আমার কাগজ প্রতিনিধি
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্য বিএনপি নেতার ‘মতানৈক্য আর ব্যবসা নিয়ে আরেকজনের দ্বন্দ্ব থেকে পরিকল্পিতভাবে খুন’ করা হয় হারুন মাস্টারকে, বলছে পুলিশ।
বছরখানেক আগে ঢাকার দোহারের নয়াবাড়ি ইউনিয়ন বিএনপির নেতা সভাপতি হারুন অর রশিদ ওরফে হারুন মাস্টারকে খুনের পেছনে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক কারণ দেখছে পুলিশ।
হত্যাকাণ্ডের ওই ঘটনার অভিযোগপত্রে বিএনপির কয়েকজন নেতাসহ ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
পুলিশ বলছে, গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্য ‘বিএনপি নেতার সঙ্গে মতানৈক্য এবং ব্যবসা নিয়ে আরেকজনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব থেকে পরিকল্পিতভাবে’ খুন করা হয় হারুন মাস্টারকে।
গত ১০ মে এ মামলায় অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। সেখানে বিএনপি নেতা সামছুদ্দিন মেম্বার, শহিদ মিয়া ওরফে বালু শহিদ, সজিব হোসেন বাবু, মহসিন, জিহাদ চৌকিদার, রাব্বি, আল-আমিন, শরীফ, হুমায়ূন মোল্লা ও রাশেদুল হাসান চঞ্চলকে আসামি করা হয়েছে।
তবে স্থানীয় বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন মিলিটারি, দিপু শিকদার, সোহাগ ভূঞা ও মিরাজ নামে মামলার চার আসামিকে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া ফারুক হোসেন নামে একজন মারা যাওয়ায় তাকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
গত ২ জুলাই এ মামলার দিন ধার্য ছিল। তবে বাদীপক্ষ অভিযোগপত্র নিয়ে সন্তুষ্ট না হওয়ায় তাদের আইনজীবী মনির হোসেন সময় চেয়ে আবেদন করেন।
ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হাবিবুর রহমান সময় আবেদন মঞ্জুর করে আগামী ৮ অগাস্ট শুনানির পরবর্তী দিন রেখেছেন বলে জানান প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মো. শাহরিয়ার জানিয়েছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই জুবাদুল হক বলেন, “১০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছি। পাঁচ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা মেলেনি। তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
“চেয়েছি দোষীরা আইনের আওতায় আসুক। নির্দোষরা যেন হয়রানির শিকার না হয়।”
‘হত্যায় বিএনপির লোকজনও জড়িত’, অভিযোগ বাদীর
২০২৫ সালের ২ জুলাই ভোর ৬টার দিকে হারুন মাস্টারকে গুলি করার পর ছুরি মেরে হত্যা করা হয়। তিন দিন পর ৫ জুলাই দোহার থানায় মামলা দায়ের করেন তার ভাই আব্দুল মান্নান।
তিনি বলেন, “আমার ভাই খুব ভাল মানুষ ছিলেন। সামনে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন করার কথা ছিল। গত ১৭ বছর কত কষ্ট করেছি। ভিলেজ পলিটিক্স খুব খারাপ। সেই পলিটিক্সের কাছে আমার ভাই খুন হল।
“আমার ভাইয়ের খুব ইচ্ছে ছিল, একবার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। বলতেন, এমন কাজ করব যেন সবাই মনে রাখে।”
ভাইয়ের হত্যার ঘটনায় বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে মান্নান বলেন, “লোকাল রাজনীতি খুব খারাপ। অনেকে ভেবেছিল আমার ভাই থাকলে নয়-ছয় করতে পারবে না। এজন্য কিলার দিয়ে খুন করিয়েছে।
“এর সাথে বিএনপির লোকজনও জড়িত; এখন আর ভালো লাগে না।”
অভিযোগপত্র নিয়ে আপত্তির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “অভিযোগপত্র দেওয়ার আগে পুলিশের পক্ষ থেকে আমাদের সাথে যোগাযোগ করেনি। এজাহারে কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছিল, কিন্তু অভিযোগপত্রে নাম আসেনি। অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে নারাজি দাখিল করব।”
