আমার কাগজ ডেস্ক
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি চুক্তির পথে অগ্রসর হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান ইস্যুতে দুই নেতার রাজনৈতিক ও কৌশলগত লক্ষ্য এখন আর এক নয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহু আশা করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ সামরিক অভিযান ইরানের শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করবে এবং দেশে আসন্ন নির্বাচনের আগে তার রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এখন যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে এসে কূটনৈতিক সমাধানের দিকে এগোচ্ছে, যা ইসরায়েলের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। খবর রয়টার্সের।
ইসরায়েলের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেন, এই চুক্তি ইসরায়েলের জন্য ভালো নয়। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সেনাপ্রধান পর্যন্ত নেতৃত্বের কেউই এটিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময় উভয় পক্ষ চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির শর্ত নিয়ে আলোচনা করবে। তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এই সময়সীমা আরও বাড়তে পারে, ফলে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়বে।
গত কয়েক মাসে লেবানন ইস্যুতে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে একাধিকবার মতবিরোধ দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল ইরানের সঙ্গে আলোচনার স্বার্থে লেবাননে উত্তেজনা না বাড়াতে, কিন্তু ইসরায়েল সেখানে হামলা অব্যাহত রেখেছে।
মার্কিন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প ফোনে নেতানিয়াহুকে বৈরুতে হামলা না চালানোর নির্দেশ দেন। সেদিন হামলা স্থগিত করা হলেও এক সপ্তাহ পর ইসরায়েল আবার বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালায়, যার জবাবে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে।
সোমবার (১৫ জুন) জেরুজালেমে এক সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহু বলেন, তিনি (ট্রাম্প) যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, আর আমি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী। অনেক বিষয়ে আমাদের মত এক হয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে হয় না। আমি ইসরায়েলের নিরাপত্তার স্বার্থ রক্ষা করি।
আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় রয়েছে- সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ করা, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ৬০ দিনের আলোচনা শুরু, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয় বিবেচনা করা।
তবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি তেহরানের সমর্থনের বিষয়টি আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ইসরায়েল মনে করছে, এই চুক্তির মাধ্যমে তাদের প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগগুলোর সমাধান হচ্ছে না। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরায়েল লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে সেনা মোতায়েন অব্যাহত রাখবে এবং হিজবুল্লাহর যেকোনো হামলার জবাব দিতে স্বাধীন থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিকভাবে বিব্রতকর হতে পারে। কারণ তিনি দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিলেন যে ট্রাম্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ইসরায়েলের জন্য বড় কৌশলগত সুবিধা এনে দেবে।
বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষক জনাথন রাইনহোল্ড বলেন, নেতানিয়াহু এই চুক্তিকে ইসরায়েলি জনগণের কাছে সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করতে পারবেন না। তার সবচেয়ে বড় আশা হতে পারে, ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনা ভেঙে পড়বে এবং পরিস্থিতি আবার ইসরায়েলের অনুকূলে যাবে।
সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৪১ শতাংশ ইহুদি ইসরায়েলি মনে করেন ট্রাম্প তাদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেন। মার্চ মাসে এই হার ছিল ৬৪ শতাংশ।
ইসরায়েলের জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন বলেছেন, ভবিষ্যতে ইরান যদি আবার পারমাণবিক বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি জোরদার করে, তাহলে প্রয়োজনে ইসরায়েল একাই ব্যবস্থা নেবে।
কোহেন বলেন, ইরান যদি আবার পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুনরায় চালু করে, আমরা অবশ্যই পদক্ষেপ নেব।
ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্প বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ
