আন্তর্জাতিক ডেস্ক
গত শুক্রবার বেইজিংয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সি চিন পিং এবং চীনের কুওমিনতাং (কেএমটি) পার্টির চেয়ারপার্সন চেং লি-উনের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আলোচনায়, উভয়পক্ষই পুনরায় নিশ্চিত করেছে যে, প্রণালির উভয়পাশের মানুষই চীনা এবং একই পরিবারের সদস্য, ১৯৯২ সালের ঐকমত্যের প্রতি আনুগত্য পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং জনগণের মধ্যে আদান-প্রদান ও অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও গভীর করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, যদিও ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি (ডিপিপি) তাইওয়ান অঞ্চলের বর্তমান শাসক দল, তবুও চেং লি-উনকে মূল ভূখণ্ডের এই আমন্ত্রণটি শান্তিপূর্ণ আন্তঃপ্রণালি সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বেইজিংয়ের ধারাবাহিক প্রচেষ্টাকেই তুলে ধরে–যা ‘সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও পরম অঙ্গীকারের’ সাথে করা হচ্ছে।
সি চিন পিং ও চেং লি-উনের বৈঠকের আলোকে রোববার চীনের মূল-ভূখণ্ডের কর্তৃপক্ষ তাইওয়ান প্রণালি জুড়ে আদান-প্রদান ও সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য ১০টি নীতি ও পদক্ষেপের একটি প্যাকেজ ষোষণা করেছে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কেন্দ্রীয় কমিটির তাইওয়ান ওয়ার্ক অফিস ষোষিত এ নীতি-পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো প্রণালির উভয় পারের সম্পর্কের শান্তিপূর্ণ উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়া এবং স্বদেশীদের মধ্যে আত্মীয়তা ও কল্যাণ বৃদ্ধি করা।
চীনের সমাজ বিজ্ঞান একডেমির তাইওয়ান রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক সু সিয়াওছুয়ান মনে করেন, সি চিন পিং ও চেং লি-উনের বৈঠকটি কেএমটি, ডিপিপি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি ’সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বার্তা’ দিয়েছে।
সু বলেন, “কেএমটির জন্য, এই আলোচনা পুনরায় নিশ্চিত করে যে, এক-চীন নীতি মেনে চলা এবং তাইওয়ান প্রণালীতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই হলো ঐতিহাসিক ধারা ও জনমতের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ পথ। একই সাথে, এটি ডিপিপি কর্তৃপক্ষকে একটি সতর্কবার্তাও পাঠায় যে ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা’র দিকে যে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী পদক্ষেপ, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষুণ্ণ করে, তা ব্যর্থ হতে বাধ্য।”
আন্তর্জাতিক সমাজের জন্য, এই বৈঠকটি তাইওয়ান প্রশ্নে বেইজিংয়ের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থানকেও তুলে ধরেছে যে: এটি চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং এতে বাইরের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। সু বলেন, “প্রণালীর উভয় পাশের মানুষের নিজেদের বিষয়গুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করার এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করার মতো জ্ঞান ও সক্ষমতা রয়েছে।”
সু’র মতে, এই বৈঠকটি কেবল স্থিতিশীল আন্তঃপ্রণালী সম্পর্কের রাজনৈতিক ভিত্তিকেই শক্তিশালী করে না, বরং এটি মূল ভূখণ্ডের কর্তৃপক্ষ এবং তাইওয়ানের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী ও সামাজিক খাতের মধ্যে বৃহত্তর সংলাপের জন্য একটি মডেলও স্থাপন করে, যা আদান-প্রদানকে একটি গঠনমূলক পথে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
চেং-এর মূল ভূখণ্ড সফর তাইওয়ানেও ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, এবং বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, এটি সেখানকার জনগণের জন্য বাস্তব সুবিধা বয়ে আনতে পারে।
তাইওয়ানের চীনা সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং তাইওয়ানের মূল-ভূখণ্ড বিষয়ক কাউন্সিলের প্রাক্তন উপ-প্রধান চাও চিয়েন-মিন উল্লেখ করেছেন যে, যদিও মূল ভূখণ্ড নবায়নযোগ্য শক্তি এবং এআই-এর মতো প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রগতি করছে, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে তাইওয়ানের মানুষ এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
চীনের সমাজ বিজ্ঞান একাডেমির আরেকজন গবেষক চাং হুয়া একমত হয়েছেন যে তাইওয়ানে শান্তিপূর্ণ উন্নয়ন এবং সহযোগিতাই মূলধারার দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি বলেন, “আজকের এই উত্তাল আন্তর্জাতিক পরিবেশে কেউই সংঘাত চায় না।”
তিনি প্রেসিডেন্ট সি’র ‘তিনটি স্বাগত’– অর্থাৎ তাইওয়ানের স্বদেশীদের মূল ভূখণ্ডে সফরের জন্য স্বাগত জানানো, যুব বিনিময়কে স্বাগত জানানো এবং তাইওয়ানের কৃষি ও মৎস্যজাত পণ্যকে মূল ভূখণ্ডের বাজারে প্রবেশের জন্য স্বাগত জানানোকে জন প্রত্যাশার প্রতি সাড়া দেওয়া বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই ‘তিনটি স্বাগত’ ভবিষ্যতের সহযোগিতার জন্য ব্যাপক সুযোগের ইঙ্গিত দেয়।
তথ্যসূত্র: সিজিটিএন, সিসিটিভি, সিনহুয়া।
