দেশের প্রথম ধনী শিল্পপতি জহুরুল ইসলাম
মোহাম্মদ খলিলুর রহমান
আজ কর্মবীর শিল্পপতি আলহাজ্ব জহুরুল ইসলামের ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী। সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করছি সেই মহান মানুষটিকে—যার শ্রম, মেধা, সততা, একনিষ্ঠতা, আত্মবিশ্বাস ও সুদূরপ্রসারী চিন্তাশক্তি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে এনেছিল এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
দেশের সীমা অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তিনি ব্যবসার বিস্তার ঘটিয়েছিলেন। তাঁর উদ্যোগে বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমশক্তির কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ারও উন্মুক্ত হয়। শুধু ব্যবসা বা বিনিয়োগেই নয়—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংক, কৃষি ও জনকল্যাণে তাঁর অবদান ছিল অনন্য।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় পাকিস্তান সরকারের হাতে আটক নেতা-কর্মীদের মোকদ্দমা ও আহতদের চিকিৎসার ব্যয় ব্যক্তিগতভাবে বহন করেছিলেন তিনি। এমনকি ঐতিহাসিক আগরতলা মামলার খরচও দেন নিজের তহবিল থেকে। এভাবেই দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে নীরবে-নিভৃতে অবদান রাখেন এক নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিক হিসেবে।
বাজিতপুর জেলা করার আজীবনের স্বপ্ন:- শত শত বছরের লালিত স্বপ্ন ছিল এই জনপদের মানুষের—বাজিতপুর একদিন জেলা হবে।
এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বাজিতপুরের কৃতিসন্তান কর্মবীর শিল্পপতি আলহাজ্ব জহুরুল ইসলাম।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর, জহুরুল ইসলাম তাঁর নিকট বাজিতপুর জেলা করার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। জিয়াউর রহমান তখন কিশোরগঞ্জের তৎকালীন জেলা প্রশাসক রাফিউল করিমকে বাজিতপুর জেলা করার বিষয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন।
ডিসি রাফিউল করিম তাঁর প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন—ছয়টি উপজেলা নিয়ে বাজিতপুর জেলা সদর হওয়ার জন্য সম্পূর্ণ উপযুক্ত স্থান। কিন্তু এর কিছুদিন পরই জিয়াউর রহমান নিহত হন, ফলে জেলা ঘোষণার প্রক্রিয়া থেমে যায়।
পরবর্তীতে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। তখনও আলহাজ্ব জহুরুল ইসলাম বাজিতপুর জেলা বাস্তবায়নের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যান। কিন্তু তথাকথিত কিছু স্থানীয় বুদ্ধিজীবী ও কিশোরগঞ্জ সদরের প্রভাবশালী মহলের বিরোধিতার কারণে আবারও সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি।
বাজিতপুর জেলা বাস্তবায়ন কমিটির এক সভায় জহুরুল ইসলাম দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা দেন—“সরকার যদি বাজিতপুরকে জেলা ঘোষণা করে, তবে আমি নিজস্ব অর্থায়নে আধুনিক নির্মাণপ্রযুক্তি ও স্থাপত্যশৈলীর আলোকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, জজকোর্ট ভবন, অন্যান্য সরকারি দপ্তরের ভবন ও কর্মকর্তাদের আবাসন নির্মাণ করে দেব।”
কিন্তু জীবদ্দশায় সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়নি। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি বাজিতপুর জেলা হওয়ার স্বপ্ন বুকে লালন করেছেন।
শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন অপূর্ণ রেখেই কর্মবীর আলহাজ্ব জহুরুল ইসলাম পরপারে পাড়ি জমান, রেখে যান এক অনন্ত অনুপ্রেরণা—“বাজিতপুর জেলা হবেই।”
