এ টি এম মোস্তফা কামাল
ট্যাক্সেবেল ইনকাম- কর প্রদানযোগ্য আয় থাকলে ব্যক্তি/ব্যবসা প্রতিষ্ঠান/এনজিও/অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলকভাবে আয়্যকর প্রদান করতে হবে- এটাই হবে রাষ্ট্রের নীতি। সরকারের রাজস্ব ব্যয় এবং উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহের জন্য রাষ্ট্র এই অর্থ ব্যয় করবে। আয়করের মাধ্যমে অর্জিত রাজস্ব আয়ের সংগে প্রজাতন্ত্রের সকল কর্মচারী এবং প্রজাতন্ত্রের মালিক সাধারণ জনগণ জড়িত। রাজস্ব আয় দিয়ে একদিকে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন ভাতা নির্বাহ করা হয়ে থাকে আর অন্যদিকে জনসাধারণের কল্যাণে রাষ্ট্র কর্তৃক বিভিন্ন ধরণের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়ে থাকে। তদুপরি সরকার কর্তৃক সভারিন গ্যারান্টির বিনিময়ে যে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করা হয়ে থাকে সেই ঋণ পরিশোধ করা হয়ে থাকে রাজস্ব আয়ের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে। কাজেই রাজস্ব আয়কে ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারে এরূপ কোন সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে প্রজাতন্ত্রের সকল কর্মচারী এবং প্রজাতন্ত্রের মালিক সাধারণ জনগণের সন্মতি গ্রহণের আবশ্যকতা রয়েছে। কাজেই ব্রাক এবং গ্রামীণ ব্যাংককে আয়কর অব্যাহতি প্রদানের ক্ষেত্রে গণভোট আয়োজনের আবশ্যকতা অনস্বীঃকার্য।
কোন অপরাধী যেমন নিজের বিচার নিজে করতে পারেন না তেমনি কোন সুবিধাভোগী ব্যাক্তি নিজে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আয়কে ক্ষতিগ্রস্থ করে নিজস্ব প্রতিষ্ঠানকে অন্যায্য সুবিধা প্রদান করে অন্যায্য আয় অর্জনের সুযোগ দিয়ে কোন সরকারী ফরমান/আদেশ জারী করতে পারেন না। পাবলিক চেয়ারে বসে জনস্বার্থে সকল কর্ম সম্পাদন করতে হবে। পাবলিক চেয়ারে বসে ব্যক্তিস্বার্থ নিয়ে ভাবার কিংবা ব্যক্তি স্বার্থ নিয়ে কাজ করার কিংবা নিজস্ব প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সুবিধা প্রদান করার কোন নৈতিক অধিকার কারো নেই- যদি কেউ সেটা করেন তাহলে সেটা হয়ে যাবে ক্ষমতার অপব্যবহার।বিশ্বখ্যাত নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ইউনূস কেন সেরূপ কাজ করতে প্রবৃত্ত হবেন? এরূপ কাজ করার পুর্বে কাজটি ন্যায্য কি অন্যায্য সেটা বিবেচনায় নেয়া উচিৎ ছিল। অন্যায্য হলে দেশের সাধারণ জনগণ সেটাকে কিভাবে গ্রহণ করবেন এবং তাঁর ব্যক্তিত্বের উপর কোন বিরূপ প্রভাব পড়বে কিনা সেসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তাঁর এজাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের আবশ্যকতা ছিল।
গ্রামীণ ব্যাংক এবং ব্রাকের আয়কর প্রদানের সক্ষমতা আছে কিনা? দুটো প্রতিষ্ঠানই ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে অত্যন্ত সফল এবং দুটো প্রতিষ্ঠানের বিশাল আকারের আয় রয়েছে। তাঁদের আয়কর প্রদানের যথেষ্ট সক্ষমতা ও রয়েছে। যথেষ্ট সক্ষমতা থাকা স্বত্তে¡ও কেন তাঁরা আয়কর প্রদান করবেন না? তাঁরা আয়কর প্রদানে অক্ষমতার কোন যুক্তি দেখিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিকট আবেদন করার কোন অবকাশ নেই। সরকারী কর্মচারী, ক্ষুদ্র ও মাঝারী ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যারা ঋণ নিয়ে যথাসময়ে আয়কর পরিশোধ করে থাকেন। তাঁদের সংগে তুলনা করলে গ্রামীণ ব্যাংক এবং ব্রাক কি আয়কর অব্যাহতি পেতে পারে? এই সব কিছু বিবেচনা করে যদি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড