ষমতাধর হিসেবে জাহির করতেন। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দুর্নীতি করে গড়ে তুলেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে গত বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে তাকে চট্টগ্রামের বাঁশখালী পৌরসভায় বদলি করা হয়। কিছুদিনের ব্যবধানে বদলি করা হয় নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার তারাব পৌরসভায়। এরপর থেকেই ফেনীতে ফিরতে আজিজুল হক মরিয়া হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে ফেব্রæয়ারিতে নির্বাচনের পরই তিনি যেন চাঙ্গা হয়ে ওঠেন। নানা অজুহাত দেখিয়ে ঊর্ধ্বতনদের দৃষ্টি আকর্ষণের পাশাপাশি চলে হাইভোল্টেজ তদ্বির। এমনকি টাকার জোরে শিগগির ফেনীতে ফিরবেন বলে ঘনিষ্ঠদের বড়াই করে জানাতে থাকেন।
জানা গেছে, আজিজুল দীর্ঘদিন ধরেই একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পৌর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন। এর মধ্যে দুইটি প্রতিষ্ঠানের নাম জানা গেছে। একটি হলো ‘ফ্যাক্ট ডিজাইন এন্ড কনসালটেন্ট’। অপরটি হলো ‘সয়েল টেক ডিজাইন এন্ড কনসালটেন্ট’। দুটির ঠিকানাই ফেনী শহরের মাস্টারপাড়া ‘মদিনা ভবনে’। অভিযোগ মতে, আজিজুল হক ফেনী পৌরসভায় থাকাকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করেই ভবন নির্মাণ ও সম্প্রসারণে যে কোনো কাজের জন্য অনুমোদন নিতে আগতদের তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করাতে বাধ্য করতেন। এ জন্য নেয়া হতো উচ্চমূল্য। মূলতঃ নকশা তৈরি ও বাজেট প্রণয়ন তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করা হয়। এতে করে সহজে পৌরসভার অনুমোদন মিলতো। আরো ভয়ংকর তথ্য হচ্ছে, নকশা তৈরি ও বাজেট প্রণয়ন একজন স্বীকৃত প্রকৌশলীর মাধ্যমে করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এক্ষেত্রে অন্য এক নির্বাহী প্রকৌশলীর স্বাক্ষর জাল করেই সম্পাদন করা হয়েছে। খোদ আজিজুল হক পৌরসভার সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বে থাকায় এদ্দিন বিষয়টি গোপন ছিল।
তাছাড়া ফেনীতে কর্মরত থাকাকালে নামে-বেনামে অঢেল সম্পদ গড়েন। এর মধ্যে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আলিশান ফ্ল্যাট-২টা। ফেনী শহরের মিজানপাড়ার শর্শদী হাউজে আলিশান ২টা ফ্ল্যাট, ফেনী গার্লস ক্যাডেট কলেজের পশ্চিম পাশে গোলাপবাগ রাস্তার উত্তর মাথায় বিশাল বাগানবাড়ি ছাড়াও নামে-বেনামে অনেক সম্পদ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত চালালে অপকর্মের আরো অনেক ফিরিস্তি জানা যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
