
আমার কাগজ প্রতিবেদক
এস আলমের দখলে থাকা ৮ ব্যাংকসহ ১১ ব্যাংকের পুনর্গঠিত পর্ষদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর দৈনন্দিন কার্যক্রম থেকে শুরু করে সার্বিক সূচকের প্রতি নজর রাখা হচ্ছে। সাবেক পরিচালকদের তহবিল তছরুপের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো কী ধরনের সমস্যায় ভুগছে এবং এসব সমস্যা কীভাবে মোকাবেলা করা যায় তা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তদারকি করা হচ্ছে। এজন্য পৃথক তিনটি কমিটি কাজ শুরু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপক গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, সাবেক পরিচালকরা পানির মতো ব্যাংক থেকে টাকা বের করে নিয়েছে। নামে বেনামে টাকা বের করতে ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা তাদের সহযোগিতা করেছেন। কিন্তু ওই সব কর্মকর্তা এখনো ব্যাংকে বহালতবিয়তে রয়েছেন। শুধু তাই নয়, পুনর্গঠিত পর্ষদ কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন তা সাথে সাথে পুরনো পরিচালদের অবহিত করছেন। এর ফলে পুনর্গঠিত পর্ষদ অনেক কাজই ভালোভাবে করতে পারছেন না। আবার কিছু পর্ষদ সদস্য রয়েছে ব্যাংক পরিচালনায় একেবারেই অনভিজ্ঞ। শরিয়াহ ব্যাংকের পরিচালনার মতো তেমন কোনো ধারণাই নেই। এ কারণে ব্যাংকের গতি থেমে যাচ্ছে। সব মিলেই ব্যাংকগুলোতে একধরনের অস্থিরতা কাজ করছে।
অপর একটি ব্যাংকের একজন পরিচালক জানিয়েছেন, ব্যাংকগুলোতে তীব্র তারল্য সঙ্কট চলছে। আগের পরিচালকরা নামে বেনামে টাকা বের করে নিয়েছে। ব্যাংকটিতে এতদিন যে পরিমাণ খেলাপি ঋণ দেখানো হতো প্রকৃত খেলাপি ঋণ তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। এতদিন টাকা পরিশোধ না করেই নানা রকম কারসাজির মাধ্যমে ঋণগুলো নিয়মিত দেখানো হতো। কিন্তু ওইসব ঋণ এখন খেলাপি হয়ে পড়ছে। আর খেলাপি হলে প্রভিশন রাখতে হবে বর্ধিত হারে। কিন্তু প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকটিতে তারল্য সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ সঙ্কট মেটাতে প্রতিনিয়তই বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করা হচ্ছে। গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেয়া যাচ্ছে না। এতে গ্রাহকদের মধ্যেও আতঙ্ক বিরাজ করছে। সব মিলেই ব্যাংকটি খারাপের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আমরা প্রতিনিয়তই ব্যাংকগুলোর পর্ষদের সাথে যোগাযোগ রাখছি। তাদের কার্যক্রমগুলো পর্যবেক্ষণ করছি। তারা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যেসব সমস্যায় পড়ছে তা সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। গতকালও এক্সিম ব্যাংকের সাথে বৈঠক হয়েছে। তাদের চলমান সমস্যাগুলো তুলে ধরা হয়েছে। এসব সমস্যা কীভাবে মোকাবেলা করা যায় সে বিষয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি যেসব সাবেক পরিচালক ব্যাংক থেকে নামে বেনামে ঋণ নিয়ে ফেরত দিচ্ছেন না তাদের তালিকা করতে বলা হয়েছে। তাদের সম্পদের হিসেব নেয়া হচ্ছে। ঋণ ফেরত না দিলে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে জনগণের আমানত সমন্বয় করা হবে। তাদের সম্পদ দ্রুত শনাক্ত করারও নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, পতিত সরকারের আমলে চট্টগ্রামের বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম ৮টি ব্যাংকের মালিকানা পায় রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর এ ৮টি ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দিয়ে পুনর্গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অপর দিকে, ইউসিবিএল ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। একমাত্র এস আলমই ৮টি ব্যাংক থেকে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা নামে বেনামে ঋণ নিয়েছেন, যার বেশির ভাগ অংশই পাচার করেছেন। অপর দিকে এক্সিম ব্যাংকের দেড় দশক ধরে চেয়ারম্যানের পদ দখল করে নজরুল ইসলাম মজুমদার। অভিযোগ রয়েছে এ ব্যাংক থেকেও নামে বেনামে বিপুল অঙ্কের অর্থ বের করে নিয়েছেন তিনি। এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক টীম ব্যাংকগুলোতে পরিদর্শন করছেন। তারা দেখছেন, কী পরিমাণ অর্থ ব্যাংক থেকে বের করে নেয়া হয়েছে, ওই সব অর্থ কীভাবে পাচার করা হয়েছে তা ক্ষতিয়ে দেখা হচ্ছে।