এ টি এম মোস্তফা কামাল
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে ক্ষমতাসীন সরকার এবং সংসদে থাকা বিরোধী দলসমূহ মুখোমুখি অবস্থান নেয়ায় সরকারের স্বল্পকালীন মেয়াদে একটা জাতীয় সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। জুলাই আন্দোলনের দ্বিবর্ষ পূর্তিতে সরকার কর্তৃক আয়োজিত অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে যে বিশৃঙ্খল পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। অন্যদিকে জুলাই আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত দিল্লীতে অবস্থানকারী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন নিয়েও সরকার বিব্রত। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজে বের করে অত্যন্ত দ্রæততার সংগে সেটা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় এই সংকট আরো জটিল আকার ধারণ করবে, দেশী-বিদেশী প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী এর সংগে জড়িয়ে পড়বে এবং দেশের শাসন ব্যবস্থা একটা কঠিন সঙ্কটে পড়ার সম্ভাবনা থেকে যাবে।
জুলাই আন্দোলন শুরু হয়েছিল বৈষম্যযুক্ত কোটা বিরোধী আন্দোলন দিয়ে। সরকার যদি সময় ক্ষেপণ না করে ছাত্রদের দাবি মেনে নিয়ে কোটা সিস্টেম বাতিল করে সরকারী ফরমান জারি করতো তাহলে ছাত্রদের কোটা বিরোধী আন্দোলনের অবসান ঘটতো। কিন্তু, সরকার সে পথে না হেঁটে কোটা সিস্টেম বহাল রাখার পক্ষে অযৌক্তিক অবস্থান নিয়ে নানা রকম টালবাহানা করতে থাকায় সমাজের সর্বস্তরের জনগণ জুলাই আন্দোলনকারীদের সংগে সংহতি প্রকাশ করে। সরকারের সকল ধরণের নির্যাতন সহ্য করে এবং সকল প্রকার প্রলোভন উপেক্ষা করে জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্ররা মেচিউড রাজনীতিকের মতো সুনিপুণ দক্ষতার সঙ্গেনেতৃত্ব দিয়ে যায়। অত্যন্তস্বল্প সময়ের ব্যবধানে জুলাই আন্দোলন জুলাই গণভ্যুথানে রূপ নেয়। কোটা আন্দোলন থেকেই এক দফার চূড়ান্ত আন্দোলন ঘোষণা করা হয়।
সরকার পতনের কয়েক মাস পর প্রশ্ন এল জুলাই ঘোষণা নিয়ে। জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র নেতৃবৃন্দ নিজেরাই ৬ দফা/১১ দফার মতো করে জুলাই ঘোষণা প্রদান করতে পারতেন এবং সেটা করাটাই অত্যন্ত যৌক্তিক ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে সেই দায়িত্ব অর্পণ করাটা সঠিক হয়নি। অবশ্য অন্তর্বর্তী সরকার নিজেই জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের দায়িত্ব গ্রহণ করে। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের চেতনার সংগে সংগতি রেখে জুলাই সনদ প্রণয়নে অন্তর্বর্তী সরকার সফলতার পরিচয় দিতে পারেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে ট্যাক্সেবেল আয় থাকা সত্ত্বেও গ্রামীন ব্যাংককে আয়কর অব্যাহতির সুযোগ দিয়ে যে ফরমান জারী করা হয়েছে তা জুলাই আন্দোলনের চেতনার সংগে অসংগতিপূর্ণ। অন্তর্বর্তী সরকারে অন্তিম সময়ে একটা বিশেষ দেশের স্বার্থ রক্ষা করে ঐ দেশের সংগে করা বাণিজ্য চুক্তিও জুলাই আন্দোলনের চেতনার সাথে অসংগতিপূর্ণ। যে সরকার নিজেই জুলাই আন্দোলনের চেতনার সংগে সাংঘর্ষিক কাজ করতে পারে সে সরকার কি করে জুলাই আন্দোলনের চেতনার সাথে সংগতি রেখে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করবে? তাছাড়া, জুলাই আন্দোলনের চেতনার সংগে সংগতি রেখে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার কোন কমিটি বা কমিশনও গঠন করেনি।
