এ টি এম মোস্তফা কামাল
কর্মফল ভোগ করতে হয়- সব ধর্মেই এটা স্বীকৃত। পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়-এটাও সর্বজনস্বীকৃত। পৃথিবীর সকল দেশেই ক্রিমিনাল এক্টসকে সঙ্গায়িত করা হয়েছে এবং ক্রাইমের ধরণ অনুযায়ী বিভিন্ন মেয়াদের সাজা প্রদানের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। যে সব দেশে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত সেসব দেশে কেউ দুষ্কর্ম করে সাজা ভোগ না করে পার পেতে পারে না। তবে প্রভাবশালীরা দুষ্কর্মের সাজা এড়িয়ে যাবার জন্যে নানা ধরণের প্রচেষ্টা চালিয়ে থাকে কিন্তু সব প্রভাবশালীরা তাতে সফলতা অর্জন করে না। তবে ইসরাইল রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বীকৃত এবং সমগ্র বিশ্বে প্রচলিত রীতি নীতির ও ব্যতিক্রম রয়েছে। সে ধরণের ব্যতিক্রমী প্রভাব খাটিয়ে ইসরাইল আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারিক কার্যক্রম এড়িয়ে যেতে সক্ষমতার পরিচয় দিলেও স্রষ্টার ঐশ্বরিক বিচারিক কার্যক্রম এড়িয়ে যাবার চুল পরিমাণ সম্ভাবনাও নেই।
আমেরিকা এবং তার ইউরোপীয়ান মিত্ররা অত্যন্ত জোর দিয়ে বলে থাকেন ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। কিন্ত প্যালেস্টাইনী জনগণের একই ধরণের অধিকার থাকার কথা তারা কেউ স্বীকার করে না। এটা দ্বিমুখী আচরণ- আমেরিকা এবং তার ইউরোপীয় মিত্র দেশসমূহের এরূপ দ্বিমুখী আচরণ যে কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তি কিংবা রাষ্ট্রের নিকট গ্রহণযোগ্য নহে। তাদের এরূপ দ্বিমুখী আচরণের কারণে মধ্যপ্রাচ্য সংকট দীর্ঘতর এবং জটিলতর রূপ পরিগ্রহ করছে।
ইসরাইলের সেরূপ আত্মরক্ষার এক পেশে অন্যায্য অধিকারের কথা বলে আমেরিকা এবং তার ইউরপীয় মিত্ররা ইসরাইলকে প্রচুর পরিমাণে অত্যাধুনিক বোমারু বিমান-অস্ত্র-গোলাবারুদ-শত শত টন বোমা তথা সামরিক সহায়তা যুগিয়ে যাচ্ছে। আর ইসরাইল সকল ধরণের মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র-গোলাবারুদ প্যালেস্টাইনী জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে যাচ্ছে। ইসরাইলের এরুপ কর্ম ন্যায্য কি অন্যায্য সেই প্রশ্ন আমেরিকা কিংবা আমেরিকার মিত্র ইউরোপীয় দেশগুলো বিবেচনায় নিচ্ছে না।
ইসরাইলের এরুপ অন্যায্য অপকর্ম প্রতিরোধের জন্য এবং একটা স্বাধীন সার্বভৌম প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য পিএলও-হামাস- হিজবুল্লাহ নানা ধরণের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেরূপ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে হামাস ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর মাসে ইসরাইলের মূল বাণিজ্যিক কেন্দ্র তেল আবিবসহ ইসরাইল জুড়ে রকেট হামলা এবং স্থল্ভাগে অনুপ্রবেশ চালানো হয়।
হামাসের এই আকস্মিক হামলায় প্রায় ১২০০ জন নিহত হন যাদের মধ্যে সিংহভাগই ছিলেন বেসামরিক নাগরিক এবং বিদেশী নাগরিক। হামলায় ১৫০০ জনের বেশি মানুষ আহত হন। নারী-শিশু ও বৃদ্ধসহ প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করে হামাস যোদ্ধারা গাজা উপত্যকায় নিয়ে যায়।
এই অতর্কিত হামলার পর ইসরাইল আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করে গাজায় ব্যাপক বিমান হামলা এবং স্থল অভিযান শুরু করে। হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার কোন আবশ্যকতা ছিল কি? হামাস যে ধরণের হামলা চালিয়েছে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে হামাসের বিরুদ্ধে ইসরাইল একই ধরণের সামরিক ব্যবস্থা নিতে পারতো। সমান মর্যদার এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অন্য রাষ্ট্রের যুদ্ধ ঘোষণা যুক্তিসংগত। কিন্তু গাজা তো কোন স্বীকৃত রাষ্ট্র নহে। গাজার তো কোন স্বীকৃত প্রতিরক্ষাবাহিনী নেই। কাজেই হামাসের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্যে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে কেন?