দুটো প্রতিষ্ঠানকে আয়কর অব্যাহতি দিয়ে থাকেন তাহলে ধরে নিতে হবে বৈষম্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দায় রয়েছে। সরকারের রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে সেটা জেনে ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এ জাতীয় ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত কিভাবে নিতে পেরেছে তা ভেবে জাতিকে বিস্মিত হতে হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে জনগণের চাওয়া হচ্ছে জারাবো জাতীয় স্বার্থকে সমুন্নত রেখে নিজস্ব দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হবেন।
ক্ষুদ্র ঋণের সুদের হার বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হারের চাইতে দেড় থেকে ২গুণ বেশী। বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হার হচ্ছে প্লাস মাইনাস ১৫ পার্সেন্ট আর ক্ষুদ্র ঋণের সুদের হার হচ্ছে ২৩ থেকে ৩০ পার্সেন্ট। ক্ষুদ্র ঋণ আদায় করা হয় মাসিক কিস্তিতে আর বাণিজ্যিক ঋণ আদায় করা হয় বাৎসরিক কিস্তিতে। বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে প্রায় ২গুণ বেশী লাভ করে ব্রাক এবং গ্রামীণ ব্যাংক কেন আয়কর প্রদান করবে না? বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে কি সরকার আয়কর অব্যাহতি দিয়েছেন? বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আয়কর অব্যাহতি না দিয়ে গ্রামীণ ব্যাংক এবং ব্রাককে কি করে আয়কর অব্যাহতি প্রদান করা হলো?
সরকারী এবং বেসরকারী সুত্রে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে এনজিও গুলো যে সকল প্রকল্প বাস্তবায়ন করে থাকে সেখানে ও লাভের পরিমাণ ৫০ পার্সেন্ট এর বেশী। এ বিষয়ে আমার বিস্তর বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে।
সরকার দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষায়- আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে- যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে থাকেন। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণে না থাকলে কেউ দেশে ব্যবসা বাণিজ্য করতে পারবে না। সরকারী সুবিধা নিয়ে ব্যবসায় করবেন আর সরকারী ব্যয় নির্বাহের জন্য আয়কর প্রদান করবেন না-সেটাতো হতে পারে না।
সরকারের বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী ট্যাক্সেবল ইনকাম না থাকলে আয়কর দিতে হয় না। গ্রামীণ ব্যাংক এবং ব্রাকের ট্যাক্সেবল ইনকাম না থাকলে ট্যাক্স দিতে হবে না- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু হাজার হাজার কোটি টাকার ট্যাক্সেবল ইনকাম থাকা স্বত্তে¡ও ট্যাক্স দেয়া হবে না- এটাতো জনগণ মেনে নিতে পারে না। পৃথিবীর অন্য কোন দেশে এ জাতীয় নজীর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
ব্রাকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান স্যার ফজলে হাসান আবেদের ও রয়েছে বিশাল সুখ্যাতি। রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ব্রাককে অত্যন্ত যতœশীল হবার আবশ্যকতা রয়েছে- তাই ব্রাকের কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণই জনগণের প্রত্যাশিত।