তবে সরকার তার সংস্কার মূলক কার্যক্রম শুরু করার জন্যে ৫টা কমিশন গঠন করেছিল। পরবর্তীতে সংবিধান সংস্কারের জন্য অপর একটা কমিশন গঠন করে। ৬টা কমিশনের সুপারিশ থেকে ঐক্যমত্য কমিশনের কাছে গ্রহণযোগ্য সুপারিশসমূহকে সমন্বিত করে সরকারের পক্ষ থেকে ৮৪ অনুচ্ছেদ সম্বলিত জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ ঘোষণা করা হয়েছিল। তন্মধ্যে ৪৮টি অনুচ্ছেদ রয়েছে সংবিধান সংস্কার নিয়ে। অথচ সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে রাজনৈতিক দলসমূহের তেমন কোন এজেন্ডা ছিল না এবং জুলাই আন্দোলনকারীদেরও কোন বক্তব্য ছিল না। সংবিধান সংস্কার ইস্যু সমেত অন্যান্য সকল ইস্যু অন্তর্বর্তী সরকারের নিজস্ব এজেন্ডা জুলাই আন্দোলনের চেতনার সংগে অসংগতিপূর্ণ এজেন্ডা কখনো জুলাই ঘোষণা তথা জুলাই জাতীয় সনদ হিসেবে জাতির কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অধিকন্তু, জুলাই জাতীয় সনদের শিরোনাম হওয়া উচিৎ ছিল জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৪। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার এটাকে নামকরণ করেছে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ যা প্রকাশের তারিখ হচ্ছে ১৭ অক্টোবর,২০২৫। এটাকে বলা যায় অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োজিত বিভিন্ন কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রণীত জাতীয় সংস্কার প্রস্তাবনা যার শিরোনাম হওয়া উচিৎ ছিল ডিসেম্বর সনদ-২০২৫। আমার ধারণা জুলাই সনদ কিভাবে প্রণয়ন করতে হবে সেটা অন্তর্বর্তী সরকার আঁচ করতে পারেনি। আরো বিস্মিত হই এই ভেবে যে বিএনপি-সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কি করে সরকারের প্রস্তাবিত জাতীয় সনদের সংগে ঐক্যমত্য প্রকাশ করলো?
জুলাই সনদে যে সব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার আবশ্যকতা ছিল-
১) জুলাই আন্দোলনের চেতনা এবং সংবিধানের সাথে সংগতি রেখে কোটা সংক্রান্ত পরিপত্র জারী করা। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত প্রাপ্ত প্রপার ডকুমেন্ট এর ভিত্তিতে বীর মুক্তিযোদ্ধদের তালিকা সঠিক ভাবে প্রণয়ন কাজ ৬-৯ মাস সময়ের মধ্যে শেষ করা।
২) ট্যাক্সেবেল ইনকাম যাদের আছে তাঁদেরকে সরকার নির্ধারিত হারে আয়কর প্রদান করতে হবে। কোন বিশেষ ব্যক্তি/ গোষ্ঠী/ এনজিও/ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে আয়কর অব্যাহতি দেয়া যাবে না- কারণ তাতে অন্য গোষ্ঠী/ ব্যক্তি/ প্রতিষ্ঠান বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকে।
৩) রপ্তানী পণোদনা প্রদানের নীতি থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে কারণ তাতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে।
৪) সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের আয়ের (প্রিমিয়ামের) ৫০ পারসেন্ট অকারণে বেসরকারী নন-লাইফ বীমা কোম্পানী সমূহের মাঝে প্রতি ৩ মাস অন্তর সমহারে বন্টন করে দেবার রীতিকে আইনী ভিত্তি দিয়ে বীমা কর্পোরেশন আইনে যে সংশোধন ২০১৯ সালে করা হয়েছে সেটা অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। কারণ ভারতসহ পৃথিবীর অন্য কোন দেশে এজাতীয় কোন নজীর নেই। এটা চরম বৈষম্য মূলক একটা আইন।
৫) ব্যাংক কোম্পানী আইনকে এমনভাবে সংশোধন করতে হবে যাতে করে কেউ একাধিক ব্যাংকের মালিকানা অর্জন করতে না পারে- কেউ অস্বাভাবিক অংকের ঋণ গ্রহণ করতে না পারে-ঋণ প্রদানের যৌক্তিকতা সঠিকভাবে যাচাই করা হয়- গৃহীত ঋণের অর্থ আত্বসাত/ বিদেশে পাচার করতে না পারে। কতিপয় ব্যক্তি/ গোষ্ঠী কর্তৃক বিপুল অংকের অর্থ ঋণ হিসেবে গ্রহণ করে অবৈধভাবে আত্বসাত এবং বিদেশে পাচারের কারণে সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে এবং দেশের অর্থনীতি দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
৬) সংবিধান লংঘন করে সংসদ সদস্যদেরকে উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা বানানো হয়েছে। এটা চরম বৈষম্যমূলক। পৃথিবীর অন্য কোন দেশে এরুপ নজীর খুঁজে পাওয়া যাবে না। এটা চাঁদাবাজি এবং দূর্নীতিকে উৎসাহিত করছে। কাজেই এটা অবিলম্বে বাতিল করা অত্যাবশ্যক। তাছাড়া একটা নির্বাচিত পরিষদের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করা গণতান্ত্রিক রীতি নীতির পরিপন্থী। সংসদ সদস্যদেরকে কোন রূপ উন্নয়ন কার্যক্রমের সংগে সম্পৃক্ত করা যাবে না- তাঁদের অনুক‚লে কোন উন্নয়ন বরাদ্দ দেয়া যাবে না।
