আমার কাগজ প্রতিবেদক
দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, জনবল সংকট ও যান্ত্রিক অচলাবস্থার কারণে গভীর সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। পরিত্যক্ত রেলের নাট–বল্টু ও পুরোনো যন্ত্রাংশ জোড়াতালি দিয়ে চালানো হচ্ছে ট্রেন। মেরামত থেকে শুরু করে পরিচালনার প্রতিটি ধাপে সমন্বয়হীনতার ফলে নিয়মিতই বিপর্যস্ত হচ্ছে ট্রেনের শিডিউল। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাচ্ছেন ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটের যাত্রীরা। নির্ধারিত সময়ে ট্রেন না পেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে তাদের।
রেল-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা ও সমন্বয়ের অভাবে লোকসানের বোঝা আরও ভারী হচ্ছে সরকারের এই পরিবহন খাতে।
রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে যাত্রীদের অপেক্ষার চিত্রই তার প্রমাণ। চট্টলা এক্সপ্রেসের নির্ধারিত যাত্রা সময় বেলা আড়াইটা হলেও যাত্রীদের মোবাইলে পাঠানো ক্ষুদে বার্তায় জানানো হয়, ট্রেনটি সাড়ে চারটার আগে আসার সম্ভাবনা নেই।
একজন যাত্রী বলেন, সকাল সাড়ে দশটার ট্রেন। এখানে এসে জানানো হচ্ছে দুই ঘণ্টা দেরি হবে। আমার পরদিন পরীক্ষা, এখন আমি কোথায় যাব?
আরেক যাত্রী জানান, ট্রেন কখনো এক ঘণ্টা, কখনো দুই–তিন ঘণ্টা দেরিতে আসে। নির্দিষ্ট সময় বলে কিছু নেই।
ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটে এমন ভোগান্তি নিয়মিত হলেও কমলাপুর স্টেশন ম্যানেজার সাজেদুল ইসলাম বিলম্বের জন্য ঘন কুয়াশা ও লোকোমোটিভ সংকটকে দায়ী করেন।
তিনি বলেন, পর্যাপ্ত লোকোমোটিভ না থাকায় অনেক সময় একই ইঞ্জিন দিয়ে একাধিক ট্রেন চালাতে হয়। রিফুয়েলিং ও মেইনটেন্যান্সের পর আবার ট্রেন চালু করতে গিয়ে বিলম্ব হয়। এর সঙ্গে আবহাওয়ার প্রভাবও থাকে।
শিডিউল বিপর্যয়ের ভেতরের খবর জানতে আরটিভি রেলওয়ের গ্যারেজে যায়। সেখানে যাত্রা শেষে ট্রেনের বগি পরিষ্কার ও মেরামতের কাজ করা হয়। কিন্তু জনবল সংকট প্রকট।
এক কর্মী বলেন, আগে আমাদের একজন ডিএম ছিল, এখন কাজির দায়িত্বে একজন, এম দুইজন। কিন্তু গাড়ি বেড়েছে, লোক বাড়েনি।
লোকবলের অভাবে কর্মীদের অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হচ্ছে। গ্যারেজের স্টোরে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশেরও ঘাটতি। ফলে পরিত্যক্ত ও মরিচা ধরা যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করে কোনোভাবে ট্রেন চলাচলের উপযোগী করা হচ্ছে।
এক কর্মী জানান, স্টোরে নাট, স্প্রিং নেই। তাই পুরোনো ট্রলি থেকে খুলে এনে আপাতত একটি গাড়ি সচল করছি। নতুন যন্ত্রাংশ নেই, কোচও নেই।
গ্যারেজ ইনচার্জ মো. হাদিউজ্জামান এসব সংকটের কথা অকপটে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ে সমন্বয়হীনতায় ভুগছে। ইঞ্জিনের সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি মিটারগেজ লাইনের উন্নয়ন দরকার। ক্যারেজ সাইড ও ওপেন সেকশন-সব জায়গায় জনবল সংকট। গাড়ি, ইঞ্জিন ও লাইন বাড়ানো হচ্ছে, কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের জন্য লোক বাড়ানো হচ্ছে না। এতে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
অব্যবস্থাপনা, জনবল সংকট ও যান্ত্রিক অচলাবস্থার কারণে রেলওয়ে পূর্ব বিভাগে প্রতি মাসে বন্ধ থাকছে প্রায় ৬০০ ট্রেন। পর্যাপ্ত যাত্রী থাকা সত্ত্বেও এ কারণে প্রতিবছর লোকসান বাড়ছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেলওয়ে এক টাকা আয়ের বিপরীতে ব্যয় করেছে প্রায় দুই টাকা পয়সা।