২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সম্পাদিত যুদ্ধবিরতির পূর্ব পর্যন্ত গাজায় ৭৫ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে ইসরাইল ব্যাপক বোমা হামলা এবং স্থল অভিযান চালিয়ে নির্বিচারে হত্যা করে।
উল্লেখ্য, রকেটের জবাব রকেট দিয়ে দেয়াই উত্তম। ১২ শত ইসরাইলীর হত্যার প্রতিশোধে ১২ শত ফিলিস্তিনির হত্যা যুক্তিসঙ্গত। ফিলিস্তিনিদের কোন সামরিক বিমান নেই। কিন্তু ইসরাইল শত শত বিমান দিয়ে ব্যাপক বিধবংসী বোমা হামলা চালিয়ে গাজার আবাসিক ভবনের প্রায় ৯০ পার্সেন্ট মাটির সংগে মিশিয়ে দেয়- পানি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। থাকার জায়গা,পানির অভাব এবং খাদ্যের অভাবে গাজাবাসী দিশেহারা হয়ে পড়ে। ইসরাইল খাদ্যকেও যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। গাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে বোমা হামলা চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। হাসপাতালগুলোতে হামলা চালিয়ে অকার্যকর করে দিতেও ইসরাইল কোন কার্পণ্য করেনি। গাজার চত‚র্দিক অবরুদ্ধ করে ইসরাইল যে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায় তা হলোকাস্টের চাইতে অনেক বেশি নির্মম। নিরপরাধ নারী-শিশু-যুবক- ছাত্র/ছাত্রী কেউ এই হত্যাযজ্ঞ থেকে রেহাই পায়নি। আমেরিকার মধ্যস্থতায় সম্পাদিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি লংঘন করে ইসরাইল প্রতিদিন গাজায় বোমা হামলা চালিয়ে নিরপরাধ ফিলিস্তিনিদের হত্যা করে চলেছে। এতে ধারণা করা যায় ১ জন ফিলিস্তিনী জীবিত থাকা পর্যন্ত ইসরাইল বোমা হামলা চালিয়ে ফিলিস্তিনী হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাবে।
উল্লেখ্য, হামাস তো যুদ্ধবিরতি লংঘন করছে না কিন্তু ইসরাইল প্রতিনিয়ত যুদ্ধবিরতি লংঘন করে প্যালেস্টাইনীদেরকে হত্যা করে চলেছে। আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব এই ব্যাপারে কেন নীরবতা পালন করে যাচ্ছে- নীরবতা মানে ইসরাইলী কার্যক্রমকে সমর্থন করে যাওয়া। ইসরাইলের এরুপ হত্যাযজ্ঞকে সমর্থনের মাধ্যমে আমেরিকা, যুক্তরাজ্য এবং আমেরিকার ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলো গাজা গণহত্যা সহযোগিতা করে গণহত্যার অপরাধে অপরাধী রাষ্ট্রে পরিগণিত হচ্ছে।
পশ্চিম তীর এবং অন্যান্য জায়গায় ইসরাইলী বাহিনীর সহযোগিতায় ইহুদী সেটেলররা আদিবাসী ফিলিস্তিনীদের ঘরবাড়ী এবং আবাদী সম্পত্তি দখল করে নিরীহ ফিলিস্তিনীদের তাদের বসতবাড়ী থেকে উচ্ছেদ করে তাড়িয়ে দিচ্ছে। জোর পূর্বক ফিলিস্তিনিদের বিতাড়িত করে সেটেলররা কি মহাসুখে-শান্তিতে সেখানে অনাদিকাল যাবত বসবাস করতে পারবে?
