আমার কাগজ প্রতিনিধি
প্রজাতন্ত্রের একজন সামান্য কর্মচারী হিসেবে আমার এ লেখা কতটুকু সমীচীন জানিনা। আমাদের অনেক দুঃখ বেদনা, হতাশা রয়েছে। এজন্য অনেক সময় আমার মন কাঁদে সেই সাথে নীরবে পাহাড়ও কাঁদে। আমরা ছোটকাল হতে পাহাড়ে বড় হয়েছি, পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রেক্ষাপটের সকল করুণ চিত্র অবলোকন করেছি নিজেও ভুক্তভোগী হয়েছি। পাহাড়ের দুঃখ বেদনার কথাগুলি যদি বলি তা কখনও বলে শেষ করা যাবে না। পাহাড়ের প্রেক্ষাপটের বিষয়ে নতুন করে কিছুই বলার প্রয়োজনবোধ মনে করি না কারণ পাহাড় এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠির দুঃখটা কোথায় সবকিছু সবাই অবগত রয়েছেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় লাভ করে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তাঁর নতুন সংসদ সদস্যদের নিয়ে নতুন মন্ত্রিপরিষদ গঠন করে। কিন্তু পার্বত্যবাসী একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না জনাব তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার নতুন সরকারে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাহাড়ি একজন মন্ত্রীর সঙ্গে একজন বাঙ্গালি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছেন। পূর্বে ২৮ বছর আগে মন্ত্রণালয়টি গঠনের পর এই প্রথম কোনো নির্বাচিত সরকারের আমলে এমন ঘটনা ঘটল। পাহাড়ের অনেক নীতিনির্ধারক মনে করছেন এটি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করা হচ্ছে এবং এটি পার্বত্য চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কারণ সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে। জনাব দীপেন দেওয়ান পার্বত্যাঞ্চলের চাকমা জাতিসত্তার হলেও মীর হেলাল ওই এলাকার বাসিন্দাও নন, পাহাড়িও নন। পাহাড়ের অনেকেই অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রীকে দেখে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। কোনো সরকারের আমলেই এমন ঘটনা ঘটেনি। সেজন্য পার্বত্য চুক্তির সুস্পষ্ট একটি লঙ্ঘন। এর আগে কখনো নজির নেই যে, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একসঙ্গে একাধিক মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেননি। নির্বাচিত সরকার আমলে যে একজন করে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তাঁরা পাহাড়িই ছিলেন। কিন্তু এবার এর ব্যতিক্রম ঘটনায় তা নিয়ে জনমেন উঠেছে প্রশ্ন। কিন্তু কেনই বা করা হলো।
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় যাত্রা শুরু করে ১৯৯৮ সালের ১৫ জুলাই। এর আগের বছর সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির শর্তানুসারে এই মন্ত্রণালয় গঠিত হয়। পাহাড়ে সংঘাত পেরিয়ে শান্তি ফিরিয়ে আনাই ছিল সেই চুক্তির লক্ষ্য।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে স্পষ্ট নিহিত আছে ক, খ, গ ও ঘ খণ্ডে ৭২টি ধারা রয়েছে। এর বেশির ভাগই জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ গঠনসংক্রান্ত। চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ১৯ ধারায় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠনের কথা বলা আছে। ওই ধারায় লেখা আছে, ‘উপজাতীয়দের মধ্য হইতে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হইবে।’
যদিও এর আগে এই মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তবে তাঁরা ছিলেন পাহাড়ি আদিবাসী জনগোষ্টির। সেই চুক্তিই বলে দেয় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি মধ্যে প্রায় তিন দশক আগে তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকারের সঙ্গে ওই চুক্তিপত্রে সই করেছিলেন। আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ‘অবশ্যই উপজাতীয়’ হবেন বলে চুক্তির ‘গ’ এর ২ ধারায় উল্লেখ রয়েছে। ২২ সদস্যের এই পরিষদের দুইুতৃতীয়াংশ ‘উপজাতীয়দের’ জন্য সংরক্ষিত থাকলেও ‘অউপজাতীয়’দের জন্য সাতটি সদস্য পদ (ছয়জন পুরুষ ও একজন নারী) রাখা হয়েছে।
আবার পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতার জন্য একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠনের বিষয়টি চুক্তিতে রয়েছে। ১৪ সদস্যের ওই কমিটিতে পার্বত্যাঞ্চলের বাসিন্দা তিনজন ‘অউপজাতীয়’কে রাখার কথা বলা আছে। এ কমিটিতে মন্ত্রীর সঙ্গে আরও সদস্য থাকেন আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান, তিন জেলা (খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান) পরিষদের তিন চেয়ারম্যান, পার্বত্য তিন জেলার তিন সংসদ সদস্য এবং চাকমা রাজা, বোমাং রাজা ও মং রাজা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের কথা বলেছে। কিন্তু বিএনপি একসময় এই চুক্তির বিরোধিতা করলেও ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার সময় এমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। অতীতে অনেক সরকার মুখে ঠিকই বলেন আর যখন ক্ষমতায় বসে আর মনে থাকে না। এজন্য অবশ্যই সদিচ্ছা থাকা দরকার। সত্যিকার অর্থে সদিচ্ছা থাকলে অবশ্যই শান্তিপূর্ণ ও সুমধুর সমাধান সম্ভব।
তবে আমার মত ক্ষুদ্রজ্ঞানে মতামত হলো- যদি বিএনপি চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করতে চায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই তা করা দরকার। তার আগে একজন অপাহাড়িকে দায়িত্ব দিয়ে পার্বত্য চুক্তির সাথে সাংঘর্ষিক হচ্ছে কিনা ভেবে দেখা দরকার। পার্বত্য চুক্তির ফলে জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের গঠন বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। পার্বত্য চুক্তির ফলে গঠিত এসব প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ও গঠিত হয়। এখন যেভাবে এখানে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ হলো, আগে এর নজির নেই। এতে অনেকেই যুক্তি দিতে পারে যে মন্ত্রী তো পাহাড়ি রাখা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে চুক্তিকে অগ্রাহ্য করে পাহাড়ের বাইরের প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব দিতে পারবে না কেন? আসলে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দুজনই তো মন্ত্রিসভার সদস্য। তাছাড়া প্রতিমন্ত্রী পাহাড়ের বাসিন্দাও নয়। সার্বিক বিচারে এখানে আইন নয়, রাজনীতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মিলেমিশে থাকার জন্য আস্থা অর্জন আনতে হবে ও সদিচ্ছাবোধ জাগ্রত করতে হবে। সেজন্য সদাশয় সরকার টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে পাহাড়ের সম্ভাবনাময় পূর্ণ বিকাশ ঘটাবে এমনটাই প্রত্যাশা করছে পাহাড়বাসী।
উজ্জ্বলেন্দু চাকমা: বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (বিআইডিএস) কর্মরত; প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, তুরুক্কে লতা মেমোরিয়াল বই’য়ো বাআ (পাঠাগার), রাঙ্গামাটি