৭) সমগ্র দেশে চাঁদাবাজি বন্ধে সরকারকে কঠোর অবস্থান গ্রহন করতে হবে। চাঁদাবাজিকে দন্ড বিধির আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করে দন্ডবিধি সংশোধন করতে হবে। এটাকে মোবাইল কোর্টের আওতায় বিচারযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে। চাঁদাবাজি সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টির আর একটা অন্যতম কারণ।
৮) পুলিশকে নিরপেক্ষভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করতে হবে- পুলিশকে কোন ক্রমেই ক্ষমতাসীন দলের আজ্ঞাবহ হতে দেয়া যাবে না। র্যাবকে পুলিশের সংগে মার্জ করতে হবে। সেনাবাহিনীকে দলনিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখে পেশাগত দায়িত্ব এমনভাবে পালন করতে হবে যাতে মায়ানমারের সাথে যুদ্ধ করার মত সক্ষমতা অর্জন করা যায়। সর্বস্তরে সরকারী প্রশাসন যন্ত্রের উপর ক্ষমতাসীন দল কোন রূপ প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। এক্ষেত্রে ভারত-সিঙ্গাপুর কিংবা যুক্তরাজ্যের মডেল অনুসরণীয়। কারণ সরকারী প্রশাসন যন্ত্র যদি দলনিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখতে না পারে তাহলে তাঁদের পক্ষে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হবে না। অধিকন্তু, সরকারী প্রশাসন যন্ত্রের দলনিরপেক্ষ অবস্থান নিশ্চিত করা না গেলে তত্বাবধায়ক সরকারের একার পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব হবে না।
(২) নির্বাচিত সরকারকে তার কার্যক্রম এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে যাতে সরকারের সকল কর্মচারী-সকল সরকারী প্রতিষ্ঠান দলনিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখে তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে পারে- যাতে করে ভারতের মত দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব হয়।
৯) সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেপ্তারী পরওয়ানা ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। বিচার কার্যক্রমে দেশের প্রধানমন্ত্রীসহ কেউ কোন রূপ প্রভাব খাটাতে পারবেন না। রাজনৈতিক কার্যক্রমের সংগে সম্পৃক্ত কোন আইনজীবিকে হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়া যাবে না। একজন বিচারক যেন তার ইন্টিগ্রিটি বজায় রেখে বিচারিক দায়িত্ব পালন করতে পারে সরকারকে সে রূপ পরিবেশের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে
১০) দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমসিকিউ সিষ্টেমমুক্ত করে সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানী কিংবা সিঙ্গাপুর- এই ৫টি দেশের যে কোন একটির মডেল অনুকরণে ঢেলে সাজাতে হবে। বেকার পূনর্বাসনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে-দেশে এক জন ডিগ্রীধারী বেকার থাকাবস্থায় কোন বিদেশীকে কোন সরকারী কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেয়া যাবে না। বৈধ পথে বিদেশে লোক পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারী উদ্যোগে সরকারী খরচে পাঠাতে হবে।
১১) দেশে এমন কোন প্রকল্প হাতে নেয়া যাবে না যা স্বদেশী প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরিচালনা করা সম্ভব নহে। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ কামানোর উদ্দেশ্যে কোন অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে না।
১২) বৈদেশিক ঋণের অর্থে সরকারের কোন মন্ত্রণালয়/ বিভাগ কর্তৃক কোন ধরণের কোন ক্যাপাসিটি বিল্ডিং প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে না। সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সমেত যে সব সরকারী সংস্থার নিজস্ব আয়ের উৎস আছে তাঁরা বৈদেশিক ঋণের অর্থে কোন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করতে পারবে না। তবে তাঁদের নিজস্ব প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থের ঘাটতি থাকলে তাঁরা সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের জন্য আবেদন জানাতে পারবে।
