আমার কাগজ ডেস্ক
দেশে চাহিদার চেয়েও বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও বিদ্যুতের লোডশেডিং শুরু হয়েছে। গরম যত বাড়ছে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ তত কমছে। জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে তৈরি হয়েছে ঘাটতি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাড়তি দাম দিয়েও পর্যাপ্ত গ্যাস, তেল ও কয়লা জোগান দিতে পারছে না এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে গ্রীষ্ম মৌসুম শুরুর আগে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সমান্তরালে লোডশেডিং বাড়ছে। পরিস্থিতি সহনীয় রাখতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি (পিজিসিবি) সূত্র জানায়, আমদানিসহ দেশে বর্তমানে দৈনিক বিদ্যুৎ উত্পাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৪৯৪ মেগাওয়াট। এবার গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ চাহিদা সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াট হতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। এর মধ্যে গতকাল রবিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ চাহিদা ১৫ হাজার ১০০ মেগাওয়াটের বিপরীতে উত্পাদিত হয় ১৩ হাজার ৯৬৯ মেগাওয়াট। সাবস্টেশন পর্যায়ে লোডশেডিং হয় ১ হাজার ৮০ মেগাওয়াট। গ্রাহক পর্যায়ে এ লোডশেডের পরিমাণ আরও বেশি। আর আগের মতোই শহরের চেয়ে গ্রামে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ কম। এর আগে গত শনি, শুক্র, বৃহস্পতি ও বুধবারে যথাক্রমে ৯৬১, ৭৬৮, ৫৫৩ এবং ৪৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত একসঙ্গে তিনটি বড় চাপের মুখে পড়েছে। পুরোনো বকেয়া, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে বেড়ে যাওয়া আমদানি ব্যয় এবং জ্বালানির সরবরাহ সংকট। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উত্পাদনে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকার পুরোনো বকেয়া পরিশোধের চাপ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি আমদানির খরচ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় গত এক মাসে তেল ও এলএনজি আমদানিতে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই আর্থিক চাপে ভর্তুকি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্বিগুণ বা তার চেয়েও বেশি দামে জ্বালানি আমদানির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও চাপ পড়তে শুরু করেছে। এমন প্রেক্ষাপটে অর্থ মন্ত্রণালয় জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা ও বিশ্লেষণ করেছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ও ধাপে ধাপে দামবৃদ্ধি এবং এর ফলে সৃষ্ট সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করছে।
কয়লা ও আমদানিনির্ভরতায় ঝুঁকি
বর্তমানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উত্পাদন সক্ষমতা সাড়ে ৭ হাজার ৬২৯ মেগাওয়াট যা মোট সক্ষমতার প্রায় ২৭ শতাংশ। কিন্তু সরবরাহ অনিশ্চয়তার কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় উত্পাদন সম্ভব হচ্ছে না। ভারতের আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকায় উত্পাদন আরও কমে গেছে।
পিডিবি সূত্র জানায়, সর্বোচ্চ চাহিদার সময় আদানির কেন্দ্রটি থেকে ১ হাজার ৪৩৬ মেগাওয়াট পাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ৭৬০ মেগাওয়াটে। দেশে পায়রা ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লার ঘাটতির কারণে পূর্ণ উত্পাদন হচ্ছে না। ফলে আগামী এক সপ্তাহ পর্যন্ত লোডশেডিং পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গ্যাসে বড় সংকট
দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪২০ কোটি ঘনফুট হলেও আমদানিকৃত এলএনজিসহ সরবরাহ করা হচ্ছে ২৬৫ কোটি ঘনফুট। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উত্পাদন ক্ষমতা ১২ হাজার ১৯৪ মেগাওয়াট যা মোট সক্ষমতার প্রায় ৪৩ শতাংশ। কিন্তু বিদ্যুৎ খাতে পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় উত্পাদন অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। পিডিবি বলছে, গরমে লোডশেডিংমুক্ত বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে দিনে অন্তত ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু সরবরাহ যদি ৯০ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে, তাহলে ১ হাজার ৬৭৪ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হতে পারে। বর্তমানে গ্যাসভিত্তিক প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট উত্পাদন সক্ষমতা কার্যত অচল ও অব্যবহৃত থাকছে।
তেলভিত্তিক কেন্দ্রেও বাধা
ফার্নেস ও ডিজেলচালিত কেন্দ্রগুলোর উত্পাদন ক্ষমতা ৬ হাজার ৪০২ মেগাওয়াট, যা মোট সক্ষমতার ২২ শতাংশের বেশি। গ্যাসের ঘাটতি পূরণে তেলচালিত বিদ্যুেকন্দ্রগুলোতে উত্পাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা করে সরকার। কিন্তু বকেয়া বিলের কারণে এসব কেন্দ্রগুলো জ্বালানি তেল কিনতে হিমশিম খাচ্ছে। বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর মালিকরা বলছেন, ব্যাংক ঋণ করে উত্পাদন সচল রাখতে চেষ্টা করছেন তারা। তারপরও তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোরও সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
