এ টি এম মোস্তফা কামাল
সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ সংসদীয় আসনের রাস্তাঘাট ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ৫০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ পাবেন। প্রতি বছর ১০ কোটি টাকা করে ৫ বছর সংসদ সদস্যরা নিজেদের পছন্দমত অবকাঠামো উন্নয়ন করতে পারবেন। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বিভাগওয়ারী সর্বমট ১৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প তৈরী করে স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রেরণ করেছে।
উল্লেখ্য, সংসদ সদস্যদের অনুকূলে এধরনের বরাদ্দ দেয়ার কাজ শুরু হয় ২০০৫-০৬ অর্থ বছর থেকে। সংসদ সদস্যদের অনুকূলে ১ম বরাদ্দ দেয়া হয় ২ কোটি টাকা – পরবর্তীতে তা বাড়িয়ে ১৫ কোটি (৯ম সংসদ)- ২০ কোটি (১০ম/১১ তম সংসদ)- আওয়ামী শাসনের শেষ দিকে তা ২৫ কোটিতে উন্নীত করা হয়। রাস্তাঘাট-সেতু-কালভার্ট- হাট বাজার-ঘাট ইত্যাদির উন্নয়ন কাজে এ অর্থ ব্যয় করা যাবে।
সংবিধান মোতাবেক প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়নের জন্য সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁদের অধিক্ষেত্র হচ্ছে সংসদ ভবন চত্বর। সংবিধান সংশোধন করে আইনী ভিত্তি তৈরী করা ছাড়া সংসদ সদস্যদেরকে সংসদীয় এলাকার উন্নয়ন কর্মকান্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত করা আইনসম্মত হবে না। আইন প্রণেতারা তো আইনী বিধান মেনেই তাঁদের দায়িত্ব প্রতিপালনে সচেষ্ট হবেন। রাষ্ট্রের কোথাও আইনী বিধান লংঘিত হলে তার বিরুদ্ধে সংসদ সদস্যরা জোরালো প্রতিবাদ জানাবেন- সংসদে প্রতিবাদের ঝড় তুলবেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সংসদ সদস্যরা নিজেরাই যদি আইন ভংগ করেন তাহলে এ দেশের শাসন ব্যবস্থা চলবে কি করে?
সংসদ সদস্যদেরকে সরকারের অনুগত করে রাখার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে এরূপ অন্যায্য উদ্যোগ গ্রহণ করাটা স্বাভাবিক। কিন্তু, সংসদ সদস্যরা সেরূপ টোপ গিলবেন কেন কিংবা সেরূপ পাতানো ফাঁদে পা ঢুকাবেন কেন?
এলজিইডি এরুপ প্রকল্প প্রণয়নে অতি উৎসাহী হতেই পারেন। কারণ ৮ বিভাগের জন্য যদি বৈদেশিক ঋণের অর্থায়নে পৃথক ৮টি প্রকল্প পাশ করানো যায় তাহলে প্রত্যেক প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক নতুন গাড়ী ক্রয় করার সুযোগ সৃষ্টি হবে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মকর্তার বিদেশ ভ্রমণের ব্যবস্থা থাকবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের একচ্ছত্র অধিকার পাবে এলজিইডি- প্রকল্প পরিচালক হতে পারবেন ৮ জন প্রকৌশলী- কিছু নতুন কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়োগের সুযোগও সৃষ্টি হবে।
উপজেলা পরিষদ সৃষ্টির পর থেকে উপজেলার উন্নয়নের জন্য থোক উন্নয়ন বরাদ্দ হয়ে আসছে। সে অর্থও মূলতঃ এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশল শাখার মাধ্যমে রাস্তাঘাট-কালভার্ট-হাট বাজার ইত্যাদির উন্নয়ন কাজে ব্যয় হয়ে আসছে। ২০০০ সাল অবধি এরূপ থোক বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ৫০ থেকে ৭০/৮০ লক্ষ টাকা। উপজেলা পরিষদের তত্বাবধানে এরুপ ৫০-৬০ লক্ষ টাকা ব্যয় করতে ও উপজেলা প্রকৌশল শাখাকে হিমশিম খেতে হয়েছে।
সংসদ সদস্যদের অনুক‚লে দেয়া উন্নয়ন বরাদ্দের বছর ওয়ারী ১০ কোটি টাকা সঠিক বাস্তবায়ন পদ্ধতি অনুসরণে ব্যয়ের সক্ষমতা উপজেলা প্রকৌশল শাখার নেই। তাহলে উপজেলা পরিষদের নিজস্ব উন্নয়ন তহবিলের অর্থ এবং সংসদ সদস্যের অনুকুলে বরাদ্দকৃত ১০ কোটি টাকার প্রকল্প উপজেলা প্রকৌশল শাখা কর্তৃক কিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে?