১৩) বৈদেশিক ঋণের অর্থে গৃহীত প্রকল্পে বিদেশ প্রশিক্ষণ এবং নতুন গাড়ী ক্রয়ের ব্যবস্থা রাখা যাবে না। এ বিষয়ে ভিয়েতনাম মডেলে ক্লাস্টার ভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব হবে একই গাড়ী ব্যবহার করে একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে যাওয়া।
১৪) দেশে পিক পিরিয়ডে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৬ হাজার মেঘাওয়াট। কিন্তু, বিদ্যুতের উৎপাদন ক্যাপাসিটি ২৯ হাজার মেঘাওয়াট। ১৩ হাজার বাড়তি উৎপাদন ক্যাপাসিটি কেন? লোড শেডিং কেন? কেন রেন্টাল? কেনা হবে বিদ্যুৎ- চাহিদার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে নেয়া হবে বিল- কেন দেয়া হবে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার ক্যাপাসিটি চার্জ? জাতীয় সংসদে আইন পাশ করে ১৩ হাজার মেঘাওয়াটের রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুক্তি বাতিল করা যেতে পারে।
১৫) প্রতিবেশী ভারতের সংগে বন্ধুত্বপুর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করার চেষ্টা করতে হবে। লাওস-থাইল্যান্ডের আদলে উপযুক্ত ট্যারিফ প্রদান করে ভারত বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার করতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিলনিয়া রেল লাইনকে সচল করে সেটা ব্যবহার করা যেতে পারে। পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের জন্য প্রয়োজনে আন্ত্রর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হওয়া যেতে পারে।
১৬) মিয়ানমারের সংগে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো জোরদার করার জন্য ক‚টনৈতিক উদ্যোগ বৃদ্ধি করা যায়। তাতে অর্থনৈতিক সহযোগীতা বৃদ্ধি পাবে- রোহিংগা সমস্যা সমাধান সহজ হবে।
১৭) এদেশে বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হার প্রায় ১৫ পার্সেন্ট আর ক্ষুদ্র ঋণের সুদের হার ২৩-৩০ পার্সেন্ট,এটা অতিমাত্রিক বৈষম্যমূলক। তাই ক্ষুদ্র ঋণের সুদের হার ১০ পার্সেন্ট এ বেঁধে দেয়া যায় আর মাসিকের পরিবর্তে ষান্মাষিক কিস্তিতে সেটা পরিশোধ করা যায়।
১৮) জনগণকে স্বল্প দূরত্বে চিকিৎসা সুবিধা সহজ প্রাপ্য করার স্বার্থে উপজেলা-জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও হাসপাতাল গুলোকে আরো কার্যকর করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। সরকারী ডাক্তারদের কর্মস্থলে অবস্থান বাধ্যতামূলক করা যায়। প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে সরকারী ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস নিষিদ্ধ করা যায়। বিভাগীয় পর্যায়ে একটি হাসপাতালকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মানে উন্নীত করা যায়। মেডিকেল কলেজের শিক্ষাকে ইউরোপ স্ট্যান্ডার্ডে উন্নীত করা যায়।
১৯) বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ৩ হাজার ডলারের নীচে আর সিঙ্গাপুরের মাথাপিছু আয় ৯০ হাজার ডলারের উর্ধেব। এটা বিশাল বৈষম্য। সুশাসন কায়েম করা ছাড়া এই বৈষম্য দুর করা যাবে না। বাংলাদেশের দূর্নীতি দমন কমিশনের সার্ভিসকে সিঙ্গাপুর স্ট্যান্ডার্ডে উন্নীত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়।
২০) যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপের সংগে মিল রেখে জাতীয় ভ‚মি ব্যবহার নীতিমালা প্রণয়ন করা যায়। নীচু ভ‚মিকে ভরাট করে কিংবা পাহাড় কেটে সমতল করে বাড়ী ঘর বানানো যাবে না। একমাত্র রকি পাহাড়ে বসবাসের অনুমতি প্রদান করা যায়।
২১) সিঙ্গাপুরের সংগে মিল রেখে জাতীয় গৃহায়ন নীতি প্রণয়ন করা যায়।
২২) মাঠ পর্যায়ে পরিবার পিছু ভ‚মি মালিকানার ১০০ এবং ৬০ বিঘা সীলিং কার্যকর না করায় ভ‚মির মালিকানা ভিত্তিক সামাজিক বৈষম্য ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অবিলম্বে ১০০ ও ৬০ বিঘা সীলিং কার্যকরের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়।
২৩) আমাদের অকার্যকর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা রহিত করে আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া কিংবা জার্মান ধাঁচে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা যায়।
