চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে সচরাচর এমন দৃশ্য দেখা যায় না- একটি মাত্র গ্রাম থেকে নির্বাচিত হয়েছেন তিনজন সংসদ সদস্য। চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রাম এবার সেই বিরল ইতিহাসের সাক্ষী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকেই গ্রামজুড়ে বইছে উৎসবের আমেজ, আর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে এই জনপদের রাজনৈতিক প্রভাব ও ঐতিহ্য।
চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে তিনটিতে জয় পেয়েছেন গহিরা গ্রামের তিন বাসিন্দা। তারা হলেন- চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে তার ভাতিজা হুম্মাম কাদের চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং, হালিশহর ও খুলশী) আসনে সাঈদ আল নোমান। তিনজনই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে জয়ী হয়েছেন। ফলে পুরো গ্রামজুড়ে তৈরি হয়েছে এক অন্যরকম আনন্দঘন পরিবেশ।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, রাউজান আসনে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। তিনি পান ১ লাখ ১২ হাজার ২৩৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী ইলিয়াছ নূরী পান ২৭ হাজার ১৪৬ ভোট। একই আসনে জামায়াতে ইসলামীর শাহাজাহান মঞ্জু পান ২২ হাজার ১১৮ ভোট। দীর্ঘদিন ধরে রাউজানের রাজনীতিতে প্রভাবশালী এই নেতার বিজয় ছিল অনেকটাই প্রত্যাশিত, তবে একই গ্রামের আরও দুই প্রার্থীর জয় ঘটনাটিকে দিয়েছে বিশেষ মাত্রা।
রাঙ্গুনিয়া আসনে ভাতিজার যুগপৎ বিজয় বাড়িয়ে দিয়েছে আনন্দের রেশ। হুম্মাম কাদের চৌধুরী পেয়েছেন ১ লাখ ২৪২ ভোট, আর তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের ডা. এটিএম রেজাউল করিম পেয়েছেন ৩৯ হাজার ৪৮৫ ভোট। তার বাবা, যুদ্ধাপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে তার বিজয় ছিল আলোচিত।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম-১০ আসনে শহুরে ভোটের লড়াইয়ে জয়ী হয়েছেন সাঈদ আল নোমান। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ২১ হাজার ৩৭৪ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের শামসুজ্জামান হেলালী পেয়েছেন ৭৪ হাজার ৪০৭ ভোট। তিনি সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমানের ছেলে। বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরে রেখে নগর রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন তিনি।
ফল ঘোষণার পর থেকেই গহিরা গ্রামে দেখা গেছে উৎসবের চিত্র। বাড়ি বাড়ি মিষ্টি বিতরণ, মিছিল, শুভেচ্ছা বিনিময় আর আনন্দঘন পরিবেশে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। স্থানীয়রা বলছেন, এক গ্রামের তিনজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া শুধু গর্বের নয়, উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। জাতীয় পর্যায়ে শক্তিশালী প্রতিনিধিত্ব থাকলে এলাকার অবকাঠামো, শিক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন তারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গহিরা গ্রামের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, প্রভাবশালী পরিবারগুলোর অবস্থান এবং স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনের শক্ত ভিত। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করে চট্টগ্রামের রাজনীতিতে রাউজানের গুরুত্ব কতটা গভীর।
