আমার কাগজ ডেস্ক
যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ইরান বলেছে, নিজেদের ঠিক করা শর্ত পূরণ হলেই ‘যুদ্ধের ইতি’ টানবে।
মার্কিন প্রস্তাব সম্বন্ধে অবগত এক ঊর্ধ্বতন ইরানি কর্মকর্তা শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির রাষ্ট্র-মালিকানাধীন প্রেস টিভির সঙ্গে কথোপকথনে এ কথা বলেছেন। তিনি ওয়াশিংটনের প্রস্তাবকে ‘মাত্রাতিরিক্ত’ আখ্যা দিয়েছেন।
“ইরান তখনই যুদ্ধের ইতি টানবে যখন তারা চাইবে এবং যখন তাদের শর্তগুলো পূরণ হবে,” ওই ইরানি কর্মকর্তা এমনটাই বলেছেন বলে জানিয়েছে আল জাজিরা, এনডিটিভি।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলা মোকাবেলা এবং তেহরানের নিজেদের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত মার্কিনিদের ‘ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি’ অব্যাহত রাখতে চায় ইরান, ভাষ্য ঊর্ধ্বতন ওই কর্মকর্তার।
গত এক বছরে দুইবার যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার নামে ইরানের সঙ্গে প্রতারণা করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, উভয় ক্ষেত্রেই অর্থপূর্ণ কোনো সংলাপে জড়ানোর কোনো ধরনের আগ্রহ ওয়াশিংটনের ছিল না।
দুইবারই আলোচনা চলাকালে ইরানের ওপর হামলা হয়; সেসব উদাহরণ টেনে সাম্প্রতিক প্রস্তাবের ব্যাপারে তেহরান নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।
এদিকে বুধবার ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেন, তারা উপসাগরে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া একটি প্রস্তাব খতিয়ে দেখছে, তবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এরই মধ্যে ছড়িয়ে পড়া সংঘাতটি বন্ধে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় বসার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই।
তার এ মন্তব্যে মনে হচ্ছে, ইরানের দেওয়া শর্ত মেনে নিলে আলোচনার টেবিলে বসতে তেহরানের দিক থেকে খানিকটা আগ্রহ এখনও অবশিষ্ট আছে, বলছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ইরান মার্কিন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে এ খবর চাউর হওয়ার পর হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট তেহরানকে হুঁশিয়ার করে বলেছেন, তারা যদি ‘পরাজয়’ না মেনে নেয় তাহলে ‘আরও কঠোর’ হামলা হবে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, মার্কিন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি ইরান যুদ্ধ বন্ধে তাদের পাল্টা ৫ শর্তও হাজির করেছে।
এগুলো হল- যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘আগ্রাসন ও হত্যাযজ্ঞ’ পুরোপুরি বন্ধ হওয়া, ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে যেন কোনো সামরিক পদক্ষেপ না হয়, তা নিশ্চিতে সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যুদ্ধে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির সুস্পষ্ট ক্ষতিপূরণের নিশ্চয়তা দেওয়া, অঞ্চলজুড়ে সব ফ্রন্ট ও সব প্রতিরোধ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌমত্বের পূর্ণাঙ্গ ও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা।
যুদ্ধ বন্ধ চাইলে এগুলোর পাশাপাশি জেনিভা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিতীয় দফার আলোচনায় তেহরান যেসব শর্ত দিয়েছে সেগুলোও মানতে হবে, বলেছে ইরান। ওই আলোচনার কয়েকদিনের মাথায়, ২৮ ফেব্রুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালায় এবং তাদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ দেশটির শীর্ষ সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের হত্যা করে বসে।
ইরানের প্রতিক্রিয়ার আগে পাকিস্তানের দুই কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ১৫ দফার প্রস্তাবে থাকা বিভিন্ন শর্ত, বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিলুপ্তি, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে তেহরানের ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা আছে বলে জানান।
ইরান সংলগ্ন এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হয়।
মধ্যস্থতার কাজে নিয়োজিত মিশরের এক কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক বার্তা সংস্থাকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে অঞ্চলজুড়ে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ইরানের সহায়তা দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার কথাও বলা আছে।
যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা জ্বালানি স্থাপনায় ইরানের হামলা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে তেহরানের দেওয়া বিধিনিষেধ বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে এবং শিগগিরই এই অবস্থার পরিবর্তন না ঘটলে বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ জ্বালানি সঙ্কট সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।
ইরানের এমন কৌশলগত পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক চাপে পড়েছে বলেই মনে হচ্ছে। পরিস্থিতি সামলাতে তারা এখন হরমুজ প্রণালি সংশ্লিষ্ট ইরানি উপকূল এবং ইরানের রপ্তানি হাব খার্ক দখলে স্থল সেনা পাঠানোর কথা ভাবছে বলে একাধিক মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
চার সপ্তাহ ধরে চলা এ যুদ্ধ এরই মধ্যে ইরানে দেড় হাজারের বেশি বেসামরিক নাগরিকের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
ইসরায়েল এখন পর্যন্ত লেবাননে দুই সেনাসহ তাদের ২০ নাগরিক নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে। এর বাইরে ১৩ মার্কিন সেনা এবং ইসরায়েলের দখলে থাকা পশ্চিম তীর ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে আরও কয়েক ডজন সামরিক-বেসামরিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