যতদূর জানা যায় ব্রাককে আয়কর অব্যাহতির এ সুযোগ দেয়া হয়েছিল ১৯৯৯ সালে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের যে চেয়ারম্যান এ সুযোগ দিয়েছিলেন তিনি অবসর গ্রহণের পর উক্ত প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছিলেন। কি অদ্ভুত ব্যবস্থা- আয়কর অব্যাহতির সুযোগ দিয়ে নির্বাহী পরিচালক হবার! নির্বাহী পরিচালক হিসেবে তিনি হয়তো তিন বছর দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলেন- কিন্তু ব্রাককে প্রদত্ত কর অব্যাহতির সুযোগ তো আজো অব্যাহত রয়েছে বলে জানা যায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে উনার পরবর্তী চেয়ারম্যানগণ কেন উক্ত সুবিধা প্রত্যাহার করেননি? আমাদের টকশো ব্যক্তিত্ব যিনি নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে দর্শকদের মাতিয়ে রাখেন তিনি ও কেন জাতীয় রাজস্ব বর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন কালে উক্ত সুবিধা প্রত্যাহার করেননি? আশা করছি তিনি হয়তো পরবর্তী কোন টকশো-তে এ বিষয়ে তাঁর অবস্থান তুলে ধরে বক্তব্য রাখবেন।
আমাদের দেশে এতো রাজনৈতিক দল রয়েছে কিন্তু কাউকে সরকারের অন্যায্য এরুপ আদেশের বিরুদ্ধে তাঁদের অবস্থান তুলে ধরতে দেখা যায় না। আইন বিশারদ এবং সামাজিক সংঘঠন গুলোর ও একই ধরণের অবস্থা। কি অদ্ভুত আমাদের দেশ- যে দেশে সবাই ব্যক্তি স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত। আমেরিকার উচ্চ/নিম্ন আদালত প্রেসিডেন্টের কিংবা সরকারের অনেক আদেশকে স্থগিত কিংবা বাতিল করে আদেশ প্রদান করতে দেখা যায় অথচ আমাদের দেশে সেরুপ কোন ব্যবস্থা ও পরিলক্ষিত হয় না- তাহলে আমাদের দেশের জনগণ কিভাবে এরূপ অন্যায্য আদেশ থেকে রক্ষা পাবেন? ১৯৯০ পূর্ববর্তী সময়ে আমাদের দেশে পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টকে সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু আজকাল পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টকে সরকারের পক্ষ থেকে গুরুত্ব দিতে দেখা যায় না।
রাষ্ট্রের অর্থনীতি সংক্রান্ত বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রীর ও গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করার রয়েছে। আশা করছি তাঁরা তাঁদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে তৎপর হবেন।
কোন ব্যবসায়ীকে কিংবা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানকে অন্যায্য সুযোগ সুবিধা প্রদান করে কোন ক্ষমতাসীন সরকারই ভাল ফল লাভ করতে পারেনি। সালমান এফ রহমান এবং এস আলম গ্রুপ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
পাবলিকের হক নষ্ট করে ন্যাচারাল জাস্টিস থেকে পরিত্রাণ পাবার উপায় কারো নেই। সুযোগ দাতা এবং সুযোগ গ্রহণকারী কেউ এরূপ দায় এড়াতে পারবেন না। পাবলিক চেয়ারে বসে দায়িত্ব পালন করার সময়কাল ন্যাচারাল জাস্টিসের আওতামুক্ত থাকবে – এরূপ ভাবার ও কোন অবকাশ নেই। পাবলিকের হকের দায় থেকে পারলৌকিক জীবনে মুক্তি পাবার ও কোন উপায় নেই। গ্রামীণ ব্যাংক এবং ব্রাকের আয়কর অব্যাহতি প্রদান করে দেয়া আদেশের সংগে পাবলিকের হকের বিষয়টা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী এদেশের ৭১ পার্সেন্ট লোক স্বাস্থ্যসন্মত খাবার খেতে পায় না কারণ স্বাস্থ্যসন্মত খাবার ক্রয় করে খাওয়ার সামর্থ্য তাঁদের নেই। আর এদেশেই অন্যায্য কর অব্যাহতির সুযোগ দিয়ে অন্যায্য পন্থায় কোন প্রতিষ্ঠানকে সম্পদের বিশাল পাহাড় গড়ে তোলার সুযোগ করে দেবার কোন নৈতিক অধিকার কারো নেই। কাজেই পাবলিক চেয়ারে বসে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সবাইকে প্রতিটি কাজের ন্যায্যতার প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে-এক্ষেত্রে আমাদের জাতীয় শ্লোগান হতে পারে- কারো কাছ থেকে অন্যায্য কোন সুযোগ নেব না- কাউকে অন্যায্য কোন সুযোগ দেব না।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব।
