ময়মনসিংহ প্রতিনিধি
পথচলার শুরুটা ১৯৪৪ সালে। ময়মনসিংহের দুর্গাবাড়ি শহরে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসা শুরু করেন নবাব আলী। নবাব আলীর পর তার ছেলে জালাল উদ্দীন ব্যবসার হাল ধরেন। তারপর বাবা-দাদার মতোই এ ব্যবসায়ে জড়িয়ে পড়েন রেজাউল করিম। তার হাত ধরে প্রায় ৬ যুগের ব্যবধানে তিন পুরুষের বাদ্যযান্ত্রের ব্যবসা এখন রূপ নিয়েছে ‘মিউজিক মিউজিয়ামে’। যেখানে রয়েছে প্রায় ৬শ’র বেশি দুর্লভ ও বিরল বাদ্যযন্ত্র।
৬ শতাধিক পুরোনো বাদ্যযন্ত্র নিয়ে ময়মনসিংহে ব্যক্তি উদ্যোগে মিউজিক মিউজিয়াম নামে জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ময়মনসিংহ নগরের টাউন হলের মোড় এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় প্রতিষ্ঠিত এ যাদুঘরের নাম হচ্ছে এশিয়ান মিউজিক মিউজিয়াম। এর প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন বাউল শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম আসলাম।
ঢেম্পারেঙ, বরতাল, চঙ, দভন্ডি, দোতারা, চিকারা, গিনটোঙ, ঘেরা, যোগী সারঙ্গী, হালগি, মুগরবন, পোহল, থিমিলা, শিঙ্গাসহ দুর্লভ বাদ্যযন্ত্র দিয়ে সাজানো ময়মনসিংহের এশিয়ান মিউজিক মিউজিয়াম।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রেজাউলের পরিবার ৩ পুরুষ ধরে বাদ্যযন্ত্র বেচাবিক্রির সঙ্গে জড়িত। বাদ্যযন্ত্র বেচাবিক্রির পাশাপাশি রেজাউল করিম আসলাম ২০২০ সালে এই সংগীত জাদুঘরের যাত্রা শুরু করেন। জাদুঘর প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পুরোনো বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ শুরু করে আসছেন। ময়মনসিংহ নগরীর দুর্গাবাড়ি সড়কে ‘নবাব অ্যান্ড কোং’ নামে রেজাউল করিমের বাদ্যযন্ত্রের একটি দোকান আছে।
মূলত ১৯৪৪ সালে তার দাদা নবাব আলী বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসা শুরু করেন। দাদার পর তার বাবা জালাল উদ্দিন ব্যবসার হাল ধরেন। এখন এ বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসা দেখেন রেজাউল করিম। পুরোনো বাদ্যযন্ত্রের প্রতি আগ্রহ থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তিনি সংগ্রহ করেছেন এসব যন্ত্র। শুধু সংগ্রহ নয়, আগামী প্রজন্মের কাছে এসব যন্ত্র পরিচয় করিয়ে দিতে এবং শিল্পের বিকাশেও কাজ করছে রেজাউল করিমের এই সংগীত জাদুঘর।
লাউ, কুমড়োর খোল, মাটির হাঁড়ি, কলসি, চামড়া, বাঁশ, কাঠ ইত্যাদিই ছিল লোকজ বাদ্যযন্ত্র তৈরির প্রধান উপাদান। তবে অন্য সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ও কালের বিবর্তনে ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের অনেকগুলোই হারিয়ে গেছে এবং হারিয়ে যেতে বসেছে। হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য এবং আগামী প্রজন্মকে পুরোনো দিনের বাদ্যযন্ত্রের পরিচয় দিতে এশিয়ান মিউজিক মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠা করেন।
এই জাদুঘরে আছে প্রায় ৬০০ বিরল ও দেশি বাদ্যযন্ত্র। এ জাদুঘরে পুরোনো বাদ্যযন্ত্রগুলোর কোনোটি ৩৫০ বছর, কোনোটা ২৫০ বছর, আবার কোনোটা ১৫০ বছরের পুরোনো। এর মধ্যে ২০০ থেকে ৩০০ বছরের পুরোনো সারিন্দা আছে ২০টি, সরার আছে ৩০টি, মেকুঁড় আছে ৬০টি, চার ধরনের সেতার আছে ৮টি। এছাড়া এসরাজ, সারেঙ্গি, সরোদ, তানপুরা, দোতারা, একতারা, লাউয়া ও নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্র। সংগীতে ব্যবহারের বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের পাশাপাশি গ্রামোফোন ও ক্যাসেট প্লেয়ার আছে ৮০টি, ছোট-বড় রেডিও আছে ৪০টি, এলপি রেকর্ড প্লেয়ার আছে ৪০০টির মতো।
একসময় লোকজ বাদ্যযন্ত্র শিল্পীরা নিজ হাতে বানিয়ে সংগীত চর্চা করতেন। কিন্তু এসব বাদ্যযন্ত্র তৈরির কারিগর এখন নেই। আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের কারণে নেই আদিকালের বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার।
সঙ্গীতভক্ত ও জনপ্রিয় উপস্থাপক সারওয়ার জাহান সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই জাদুঘরে যে প্রাচীন বাদ্যযন্ত্রগুলো আছে, তা আমাদের নতুন প্রজন্ম দেখেনি। নতুন প্রজন্মের অনেক কিছু জানার আছে এই জাদুঘর থেকে।’
নৃত্যশিল্পী ও নারী সাংবাদিক বাবলী আকন্দ বলেন, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এশিয়ান মিউজিক জাদুঘর দেখতে এসে যন্ত্রগুলো সম্পর্কে জানতে পারবে। তিনি ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এ জাদুঘরটিতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় একান্ত দরকার।
সোয়া ইঞ্চি কোরআন থেকে শুরু করে হাড়ের তসবিহ, সবই আছে ‘৩ রুমের জাদুঘরে’সোয়া ইঞ্চি কোরআন থেকে শুরু করে হাড়ের তসবিহ, সবই আছে ‘৩ রুমের জাদুঘরে’
জাদুঘরের প্রতিষ্ঠা ও সংগ্রাহক এবং বাউল শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম সাংবাদিকদের বলেন, বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসাটি ছিল ঐতিহ্য। পারিবারিক ব্যবসার কারণে আমাদের দোকানে অনেক পুরোনো বাদ্যযন্ত্র থাকত। এগুলো দেখেই সংরক্ষণের চিন্তা আমার মাথায় আসে। তাই আমাদের সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী বিলুপ্ত বাদ্যযন্ত্রগুলো সংগ্রহ করি। মানুষের আগ্রহ দেখে সংগ্রহ দিন দিন বাড়াতে থাকি। শুধু বাদ্যযন্ত্র নয়, পাশাপাশি সংগীত বিষয়ক অন্য যন্ত্রগুলোও এ জাদুঘরে সংগ্রহ করা হয়েছে।
জেলা কালচারাল অফিসার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, এ ধরণের জাদুঘর প্রতিষ্ঠার বিষয়টি বেশ ভালো একটি উদ্যোগ। এর মাধ্যমে নতুন প্রজম্ম পুরানো বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কে ধারণা পেতে পারবে। আমাদের কাছে যদি লিখিত আবেদন করা হয়, তাহলে এই জাদুঘরটি সম্প্রসারণ কিংবা পৃষ্টপোষকতার বিষয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