ইহুদী সেনারা বেঁচে থাকা ফিলিস্তিনী যুবকদের ধরে নিয়ে জেলখানায় অমানবিক শারীরিক ও মানষিক নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নহে ইসরাইলী সৈন্যরা জেলখানায় বন্দী ফিলিস্তিনী যুবকদের উপর বলৎকার সমেত নানা কায়দায় পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। এক কথায় ফিলিস্তিনীরা ইসরাইলী জেলখানায় নরকের চাইতে কঠিন সাজা ভোগ করছে। আমেরিকা এবং তার ইউরোপীয় মিত্র দেশসমূহের জ্ঞাতসারেই ইসরাইল এরুপ জঘন্য অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। অধিকৃত ভূমিতে অবৈধ বসতি স্থাপনসহ দ্বিরাষ্ট্র ভিত্তিক সমাধানের পথে সুপরিকল্পিত উপায়ে ইসরাইল সকল ধরণের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে যাচ্ছ।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে ফিলিস্তিনিদেরকে সুপরিকল্পিত উপায়ে নিশ্চিহ্ন করে ইসরাইল তার নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে কি?ধরুন, আগামী ৫-১০ বছরের মধ্যে ইসরাইল হামাস-হিজবুল্লাহ-হুথিসহ সকল সংগঠনকে নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষমতার পরিচয় দিল। তারপর ইসরাইল কি মনের সুখে অতি আনন্দে চির শান্তিতে বসবাস করতে পারবে?
গাজার লক্ষ লক্ষ লোকের বসতবাড়ী ধ্বংস করার বিষয়টা একটা ক্রিমিনাল অফেন্স/ ওয়ার ক্রাইম। গাজার বিদ্যুৎ এবং খাবার পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ধবংস করে দেবার বিষয়টা ও একটা ক্রিমিনাল অফেন্স। গাজায় খাদ্যবাহী যানবাহন ঢুকতে না দেয়া ওয়ার ক্রাইম। প্যালেস্টাইনী আদিবাসীদেরকে জোর পূর্বক তাঁদের বসতবাড়ী থেকে উচ্ছেদ করা ক্রিমিনাল অফেন্স। জেলখানায় সেনা বাহিনী কর্তৃক প্যালেস্টাইনী যুবকদের উপর পাশবিক নির্যাতন চালানো ওয়ার ক্রাইম।
৮০ হাজার নিরপরাধ ফিলিস্তিনীকে হত্যার বিষয়টি একটা ক্রিমিনাল অফেন্স/ ওয়ার ক্রাইম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরোপীয় মিত্রদের চাপে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ইসরাইলের বিচার করা সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না। তবে ঐশ্বরিক বিচার থেকে রেহাই পাবার কোন ব্যবস্থা ইসরাইল এবং তাঁকে সহযোগিতাকারী রাষ্ট্র সমূহের হাতে নেই। ৮০ হাজার প্যালেস্টাইনী হত্যার দায়ে ইসরাইলকে তথা ইসরাইলী ইহুদী জনগণকে ঐশ্বরিক বিচারিক আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে এবং ঐশ্বরিক বিচারিক আদালতের প্রদত্ত শাস্তি ইসরাইলী ইহুদী সম্প্রদায়কে মাথা পেতে নিতে হবে- তবে ইশ্বর কোন ধরণের সাজা দেবেন এবং কবে দেবেন সেটা একমাত্র ইশ্বরই জানেন। তবে ইসরাইলের সহযোগী আমেরিকা এবং ইউরোপীয়ান ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রগুলো ইতিমধ্যে তার কিছু নমুনা দেখতে শুরু করেছেন। হিট ওয়েভ, বুশ ফায়ার,এলনিনো তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। হিট ওয়েভ এবং বুশ ফায়ার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আমেরিকা কিংবা পশ্চিমা বিশ্বের নেই। মৃত সাগরের অবস্থান ইসরাইলের অতি সন্নিকটে। তার ইতিহাস ও ইসরাইলিদের অবশ্যই জানা আছে।
তবে এখনো সময় আছে- ইসরাইলীরা সকল ধরণের মানবতা বিরোধী অপরাধ কর্মকান্ড থেকে সরে এসে ইশ্বরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারেন। ক্ষমা প্রার্থনা করার পূর্বে ইসরাইলকে অবশ্যই সব অধিকৃত আরব ভ‚মি ছেড়ে দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজ শেষ করতে হবে। আমেরিকা এবং তার ইউরোপীয়ান মিত্রদেশ গুলোর সরকার প্রধানরা ভ্যাটিকান সিটিতে সমবেত হয়ে পোপ চতুর্দশ লিও-এর সংগে বিষয়টা নিয়ে আলোচনাক্রমে সঠিক সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করতে পারেন।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব।
