এ টি এম মোস্তফা কামাল
সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের পর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দ্বিতীয়বার শপথ গ্রহণের আবশ্যকতা আছে কিনা এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিএনপি’র সংসদ সদস্যরা বিদ্যমান সংবিধানের আলোকে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। জামাত এবং এনসিপি’র সংসদ সদস্যরা -সংসদ সদস্য হিসেবে একবার শপথ গ্রহণের পর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দ্বিতীয়বার শপথ গ্রহণ করেছেনে। শপথের এই ইস্যু নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ জনগণের মাঝে ও এনিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।
১। সংবিধান অনুযায়ী এক জন সংসদ সদস্যের দ্বিতীয়বার শপথ গ্রহণের সুযোগ নেই: সংবিধানের ৭১(১) অণুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে কোন ব্যাক্তি একই সময়ে দুই বা ততোধিক নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য হইবেন না। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এর ১১ নং অণুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে- [পরিষদের কোন কার্যধারার বৈধতা এবং পরিষদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তি জাতীয় সংসদ ও সংসদ সদস্যদের অনুরূপ হইবে]। তার মানে হচ্ছে পরিষদ সদস্যদের স্ট্যাটাস হচ্ছে সংসদ সদস্যদের অনুরূপ। জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য আর পরিষদের সদস্য দুটো ভিন্ন ENTITY বিধায় দুটো নির্বাচনী এলাকা অথবা দুটো সমমর্যদার স্বত্বা হিসেবে গণ্য। কাজেই এক জন সাংসদের পক্ষে সংসদ সদস্য হিসেবে একবার আর পরিষদ সদস্য হিসেবে দ্বিতীয়বার শপথ গ্রহণের কোন সুযোগ নেই।
তবে সংসদ সদস্যরা প্রথমে পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করে ৬ মাসের কার্যকাল শেষ করে পরিষদ সদস্যের পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করতে পারতেন- কিন্তু জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫- এর মধ্যে সেরূপ ব্যবস্থা রাখা হয়নি- THAT’S A GREAT MISTAKE I THINK. .
২। শপথ গ্রহণের পূর্বে সংসদ সদস্যদেরকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য ঘোষণা করে গেজেট নোটিফিকেশন জারীর আবশ্যকতা রয়েছে: নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করে গেজেট নোটিফিকেশন জারীর পর গেজেট নোটিফিকেশন অনুযায়ী এক জন সংসদ সদস্য শপথ গ্রহণ করে থাকেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের পূর্বে সংসদ সদস্যদেরকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য ঘোষণা করে গেজেট
নোটিফিকেশন জারীর আবশ্যকতা ছিল। গেজেট নোটিফিকেশন যদি জারী না করা হয়ে থাকে তাহলে তাঁরা কিসের বলে/ কোন সুত্রে পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করলেন? কেউ যদি দাবী করেন জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী তাঁরা শপথ গ্রহণ করেছেন, তাহলে বলতে হচ্ছে সেটা ও সঠিক যুক্তি নহে। কারণ এক জন সংসদ সদস্য যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের ও সদস্য সেরূপ দালিলিক প্রমাণ একজন সংসদ সদস্যের কাছে থাকার আবশ্যকতা রয়েছে।
৩। সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের কারণে তাঁদের সংসদ সদস্য পদ বহাল আছে কিনা সে বিষয়ে আইনী ব্যাখ্যার আবশ্যকতা রয়েছে: এক জন সংসদ সদস্য যদি একই পদমর্যাদার দ্বিতীয় পদ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য পদ হোল্ড করতে না পারেন তাহলে দ্বিতীয় পদে শপথ গ্রহণের সাথে সাথে তাঁর ১ম পদ থেকে তিনি ইস্তফা দিয়েছেন বলে যদি উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আইনী ব্যখ্যা প্রদান করা হয় তাহলে কিরূপ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে-তা ভেবে অবাক না হয়ে পারছি না। এক জন সংসদ সদস্যের পক্ষে যদি ২টি সমমর্যাদার পদ এক সংগে ধরে রাখা সম্ভব না হলে একটা ছেড়ে দিয়ে অন্যটা গ্রহণ করতে হবে –
এটাইতো স্বাভাবিক।