উপজেলা পরিষদের আয়তন তো সীমিত। একটা উপজেলায় যদি পৌরসভা থাকে তাহলে পৌরসভার আওতাধীন এলাকায় পৌরসভা কর্তৃক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়ে থাকে। সেটি উপজেলা পরিষদের আওতামুক্ত। সড়ক-জনপথ বিভাগের আওতাধীন সড়ক ও সেতু থেকে থাকলে সেটি ও উপজেলা পরিষদের আওতামুক্ত। জেলা পরিষদের কোন রাস্তা-হাট বাজার থেকে থাকলে সেটি ও উপজেলা পরিষদের আওতামুক্ত। পৌরসভা- সড়ক ও সেতু বিভাগ এবং জেলা পরিষদের আওতাধীন এলাকাসমূহ বাদ দিলে উপজেলা পরিষদের উন্নয়ন প্রকল্পের আওতাধীন এলাকা সীমিত হয়ে পড়ছে। ধরা যাক, একটা উপজেলায় ৫০ থেকে ১০০টা বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা প্রয়োজন এবং সেগুলোর নির্মাণ কাজ ১৯৮৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে শেষ হয়ে গিয়েছে- নতুন করে বক্স কাল্ভার্ট নির্মাণের কোন সুযোগ নেই। সেতু নির্মাণের সক্ষমতা উপজেলা প্রকৌশল শাখার নেই। ধরা যাক, একটা উপজেলায় ১০০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক পাকা করণের আবশ্যকতা ছিলো।যদি ধরে নিই, ১৯৮৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে উপর্যুক্ত পরিমাণ কাঁচা সড়ক পাকা করণের কাজ শেষ- তাহলে সংসদ সদস্যের জন্য বরাদ্দকৃত বিশাল অংকের অর্থ দিয়ে সড়ক নির্মাণ/পূনঃনির্মাণ কিংবা সংস্কার করা যাবে কি করে?
এবার আসা যাক, পার্বত্য এলাকায় উপজেলা পরিষদের অনুক‚লে বরাদ্দকৃত স্বাভাবিক উন্নয়ন তহবিল দ্বারা উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মত্রণালয়ের বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে প্রচুর উন্নয়ন মূলক কাজ করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। সংসদ সদস্যদের অনুকূলে বরাদ্দকৃত অর্থ দ্বারা যে ধরণের প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কথা পার্বত্য জেলাসমূহে সে ধরণের কোন প্রকল্প খুঁজে বের করা আদৌ সম্ভব হবে না। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার মাটিরাংগা উপজেলায় ১৯৮৯-৯২ সময়কালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে। তখন গুইমারা থানা মাটিরাংগার অধীনে ছিল। মাটিরাংগার পুরো এলাকা সম্পর্কে আমার ধারণা রয়েছে। সেখানে সংসদ সদস্যের পুরো ৫ বছর সময়কালে এক কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প খুঁজে বের করাও দুষ্কর হবে। তাই পার্বত্য এলাকার সংসদ সদস্যদের জন্য প্রতি বছর ১ কোটি টাকা করে ৫ বছরের জন্য সর্বমোট ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা যেতে পারে।
উপজেলা পরিষদ কর্তৃক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকার কর্তৃক প্রতি অর্থ বছরে যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়ে থাকে সেই অর্থ দ্বারা যে ধরণের উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করার কথা সংসদ সদস্যের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের দ্বারা ও একই ধরণের প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে। উপজেলা প্রকৌশল শাখা কর্তৃক স্বাভাবিক বরাদ্দ এবং সংসদ সদস্যের জন্য প্রদত্ত বিশেষ বরাদ্দ দ্বারা প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করার কথা। উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা হিসেবে উপজেলা পরিষদের নিজস্ব উন্নয়ন তহবিল দ্বারা প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যের এক ধরণের ভূমিকা থাকবে আবার সংসদ সদস্যের অনুকূলে বরাদ্দকৃত বিশাল অংকের অর্থ দ্বারা প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রেও সংসদ সদসস্যের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকবে। এতে একই ধরণের একটা প্রকল্পের বিপরীতে একাধিকবার অর্থ উত্তোলনের সম্ভাবনা থেকে যাবে। উপজেলা প্রকৌশলী এ কাজে সংসদ সদস্যকে পুরো মাত্রায় সহযোগিতা করবেন বলে ধারণা করা যায়। ওভারলেপিং এড়ানোর লক্ষ্যে সংসদ সদস্যের অনুক‚লে প্রদত্ত বিশেষ বরাদ্দ দ্বারা বিশেষ ধরণের প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের বিষয় বিবেচনার অবকাশ রয়েছে।
