এ টি এম মোস্তফা কামাল
বাংলাদেশের উচিৎ জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতি অনুসরণ করে চলা। প্রতিবেশী ভারতসহ সকল দেশের সঙ্গেই আমাদের একই নীতি অনুসরণ করেই চলতে হবে। বাংলাদেশ যেহেতু কোন আগ্রাসী নীতিতে বিশ্বাস করে না- তাই কারো সংগে দ্বিপক্ষীয় বিশেষ ধরণের চুক্তি কিংবা প্রতিরক্ষা চুক্তি কিংবা দীর্ঘ মেয়াদী সামরিক সহযোগিতার চুক্তি করার কোন আবশ্যকতা নেই।
প্রতিবেশী ভারতসহ বিশ্বের যে কোন দেশ- বৈদেশিক ঋণ দাতা প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোন আন্তর্জাতিক সংস্থার সংগে যে কোন চুক্তি করার ক্ষেত্র উইন-উইন-সিচুয়েশন অনুসরণ করতে হবে। আমেরিকা যদি বলতে পারে আমেরিকা ফার্ষ্ট তাহলে বাংলাদেশকে ও অবশ্যই ঘোষণা করতে হবে- বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের ঘোষিত নীতি হচ্ছে ‘বাংলাদেশ ফার্ষ্ট’।
আমেরিকার সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি কিংবা সামরিক সহযোগিতা চুক্তি করে বিশ্বের কোন মুসলিম দেশ লাভবান হতে পারেনি। বাংলাদেশেরও লাভবান হবার কোন সম্ভাবনাই নেই। আমেরিকা তার নিজস্ব স্বার্থেই বাংলাদেশের সংগে প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে চাচ্ছে। বাংলাদেশে স্থল কিংবা জলসীমার মধ্যে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের উদ্দেশ্য নিয়েই আমেরিকা বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে চাচ্ছে বলে ধারণা করার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে। বাংলাদেশ তো আমেরিকার সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে আমেরিকার নিকট ধর্ণা দেয়নি- কিন্তু আমেরিকার পক্ষ থেকে কেন অযাচিত প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে? গ্লোবাল রাজনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টাকে সম্মুখে রেখে বঙ্গোপসাগরের সুবিধাজনক স্থানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের লক্ষ্যকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্যে আমেরিকার পক্ষ থেকে এরূপ প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। যেইমাত্র বাংলাদেশের উপর অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে সক্ষম হবে সেই মুহুর্তে আমেরিকা বাংলাদেশের সেন্টমার্টিন কিংবা অন্য কোন দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সুযোগ দাবী করে বসতে পারে। সেই দাবী উপেক্ষা করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে। সেই রূপ ঘাঁটি স্থাপনের কারণে বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশসহ বৈশ্বিক হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিঘিœত হতে পারে, বৈদেশিক ব্যবসা বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে- বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং শাসন ব্যবস্থার উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি হতে পারে। এরূপ চুক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। রাশিয়া এবং চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতি হতে পারে। সেজন্য যুক্তরাষ্ট্রের সংগে বাংলাদেশের কোন রূপ সামরিক সহযোগিতা/প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যাওয়া মোটেই সমীচীন হবে না। এতোসব প্রতিক‚ল অবস্থা মোকাবেলা করার ঝুঁকি নিয়ে প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বাংলাদেশের প্রতি বৎসর পনের থেকে বিশ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতিপুরণ দাবী করার আবশ্যকতাও থাকবে। এরূপ ক্ষতিপূরণ ছাড়া হতোদরিদ্র বাংলাদেশ কেন আমেরিকার সংগে প্রতিরক্ষা চুক্তি করে বহুমুখী ঝুঁকি গ্রহণ করতে যাবে?
আমেরিকার সংগে প্রতিরক্ষা চুক্তি করে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সুযোগ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব- বাহরাইন- কাতার- কুয়েত- সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন তাঁদের প্রতিবেশী মিত্রদেশ ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে- ইরান প্রতিনিয়ত আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে মিসাইল এবং ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। আমেরিকা তার নিজের সামরিক ঘাঁটির নিরাপত্তাই যেখানে নিশ্চিত করতে সক্ষম হচ্ছে না সেক্ষেত্রে এসব দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কি করে? সৌদি আরবসহ এসব আরব দেশ এখন বুঝতে পারছে তারা আমেরিকাকে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করার সুযোগ দিয়ে কি বোকামি করেছে?