৪। সংবিধান সংস্কার পরিষদের কার্যকাল নির্ধারণ করে গেজেট নোটিফিকেশন জারীর আবশ্যকতা রয়েছে: জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এর ৭(গ) অণুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে- [পরিষদ উহার প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ হইতে ১৮০ (একশত আশি) কার্য দিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করিবে এবং তাহা সম্পন্ন করিবার পর পরিষদের কার্যক্রম সমাপ্ত হইবে]।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে এক জন সংসদ সদস্যের কার্যকাল যদি হয় ৬ মাস তাহলে কোন ৬ মাস সেটা নির্ধারণ করে তাঁকে জানাতে হবে। ৬ মাসের শুরু কবে এবং শেষ কবে সেটাও তাতে উল্লেখ থাকতে হবে। সেই ৬ মাস তিনি কি সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন? তিনি কি মন্ত্রী পরিষদের সদস্য হতে পারবেন? এ বিষয় গুলো জানিয়ে তাঁকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেবার আবশ্যকতা রয়েছে। তাছাড়া সংবিধান সংস্কার পরিষদকে যদি একটা পৃথক সত্ত্বা (ENTITY) হিসেবে বিবেচনা করে ৬ মাসের কার্যকাল নির্ধারণ করা হয়ে থাকে তাহলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের নির্বাচিত হবার আবশ্যকতা রয়েছে। সেটা না করার কারণে একজন সংসদ সদস্য যদি পৃথকভাবে ৬ মাসের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যান তাহলে সংসদ সদস্য হিসেবে তার কার্যকাল ৬ মাস কমে গিয়ে হবে সাড়ে ৪ বছর হবে যা সংবিধানের সংগে সাংঘর্ষিক।
অধিকন্তু, সংবিধান সংস্কার পরিষদ তো তার ৬ মাস কার্যকালে সরকার গঠন ও সরকারের স্বাভাবিক কাজকর্ম পরিচালনা করতে পারবেন না- তাহলে সরকার গঠিত হবে কি করে সে বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ এ কোন কিছু উল্লেখ করা হয়নি। এরূপ প্রেক্ষাপটে সংবিধান সংস্কার পরিষদ এর কার্যকালীন সময়ে সরকার কিভাবে গঠিত হবে এবং পরিচালিত হবে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকার আবশ্যকতা অনস্বীঃকার্য।
৫। সংবিধান সংস্কার পরিষদ কর্তৃক সংবিধান সংশোধন প্রস্তাব অনুমোদন করা সম্ভব নহে: জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এর ১০(৩) অণুচ্ছেদে বলা হয়েছে- [সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত কোনো প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পরিষদের মোট সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ট ভোটে সিদ্ধান্ত গৃহীত হইবে]। তার মানে সংবিধান সংস্কার প্রস্তাব পরিষদেই অনুমোদিত হইবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে অনির্বাচিত একটা পরিষদ কি করে সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত সকল প্রস্তাব অনুমোদন করবে? পরিষদের সদস্যরা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হলে
ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য পদে তাঁরা নির্বাচিত নহেন। সংসদ সদস্যরা কেবল সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের জন্যই নির্বাচিত হয়েছেন কিন্তু সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁরা জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হননি। তাছাড়া, দুটো পদ এক সংগে হোল্ড করে দুটো পদের দায়িত্ব একই সংগে পালন করা ও সম্ভব নহে। সুতরাং, পরিষদের সদস্য হিসেবে সংবিধান সংশোধন প্রস্তাব অনুমোদন করতে চাইলে তাঁদেরকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য পদে জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হবার আবশ্যকতা রয়েছে। বিদ্যমান সংবিধান বহাল থাকা অবস্থায় সংবিধান সংস্কার পরিষদের নির্বাচন পৃথকভাবে অনুষ্ঠান করা ও সম্ভব নহে- কারণ সংবিধানে সেরূপ কোন বিধান নেই।