২৪) প্রধানমন্ত্রী যাতে শেখ হাসিনার মত স্বৈরাচারী ভ‚মিকায় অবতীর্ণ হতে না পারেন সে লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাষ্ট্রপতির হাতে কিছু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অর্পণ করা যায়। সংবিধান সংশোধন করে জনপ্রশাসন-স্বরাষ্ট্র-প্রতিরক্ষা- দুর্নীতি দমন কমিশন-নির্বাচন কমিশন- শিক্ষা-আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির নিকট অর্পণ করা যায়। এটা করা হলে নির্বাচন কালীন তত্বাবধায়ক সরকারের আর প্রয়োজন হবে না। প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হতে পারেন।
২৫) হিল ট্র্যাক্টস রেগুলেশন ১৯০০ অনুযায়ী পার্বত্য এলাকা শাসিত হবে – উক্তরেগুলেশন আপডেট করা হবে এবং পার্বত্য এলাকার জন্য পৃথক ভ‚মি বন্দোবস্ত আইন ও ভ‚মি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল প্রনয়ণ করা হবে- সংবিধানে এই কয়টা লাইন অন্তর্ভুক্ত করে সংশোধন করা যায়।
২৬) দেশে পর্যটন শিল্প বিকাশের অমিত সম্ভাবনা রয়েছে। সেই লক্ষ্য অর্জনে গণ-পরিবহণ এবং আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ইউরোপ স্ট্যান্ডার্ডে উন্নীত করা যায়।
২৭) ভূমি সংক্রান্ত বিরোধে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৪৪ ধারার অপপ্রয়োগ নিষিদ্ধ করা যায়।
২৮) পাট ও চামড়া ভিত্তিক শিল্পের বিকাশ ঘটানোর উদ্যোগ নেয়া যায়। পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা যায়।
২৯) গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির প্রচেষ্টা জোরালো করা যায়। বঙ্গোপসাগরে এবং দেশের সমতলে প্রাপ্য মিনারেল/ খনিজ সম্পদ চিহ্নিত করণ এবং আহরণ প্রচেষ্টা জোরদার করা যায়।
৩০) বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি হবে সিঙ্গাপুরের মতো জোটনিরপেক্ষ। কাউকে কোন ধরণের সামরিক ঘাটি স্থাপন করতে দেয়া যাবে না। রেজিম চেঞ্জ মোকাবেলার জন্য কাউন্টার রেজিম চেঞ্জ ডেস্ক স্থাপন করা যায়। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা যায়।
৩১) সীমান্ত হত্যা বন্ধে, চোরচালান বন্ধে এবং সীমান্ত প্রতিরক্ষা জোরদারে ভারতের অনুরুপ সীমান্ত সড়ক নির্মাণ করা যায়।
৩২) খাল, বিল, নদী-নালা, পার্ক, বনাঞ্চল, পাহাড়-পর্বত, সুন্দরবন, বণ্যপ্রাণী, সীবিচ- প্রজাতন্ত্রের সম্পত্তি অবৈধ দখল মুক্ত করে ইউরোপ স্ট্যান্ডার্ডে সংরক্ষণ করতে হবে।
৩৩) পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড এবং পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সমূহকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা প্রদান করা যায়।
জুলাই আন্দোলনের শ্লোগান হউক বৈষম্যহীন-দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ । এটাকে সরকার পরিচালনায় জাতীয় গাইড লাইন হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
উপর্যুক্ত বিষয়গুলোকে বিবেচনায় নিয় জুলাই জাতীয় সনদ/২৪ পূনঃপ্রণয়ন করা যায়। ঐতিহাসিক প্রয়োজনে তা করার আবশ্যকতা রয়েছে। যদি সেটা করা সম্ভব না হয় তাহলে জুলাই বিপ্লব জাতির মনে দীর্ঘ স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করতে পারবে না। তবে উপর্যুক্ত ৩৩টি ইস্যুকে ক্ষমতাসীন সরকার যদি দলীয় কর্মসূচীর অন্তর্ভুক্ত করে সেটা বাস্তবায়নের সর্বাত্বক প্রচেষ্টা চালায় তাহলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের পক্ষে জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত সমর্থন বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। বিরোধী দল সমূহ ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার মত ইস্যু খুঁজে পাবে না। উল্লেখ্য, সংবিধান সংশোধনের এক্তিয়ার সংবিধান সংস্কার পরিষদের নেই মর্মে আমার অপর একটা লেখা আর্টিকেল ২৫ মার্চ ২০২৬ জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছিল যা সরকার কর্তৃক বিবেচনা করে দেখার অবকাশ রয়েছে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব।