আমেরিকা নিজের স্বার্থ ছাড়া অন্য কিছু বুঝে না। অন্য দেশের সম্পদ কিভাবে জোর জবরদস্তি করে নিজস্ব কব্জায় নিয়ে যাওয়া যায় সে বিষয়ে আমেরিকার প্রচেষ্টার অন্ত নেই। ইউক্রেনের মিনারেল্স নানা চলচাতুরী করে আমেরিকা তার কব্জায় নিয়েছে। মিনারেলস্ সমৃদ্ধ গ্রীনল্যান্ড দখলেও আমেরিকার প্রচেষ্টার কমতি নেই। ভেনিজুয়েলার তেল সম্পদ আমেরিকার কব্জায়। বাংলাদেশের মতো হতদরিদ্র একটা দেশের উপর অন্যায্য ট্যারিফ আরোপ করে বাণিজ্যিক সুবিধা আদায় করতে আমেরিকা একটুও কাপর্ণ্য করেনি। বাংলাদেশের কি ২৪ টা বোয়িং বিমান কেনার সামর্থ্য আছে নাকি আবশ্যকতা আছে? যেক্ষেত্রে বাংলাদেশের দারিদ্রতা দূরীকরণে সহায়তা করা বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অন্যতম কর্তব্য, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশকে শোষণ করার নীতি অবলম্বন করা আমেরিকার মতো দেশের পক্ষে একদম শোভা পায় না। বাংলাদেশের পোশাক কারখানার মালিকেরা অ্যামেরিকায় পুঁজি বিনিয়োগ করে আমেরিকায় পোশাক কারখানা স্থাপন করতে পারে- এরূপ অযৌক্তিক যুক্তি দেখাতেও আমেরিকা কোনরূপ ভ্রুক্ষেপ করে না।
বিভিন্ন দেশের বৈধ সরকারকে সরিয়ে (রেজিম চেঞ্জ) নিজের স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে নিজের পছন্দের সরকার বসানোর কাজও আমেরিকার পররাষ্ট্র নীতির একটা রুটিন কাজ। বাংলাদেশের ফ্যসিস্ট শেখ হাসিনার সরকার পরিবর্তনেও আমেরিকা ভালো অংকের অর্থ বিনিয়োগ করেছিল। ভবিষ্যত সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনে বিষয়টি তদন্ত করানোর আবশ্যকতা রয়েছে।
এরূপ প্রেক্ষাপটে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কসহ অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় কাজকর্ম চলবে সতর্কতার সঙ্গে এবং স্বাভাবিক ক‚টনৈতিক নিয়মে। আমেরিকার সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করার কোন আবশ্যকতা নেই। আমেরিকার সঙ্গে কোন ধরণের অ-প্রকাশ চুক্তিতে যাবারও প্রশ্নই আসে না। কারণ এরূপ চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে আমেরিকাকে বিশেষ ধরণের সুবিধা দেবার ব্যবস্থা থাকবে। হতদরিদ্র বাংলাদেশ নিজের অর্থনৈতিক ক্ষতি করে আমেরিকাকে বিশেষ ধরণের অর্থনৈতিক সুবিধা দিতে যাবে কেন?
আমেরিকার সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ মূহূর্তে স্বাক্ষরিত চুক্তি সম্পর্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য হচ্ছে চুক্তিটি স্বাক্ষরের পুর্বে বিএনপি-জামাতের সংগে আলোচনা করা হয়েছিল। বিএনপি-জামাতের সংগে আলোচনার বিষয়টি জনসম্মুখে আনার প্রাসঙ্গিকতা আছে কি? বিএনপি-জামাত কি চুক্তির কোন অংশীদার- নাকি তাদের কোন আইন-সংগত দায়বদ্ধতা আছে? এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক বিষয় হচ্ছে চুক্তিটিতে বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়েছে কিনা সেটা ক্ষতিয়ে দেখা। বিএনপি-জামাতের সংগে আলোচনা করে বাংলাদেশের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে চুক্তি করার কি কোন ন্যায়সংগত কারণ আছে?
এ বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য হচ্ছে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করেই আমেরিকার সংগে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাক্ষরিত চুক্তি বাস্তবায়ন করা হবে- কিন্তু কিভাবে সেটা সম্ভব হবে সেটা তিনি ব্যাখ্যা করে বলেননি। চুক্তিটি কি তিনি রিভিউ করেছেন? চুক্তিটিতে কি বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কিছু তিনি দেখতে পেয়েছেন নাকি পাননি? চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোন ক্লজ না থাকলে চুক্তিটি অ-প্রকাশ চুক্তি হতে যাবে কেন? চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী যে সব ক্লজ রয়েছে তা বাদ দিয়ে চুক্তি সংশোধন করার আবশ্যকতা রয়েছে। চুক্তিটি সংশোধন করা ছাড়া বাংলাদেশের স্বার্থ কিভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে সেবিষয়ে তিনি কিছু বলেননি? চুক্তিটি সংশোধন না করে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করে বাস্তবায়ন করার প্রশ্নই আসে না। সংশোধন না করলে যেভাবে আছে সেভাবে অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতে হবে। কাজেই চুক্তিটি বাংলাদেশের স্বার্থের প্রতিক‚লে হলে হয়তো বাতিল নতুবা সংশোধন করতে হবে। একটা অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার দেশের স্বার্থকে বিকিয়ে দিয়ে যে অ-প্রকাশ চুক্তি করেছে তাকে সুরক্ষা দেয়া নির্বাচিত সরকারের দায়িত্বের আওতায় পড়ে না। রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকি রয়েছে এরূপ কোন চুক্তি করা অনির্বাচিত কিংবা নির্বাচিত কারো জন্যেই উচিৎ নহে। অধিকন্তু, এরূপ চুক্তি সম্পর্কে জাতীয় সংসদে আলোচনাক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আবশ্যকতা ও রয়েছে- কারণ এটা কোন স্বাভাবিক চুক্তি নহেÑ এটা বিশেষ ধরণের চুক্তিÑ এ রূপ চুক্তি বাস্তবায়ন করা হলে বাংলাদেশ কিরুপ ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হবে তা নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনাক্রমে সিদ্ধান্ত নেবার আবশ্যকতা আছে। আমেরিকা যদি তার নিজ দেশের স্বার্থবিরোধী কোন চুক্তি না করে তাহলে বাংলাদেশ কেন বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোন চুক্তি আমেরিকার সংগে করতে যাবে- বাংলাদেশ কি তার বিশেষ সহায়তাপুষ্ট আশ্রিত কোন রাষ্ট্র?
লেখক-অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব।