৬। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কোন আবশ্যকতা আছে কি?: সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা জুলাই জতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ এ প্রদান করা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের ইচ্ছায় সংবিধান সংস্কার কমিশন সংবিধান পূনর্লিখনের পথেই হেঁটেছিলেন বলে ধারণা করা যায়। নতুন সংবিধান পাশের প্রয়োজনীয়তা থেকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ সৃষ্টির ধারণা জন্ম নিয়েছে। বিতর্ক এড়ানোর কৌশল হিসেবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ/CONSTITUENT ASSEMBLY গঠনের জন্যে নির্বাচনের পথে অন্তর্বতী সরকার এগোয়নি। সংবিধান বহাল থাকাবস্থায় সংবিধান সংস্কারের জন্যে জাতীয় সংসদের পরিবর্তে পৃথক একটা পরিষদ গঠন করার কোন আইনী সুযোগ ও নেই। সংবিধান সংশোধন কিংবা সংবিধানের ব্যাপক সংস্কার কিংবা সংবিধান পূনর্লিখনের কোন দাবী জুলাই আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে ৫ আগস্টের পূর্বে উপস্থাপিত হয়নি। এটা উপদেষ্টা পরিষদের RESET PROGRAMMING এর সংগে সম্পর্কিত হতে পারে বলে ধারণা করা যায়।
উল্লেখ্য, ঐক্যমত্য কমিশন কর্তৃক প্রস্তুতকৃত জাতীয় সনদে ৮৪টা সুপারিশ রয়েছে- তন্মধ্যে ৪৮টা সুপারিশই সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত। এই ৪৮টা সুপারিশ পুরোপুরি গ্রহণ করা হলে ৭২ সংবিধানের কোন অস্তিত্বই থাকে না।
ঐক্যমত্য কমিশন অন্তর্র্বতী সরকার কর্তৃক গঠিত একটা কমিটি। তাঁরা তাঁদের মতো করে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব করেছেন। তাঁরা তাঁদের প্রস্তাবিত সুপারিশের উপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কতিপয় নেতা/ প্রতিনিধির মতামত ও গ্রহণ করেছেন। তাঁরা সেখানে তাঁদের ইচ্ছা/ অনিচ্ছায় দায়সারা গোছের মতামত প্রদান করেছেন। তাঁরা এটা ভালো করেই জানতেন ঐক্যমত্য কমিশন প্রস্তাবিত সুপারিশ জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হলে জাতীয় সংসদে যে গুলো গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে সেগুলো গৃহীত হবে অন্যগুলো প্রত্যাখাত হবে। তাছাড়া জাতীয় সংসদে যারা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন তাঁরা সবাইতো ঐক্যমত্য কমিশনের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন না।
উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদ হচ্ছে আইন প্রণয়ন এবং সংবিধান সংশোধনের একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী সংস্থা। ঐক্যমত্য কমিশনের সুপারিশ গ্রহণ কিংবা প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা জাতীয় সংসদের রয়েছে।
৭। জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধানে অন্তর্ভুক্তকরণ: জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এর ১২ নং অণুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে-[জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অংগীকারনামা অনুসারে সংবিধানে জুলাই জাতীয় সনদ অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে]। সংবিধান সংস্কার পরিষদ কিংবা জাতীয় সংসদের উপর এরূপ সিদ্ধান্ত ছাপিয়ে দেবার ক্ষমতা অন্তবর্তী সরকারের আছে কি? সংবিধান সংস্কার পরিষদ কি অন্তবর্তী সরকারের আজ্ঞা বাস্তবায়নে বাধ্য কোন সংস্থা? অংগীকারনামা অনুযায়ী যদি জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাহলে পরিষদের অধিবেশন ডাকার কোন আবশ্যকতা আছে কি?উল্লেখ্য, জাতীয় সনদে তো সংবিধান সংস্কারের ৪৮টা সুপারিশ ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে ৩৬টা সুপারিশ রয়েছে। ঐ ৩৬টা সুপারিশকে ও যদি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাহলে সেটা একটা জগাখিচুড়ি সংবিধানে রূপান্তরিত হবে।
৮। গণভোটের বিধান প্রনয়ণকল্পে প্রণীত অধ্যাদেশ আর গণভোট অধ্যাদেশ এক জিনিস নহে: অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত কতিপয় প্রস্তবের বিষয়ে জনগণের সন্মতি রহিয়াছে কিনা তাহা যাচাইয়ের জন্য গণভোটের বিধান প্রণয়ণকল্পে প্রণীত অধ্যাদেশ- অধ্যাদেশ নং – ৬৭, ২০২৫ জারী করা হয়েছে। উহার সংক্ষিপ্ত শিরোনামে ১ (১) – এ উল্লেখ করা হয়েছে- এই অধ্যাদেশ গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ নামে অভিহিত হইবে। উল্লেখ্য- গণভোটের বিধান প্রনয়ণকল্পে প্রণীত অধ্যাদেশ আর গণভোট অধ্যাদেশ দুটোর মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। বিধান প্রণয়ন আর গণভোট অনুষ্ঠান এক জিনিস নহে।
