আমার কাগজ প্রতিবেদক
র্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন বা এসআরবি গঠনের বিল জাতীয় সংসদে উঠেছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বিলটি উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
বিলের বিরোধিতা করে বিরোধী দলের নেতারা বলেছেন, এখানে ‘র্যাবের জনবল দিয়ে একই ধরনের আরেকটি বাহিনী’ গঠনের কথা বলা হচ্ছে। ফলে মানুষের কাছে র্যাবকে নতুন নামে ফিরিয়ে আনার ধারণা তৈরি হতে পারে ভাষ্য তাদের।
‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ পাস হলে ২০০৩ সালের আইনে র্যাব গঠনের জন্য আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অধ্যাদেশে যেসব বিধান যুক্ত করা হয়েছিল, সেগুলো বাতিল হবে।
একই সঙ্গে র্যাবের জনবল, সম্পদ, অর্থ, দায়, চুক্তি, নথিপত্রসহ সবকিছু এসআরবির কাছে চলে যাবে।
সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনের পাশাপাশি মাদক, সাইবার অপরাধ, গুম, ভূমি দস্যুতা, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, মানবপাচার ও অপহরণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে নতুন বাহিনীকে।
বিলটি পরীক্ষা করে চার কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।
বিলে বলা হয়েছে, জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে আধুনিক, পেশাদার, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন।
বিশেষায়িত বাহিনীর ক্ষমতা প্রয়োগে স্বচ্ছতা, তদারকি ও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করাও নতুন আইন করার উদ্দেশ্য।
প্রস্তাবিত আইনে এসআরবিকে সরাসরি পুলিশ বাহিনীর আওতায় রাখা হয়েছে।
এর সদর দপ্তর থাকবে ঢাকায়। সরকারের অনুমতি নিয়ে দেশের অন্য জায়গাতেও দপ্তর করা যাবে।
পুলিশ, অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনী ও সংস্থা থেকে কর্মকর্তা ও সদস্য পদায়ন বা প্রেষণে এনে ইউনিট গঠন করা যাবে।
এসআরবির মহাপরিচালক হবেন বাংলাদেশ পুলিশের অন্তত অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা।
পুলিশ মহাপরিদর্শকের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণে মহাপরিচালকের আদেশে বাহিনীর কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
মহাপরিচালক প্রশাসনিক, আর্থিক ও অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন।
প্রয়োজন অনুযায়ী এসআরবিতে ব্যাটালিয়ন, কোম্পানি, প্লাটুন ও সেকশন থাকবে।
বিরোধীদের আপত্তি
এদিন সংসদে বিল উত্থাপনের অনুমতির বিরোধিতা করেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত গোপন বন্দিশালার কারণে র্যাব জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত হয়েছে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নির্বাচনের আগে র্যাব বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু র্যাবের জনবল দিয়ে একই ধরনের আরেকটি বাহিনী গঠনের কথা বলা হয়নি।
নাহিদ বলেন, “আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, র্যাব বিলুপ্ত করে তার জনবল দিয়েই আবার এসআরবি প্রতিষ্ঠা করা, এটা নতুন মোড়কে র্যাবকে পুনর্গঠন করা হচ্ছে।”
তার বক্তব্য, আগে র্যাব বিলুপ্ত করা হোক। এরপর পুলিশের কোনো বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন হলে তা নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের অপব্যবহারের দায় পুরো প্রতিষ্ঠানের ওপর দেওয়া ঠিক নয়।
তিনি বলেন, “প্রতিষ্ঠানের কোনো দোষ নয়। প্রতিষ্ঠান যারা চালায়, সেই রাজনৈতিক অথবা মাফিয়া শক্তির দোষ। প্রতিষ্ঠানের দোষ হতে পারে না।”
সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদের প্রসঙ্গ টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশ বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তা অপরাধে জড়িয়েছেন বলে পুরো পুলিশ বাহিনী বিলুপ্ত করা যায় না।
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান র্যাব বিলুপ্তির প্রস্তাব সমর্থন করেন। তবে এসআরবি গঠনের আগে আরও আলোচনা ও পর্যালোচনার দাবি জানান তিনি।
তার বক্তব্য, নতুন বাহিনী এমনভাবে করা উচিত, যেন মানুষের কাছে শুধু র্যাবের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে বলে মনে না হয়।
র্যাবের অতীত কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “একবার আমাদের চুন খেয়ে গাল ঘা হয়েছে। এখন সাদা দই দেখলেও ভয় লাগে।”
শফিকুর বলেন, “এ বিষয়ে আমাদের সবার কনভিন্সড হয়ে আইনটা পাস করা উচিত। তাইলে ইতিহাসের কোনো দায় থাকবে না।”
তিনি বিলটি উত্থাপন না করে আরও সময় নিয়ে আলোচনার পর আনার প্রস্তাব দেন।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নতুন এসআরবিতে আগের র্যাবের তুলনায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের জন্য আলাদা কমিটি থাকবে। সেখানে বিচার বিভাগের কর্মকর্তা ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিকেও রাখা হবে।
সালাহউদ্দিন বলেন, “এই একাউন্টেবিলিটি, যেটা ধার্য করা হয়েছে এবং ট্রান্সপারেন্সি যেভাবে আমরা রেখেছি, তার মধ্য দিয়ে আমরা আশা করি বিশেষ সেই বাহিনী অতীতের রেপিডঅকশন ব্যাটালিয়নের কোন রকম আচরণ যেটা যে বিতর্কিত হয়েছে কুখ্যাত হয়েছে এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে ব্যান্ড হয়েছে সেরকম কোন আচরণ করার সুযোগ পাবে না।”