তদন্ত কর্মকর্তা জুবাদুল হক বলেন, “দিপু নামে একজনকে আসামি করা হয়। অথচ ঘটনার আট মাস আগে থেকে তিনি এখনো দেশের বাইরে। নাসিরের বয়স ৬৫ এর বেশি।
“যারা খুন করেছে ও খুনের সাথে সংশ্লিষ্ট আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, সিসিটিভ ভিডিও পর্যালোচনা করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছি।”
কী হয়েছিল সেদিন
একসময় দোহারের বাহ্রা হাবিল উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন হারুন অর রশিদ ওরফে হারুন। ছিলেন দোহার থানার নয়াবাড়ি ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সাবেক সভাপতি।
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই জুবাদুল হক বলেন, স্থানীয় বিএনপির ওই কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন আসামি সামছুদ্দিন মেম্বার। আরেক আসামি শহিদ মিয়া একসময় বালুর ব্যবসায় একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন।
“২০২৪ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর হারুন মাস্টারের সাথে সামছুদ্দিনের রাজনৈতিক মতানৈক্য এবং ব্যবসা ক্ষেত্রে শহিদের সাথে বিরোধ হয়। সামছুদ্দিন ও শহিদসহ অন্য আসামিরা হারুন মাস্টারকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।
“সামছুদ্দিন, ফারুক, সজিব, শহিদ, হুমায়ুন ছাড়াও মহসীন, জিহাদ, আল-আমিন, শরীফ, রাব্বি ও চঞ্চল শলাপরামর্শ করে। হত্যাকাণ্ডে চঞ্চল পিস্তল এবং জিহাদ মোটরসাইকেল সরবরাহ করে।”
হত্যার ঘটনার দিনের বর্ণনায় তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, হারুন মাস্টার ডায়াবেটিসের রোগী। প্রতিদিনের মত ফজরের নামাজের পর বাড়ির সামনে পদ্মা নদীর পাড়ে হাঁটাহাঁটি করতেন।
“২ জুলাই ভোর ৬টার দিকে বাহ্রা ও পূর্ব ধোয়াইর নদীর পাড় জাবেদের মোড়ে চঞ্চলের রেস্টুরেন্টের সামনে পৌঁছালে হারুনের গতিবিধি লক্ষ্য করেন মহসিন। তিনি শরীফ, আল-আমিন ও রাব্বিকে তথ্য দেন। রাব্বি মোটরসাইকেল চালিয়ে শরীফ ও আল-আমিনকে নিয়ে ওই জায়গায় যান।
“এরপর শরীফ পিস্তল দিয়ে হারুন মাস্টারকে লক্ষ্য করে গুলি করলে সেটি তার বাম গালে, বাম কানের নিচে ও ঘাড়ের নিচে ও পিঠের নীচের দিকে লাগে। হারুন মাস্টার লুটিয়ে পড়েন।”
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, “মৃত্যু নিশ্চিত করতে আল-আমিন ছুরি দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করেন। তাকে পদ্মা পাড়ে ফেলে চলে যায় আসামিরা। গুলির শব্দ ও হারুন মাস্টারের চিৎকারে আশপাশের লোকজন চলে আসে। তাকে উদ্ধার করে দোহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।”
মামলায় অভিযোগ করা হয়, দলীয় কোন্দলের কারণে ও স্থানীয় ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সামছুদ্দিন মেম্বার ও ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব নাসির উদ্দিনদের সঙ্গে বিরোধ চলে আসছিল। সেই বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে হারুন মাস্টারকে হত্যা করা হয়।
আসামি সামছুদ্দিন মেম্বারের আইনজীবী কে এম নজরুল ইসলাম রানা বলেন, “তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি হত্যার হুকুম দিয়েছেন। কিন্তু অভিযোগপত্র এমন কিছু আনতে পারেনি। বরং সামছুদ্দিন ভুক্তভোগী।”
হারুন মাস্টারের দুই মেয়ে ও এক ছেলে। ছেলে শাওন লন্ডন থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন। তাকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে লড়তে দেশে ফিরিয়ে এনেছেন তার চাচা আব্দুল মান্নান।
“আমার ভাইয়ের খুব ইচ্ছে ছিল চেয়ারম্যান হওয়ার। কিন্তু তার সেই আশা পূরণ হয়নি। ভাতিজাকে লন্ডন থেকে গ্রামে নিয়ে এসেছি। তাকে দিয়ে নির্বাচন করাব। ইনশাআল্লাহ, চেয়ারম্যান বানাব,” বলেন মান্নান।