৯। জুলাই জাতীয় সনদ আর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) দুটো এক জিনিস নহে: গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ এর ২ নং ক্রমিকে রয়েছে সংজ্ঞা। সংজ্ঞার ২(গ) তে উল্লেখ করা হয়েছে “জুলাই জাতীয় সনদ” অর্থ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গঠিত জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের উদ্যোগে রাজনৈতিক দল ও জোট সমূহ এবং উক্ত কমিশন কর্তৃক স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫; তার মানে হচ্ছে জুলাই সনদের পুরো ৮৪টি সুপারিশ। কিন্তু জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এর শিরোনাম হচ্ছে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫- এতে বুঝানো হচ্ছে সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ৪৮টি সুপারিশ- দুটোর মধ্যে বিশাল পার্থক্য বিদ্যমান।
১০। দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট আইন সভার আবশ্যকতা আছে কি?: আমার মতে বাংলাদেশে এখনো দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইন সভার আবশ্যকতা নেই। এক কক্ষ বিশিষ্ট আইন-সভাকেই যেখানে সঠিকভাবে কার্যকর করা সম্ভবপর হয়নি সেখানে দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট আইন সভা করে রাষ্ট্রের কি লাভ হবে? দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইন সভা করা হলে পার্লামেন্টের ব্যয় অনেক গুণ বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে PROPORTIONATE SYSTEM OF REPRESENTATION চালু করার মতো সামাজিক অবস্থানে পৌঁছুতে আমাদের আরো অনেক বছর সময় লাগবে- দেশে ন্যায়-ভিত্তিক সুশাসন কায়েম এবং মাথাপিছু আয় ২০ হাজার ডলারের উপরে উঠতে হবে। যতোদিন পর্যন্ত দেশে নমিনেশন বাণিজ্য চলতে থাকবে ততোদিন পর্যন্ত এদেশে PROPORTIONATE SYSTEM OF REPRESENTATION
চালু করার কোন অবকাশ থাকবে না। তাস্বত্বেও যদি PROPORTIONATE SYSTEM OF REPRESENTATION অনুসরণ করে দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট আইন সভা চালু করা হয় তাহলে দেশে আওয়ামী লীগ সূচিত স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা শক্তিশালী ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত হবে।
১১। জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ প্রণয়নের মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪কে অস্বীকার করা হয়েছে:
জুলাই গণঅভ্যুত্থান অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই -আগস্ট মাসে। তাই জাতীয় সনদকে “জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৪ “শিরোনাম দিয়ে জুলাই সনদ ঘোষণা করার আবশ্যকতা ছিল। সনদের পটভ‚মিতে ২০১৮ সালের কোটা বিরোধী আন্দোলনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে কিন্তু ২০২৪ সালের কোটা বিরোধী আন্দোলনের কথা সেখানে উল্লেখ করা হয়নি (১ম অনুচ্ছেদ পৃষ্ঠা-২)। জুলাই আন্দোলন ছিল অপশাসন এবং বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন। অপশাসন দুর করে সুশাসন কায়েম করার কোন পদক্ষেপ অন্তর্র্বর্তী সরকার কর্তৃক গৃহীত হয়নি। বৈষম্য চিহ্নিত করে উহা দুর করার উপায় উদ্ভাবন করে সুপারিশ প্রদানের জন্যে কোন কমিশন ও গঠন করা হয়নি এবং জাতীয় সনদে বৈষম্যের বিষয়ে কোন কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। এরূপ ত্রæটিযুক্ত সনদকে জাতীয় সনদ হিসেবে স্বীকার করে নিয়ে বিএনপি- জামাত- এনসিপি নেতৃবৃন্দ কিভাবে স্বাক্ষর দান করতে পারলেন সেটা আমি বুঝে উঠতে পারছিনা।
ঐক্যমত্য কমিশন কি জুলাই আন্দোলন বিরোধী দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্রকারী শক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এরূপ কাজ করেছে সেটাও বুঝে উঠতে পারছি না।