সংসদ সদস্যের অনুকূলে বরাদ্দকৃত বিশাল অংকের এই অর্থকে তিনি বিবেচনা করতে পারেন তাঁর স্বেচ্ছাদীন তহবিলের মত। তিনি আরো মনে করবেন ব্যয়ের ক্ষেত্র থাকুক আর না থাকুক- তাতে কিছু আসে যায় না- যে কোন উপায়ে তাঁকে পুরো অর্থ ব্যয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। সেরূপ ক্ষেত্রে বিশাল অংকের অর্থ অপচয়ের আশঙ্কা থেকে যাবে।
এনজিও-গুলো দেশী বিদেশী অর্থায়নে গৃহীত প্রকল্পে ৭০-৮০ পার্সেন্ট লাভ করতে চাহে। ১৯৯১ এর প্রলয়ংকরী ঘূর্ণঝড়ের পর প্রচুর সংখ্যক এনজিও চকরিয়া উপজেলায় পুনর্বাসন কাজে অংশ গ্রহণ করে। কোন এনজিও-কেই আমি প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজে দায়বদ্ধতার অধীনে আনতে পারিনি। ন্যাশনাল নিউট্রিশন প্রোগ্রামের কাজ ১০টা লীড এনজিও বাস্তবায়ন করতো। বাস্তবায়ন কাজ দেখতে যখন ফিল্ড ভিজিটে যাওয়া শুরু করলাম তখন এনজিওগুলোর উর্ধবতন কর্মকর্তারা মহাব্যস্ত হয়ে পড়তেন। আর কাউকে না জানিয়ে যখন ফিল্ডে যেতাম তখন দেখতাম নিউট্রিশন কেন্দ্রগুলো ফাঁকা। সিলেট সদরে নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত থাকাকালে আরো কঠিন বাস্তবতার সম্মখিীন হলাম। একটা শীর্ষ স্থানীয় এনজিও- সিলেট সদরে কোন স্যানিটারী ল্যাট্রিন স্থাপন না করে এনজিও এফেয়ার্স ব্যুরোতে বিল দাখিল করেছিল। ব্যুরো কর্তৃক বিলটি আমার মতামতের জন্য প্রেরণ করলে আমি উপজেলা স্যানিটারী পরিদর্শককে দিয়ে শতভাগ পরীক্ষাক্রমে দেখতে পাই কোন কাজ না করে বিল দাখিল করা হয়েছে। সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ এনজিও-দের অনুসৃত পদ্ধতি অনুসরণে ব্যয় করা হলে সংসদ সদস্যরা ইমেজ সঙ্কটে পড়তে পারেন।
এবার আসা যাক- পার্বত্য এলাকার শান্তকরণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে- সময়কাল ১৯৮৯-১৯৯২। মাটিরাংগা জোন সদর দপ্তরের চতুর্দিকে জংগল পরিষ্কারকরণের জন্য শতাধিক পৃথক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল- কিন্তু প্রকল্পের জন্য যে গম বরাদ্দ করা হতো সেই গম জংগল পরিষ্কারকরণের কাজে ব্যবহার করা হতো না। প্রকৃতপক্ষে জোন কর্তৃপক্ষ প্রকল্পের অনুক‚লে বরাদ্দকৃত গমের অর্থ দিয়ে শান্তকরণ কর্মসূচী পরিচালনা করেছিলেন। সংসদ সদস্যের অনুক‚লে বরাদ্দকৃত অর্থের বিপরীতে গৃহীতব্য প্রকল্পগুলো শান্ত করণ কর্মসূচির রূপ পরিগ্রহ করুক সেটা দেশবাসী কর্তৃক প্রত্যাশিত নহে।
উপজেলা পর্যায়ে যে কাজগুলোর প্রতি অধিক গুরুত্ব দেয়া অত্যাবশ্যক সেগুলো হচ্ছে প্রজাতন্ত্রের সম্পত্তি তথা খাল-বিল-নদী-নালা-সড়ক জনপথের জায়গা-বন বিভাগের মালিকানাধীন জায়গা থেকে অবৈধ দখলকার উচ্ছেদপূর্বক সীমানা প্রাচীর/সীমানা পিলার/ কাঁটা তারের বেড়া নির্মাণ করে আর কখনো যেন বেদখল হতে না পারে তার নিশ্চয়তা বিধান করা। খাল খনন/পুনঃখনন কর্মসূচি প্রণয়ন করে সেটাকে অত্যাবশ্যকীয় বাৎসরিক কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা। প্রতি বৎসর সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়কালকে খাল খনন/পুনঃখনন এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ/পুনঃনির্মাণ কর্মসূচির জন্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ দ্বারা এরূপ কাজ করা হলে দেশবাসী উপকৃত হবে।
উপজেলা পরিষদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য সরকার কর্তৃক যে বরাদ্দ প্রদান করা হয় সেটাকে দ্বিগুণ করে দিলে সংসদ সদস্যরা তাঁদের পছন্দমাফিক উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করতে পারবেন।
বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার অবকাঠামোর মধ্যে উপজেলা পরিষদের অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটিকে ইউরোপ-আমেরিকা কিংবা যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সরকারের আদলে গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক। গ্রামে ঘর/ বাড়ী নির্মাণের একটা নীতিমালা করার আবশ্যকতা রয়েছে। সংসদীয় এলাকাকে চাঁদাবাজমুক্ত করার দাবী সার্বজনীন। সংসদীয় এলাকার জনগণ যাতে বিশ্বমানের শিক্ষা এবং চিকিৎসা সেবা পেতে পারে তার প্রতি নজর দেয়া অত্যাবশ্যক।
লেখকঃ অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব।