তাছাড়া, অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে মবকালচার ব্যাপকতা লাভ করেছিল। সিলেটের কোম্পানিগঞ্জের শ্বেত পাথর দীর্ঘদিন ধরে লুট করে নিঃশেষ হবার পর বিষয়টা বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নজরে আসে। কোন রূপ আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবান না করে আলোচনার মাধ্যমে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালকে ডিপি ওয়ার্ল্ড এর হাতে তুলে দেবার জন্যে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রচেষ্টার অন্ত ছিল না। দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে আমেরিকার সঙ্গে NON- DISCLOSURE AGREEMENT করেছে বলে ও জানা যায়। চাঁদাবাজি ও দূর্নীতি আওয়ামী শাসনামলের মতোই অব্যাহত ছিল বলে জনশ্রæতি রয়েছে।
১২: গণভোটের বিধান প্রণয়নকল্পে প্রণীত অধ্যাদেশ: অধ্যাদেশ নং ৬৭, ২০২৫ সংবিধানের সংগে সাংঘর্ষিক হবার প্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদে উহা রেটিফাই করা না হলে কিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে? উক্ত গণভোট অধ্যাদেশ সংসদে রেটিফাই করা না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উহা বাতিল হয়ে যাবে- তখন গণভোটের রায়ের কার্যকারিতা ও থাকবে না- সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব ও রহিবে না। সংবিধান সংস্কারের সুপারিশ সমূহ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ ও রহিত হয়ে যাবে।
১৩: সংবিধান সংস্কার প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপনের কোন সুযোগ নেই: জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এর ১০(৩) অণুচ্ছেদে বলা হয়েছে – সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত কোনো প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পরিষদের মোট সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ট ভোটে সিদ্ধান্ত গৃহীত হইবে। তার মানে সংবিধান সংস্কার প্রস্তাব পরিষদেই অনুমোদিত হবে। আর উক্ত আদেশের ১২ নং অণুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে- জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অংগীকারনামা অনুসারে সংবিধানে জুলাই জাতীয় সনদ অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে। উক্ত আদেশের বিধান অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাব সমূহ জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের কোন সুযোগ রাখা হয়নি।
১৪। অন্তর্র্বতী সরকারের পক্ষে অনেক কাজ করা সম্ভব ছিল: অন্তর্র্বতী সরকার ৯ মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় অলস কাটিয়েছে। ১০০ বিঘা/ ৬০ বিঘা সীলিং বাস্তবায়ন কাজ শুরু করে দিতে পারতো। ১৯৭২ সালের ১০০ বিঘা এবং ১৯৮৪ সালের ৬০ বিঘা সীলিং ভ‚মি মন্ত্রণালয় কর্তৃক মাঠ পর্যায়ে এখনো বাস্তবায়ন না করায় সামাজিক বৈষম্য ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চাঁদাবাজি বন্ধে দন্ড বিধি সংশোধন সহ অনেক কিছু করণীয় ছিল। এক জন
দূর্নীতিবাজ-অপশাসককে ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ থেকে বিতাড়িত করে অন্তর্র্বতী সরকার প্রতিষ্ঠার কারণে সুশাসন কায়েমে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অন্তর্র্বতী সরকারের জন্য জরুরী হয়ে পড়েছিল- কিন্তু অন্তর্র্বতী সরকার সেপথে পা বাড়ায়নি। ঐক্যমত্য কমিশন কর্তৃক প্রস্তুতকৃত যে সকল সুপারিশ অন্তর্র্বতী সরকারের নিজের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নহে সেসকল সুপারিশ পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে দিয়ে বাস্তবায়ন করাতে বাধ্য করার যে কোন প্রচেষ্টা সুবিবেচনা প্রসূত নহে বলে গণ্য।
১৫: তড়িঘড়ি করে প্রণয়ন করা অধ্যাদেশ সমূহ সংসদে উপস্থাপনের পূর্বে নিবিড়ভাবে পরীক্ষা: নিরীক্ষা করা অত্যাবশ্যক: অন্তর্র্বতী সরকারের অন্তিম সময়ে তড়িঘড়ি করে বেশ কিছু অধ্যাদেশ জারী করা হয়েছে। তন্মধ্যে বেশ কিছু অপ্রয়োজনীয় অধ্যাদেশ ও রয়েছে। ফৌজদারী কার্যবিধি সংশোধন সংক্রান্ত অধ্যাদেশটি রেটিফাই করার আবশ্যকতা নেই কারণ গায়েবী মামলা মৌখিক নির্দেশে শুরু হয়েছিল আর মৌখিক নির্দেশে সেটা বন্ধ করতে হবে। IMF এর পরামর্শে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে দ্বিখন্ডিত করে দুইটা বিভাগ সৃষ্টি করে জারী করা অধ্যাদেশ দুটি কার্যকর করা হলে প্রশাসনিক বিশৃংখলা সৃষ্টি হতে পারে- রাজস্ব আদায় কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ভেংগে দ্বিখন্ডিত করা সমীচীন হবে না। কাজেই অধ্যাদেশ দুটো রেটিফাই না করাই শ্রেয়ঃ।
১৬: পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে: HILL TRACTS REGULATION ১৯০০ অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসিত হবে – এই বাক্যটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যাবশ্যক। পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য প্রযোজ্য পৃথক ভূমি/প্রজাস্বত্ব আইন এবং ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল প্রণয়নের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয় কর্তৃক অতি জরুরী ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক।
১৭। জুলাই জাতীয় সনদের সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণের জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন: জুলাই জাতীয় সনদ সংস্কার পরিষদ কর্তৃক অনুমোদনের পূর্বে- সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার পূর্বে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ কমিটি দ্বারা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে অর্থাৎ রিভিউ করে তাঁদের মতামতসহ প্রতিবেদন দেবার আবশ্যকতা রয়েছে- ঐক্যমত্য কমিশন নিজেদের ভুল নিজেরা চিহ্নিত করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে- সুতরাং বর্তমান সরকার কর্তৃক একটা বিশেষজ্ঞ কমিটি করে দেয়ার আবশ্যকতা রয়েছে।
১৮। জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৪ পূনঃপ্রণয়ন অত্যাবশ্যক: ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষিতে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৪ হবে রাষ্ট্রের জন্য একটা অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ দলিল-একটা মাইলফলক। তাই উক্ত সনদের ত্রুটিবচ্যুতি দুর করে জুলাই আন্দোলনের চেতনার সংগে মিল রেখে বৈষম্যমুক্ত রষ্ট্র বিনির্মাণের লক্ষ্যকে সামনে রেখে নতুন করে জুলাই জাতীয় সনদ, ২০২৪ প্রণয়ন করার আবশ্যকতা রয়েছে।
বর্তমান সময়ের অতি জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উচিৎ হবে জুলাই আন্দোলনের শহীদদের রক্তের প্রতি সন্মান জানিয়ে গনভ্যুত্থানের চেতনার কথা মাথায় রেখে সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক বৈষম্যযুক্ত বিষয়গুলোকে চিহ্নিত করে সেগুলো দূরীভ‚ত করে ন্যায় ভিত্তিক চাদাবাজমুক্ত-দূর্নীতিমুক্ত-বৈষম্যমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে কঠোর নীতি অবলম্বন করা- বৈষম্য দুর করে অর্থনৈতিক সংস্কার সাধন করা-বৈদেশিক ঋণের কর্জের টাকায় অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে অর্থায়ন শতভাগ নিষিদ্ধ করা- কর্মকর্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প নিষিদ্ধ করা- যে সকল রাষ্ট্রীয় সংস্থার নিজস্ব রাজস্ব আয় রয়েছে তাঁদের নিজস্ব উন্নয়ন প্রকল্প তাঁদের নিজস্ব রাজস্ব আয় দিয়েই বাস্তবায়ন করতে হবে মর্মে আদেশ জারী করা- সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের প্রিমিয়ামের ৫০% অবৈধভাবে বেসরকারী নন-লাইফ বীমা কোম্পানী সমূহের মাঝে সমহারে বন্টন করে দেবার রীতি নিষিদ্ধ করে বীমা কর্পোরেশন আইন সংশোধন করা। পরিবার পিছু ১০০বিঘা-৬০ বিঘা সীলিং মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করার কাজ জরুরী ভিত্তিতে শুরু করে দেয়া। একাজ গুলো করার মাধ্যমে তারেক রহমান এর পক্ষে সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউয়ান এর ভ‚মিকায় অবতীর্ণ হওয়া সম্ভব। তাহলে রাষ্ট্র অতি দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব।
