আমার কাগজ ডেস্ক
ইরান যুদ্ধের জেরে পাঁচ সপ্তাহে ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি মুদ্রা টাকা মান হারিয়েছে শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ।
এই সময়ে প্রতি ডলারের পেছনে খরচ বেড়েছে ৫৫ পয়সা। মঙ্গলবার আন্তঃব্যাংকে ডলার কেনা-বেচা হয় সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা দরে।
অথচ গত ১ মার্চেও ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা। তখন ব্যাংকগুলোতে ডলারের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় টাকা শক্তিশালী হতে শুরু করে। সে কারণে বিনিময় হার ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কিনে নেয়।
গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ সবশেষ ২ মার্চ বাজার থেকে আড়াই কোটি ডলার কিনেছে, যার কাটঅফ রেট ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা।
এ নিয়ে চলতি অর্থবছরে মোট ৫৪৯ কোটি ৩৫ লাখ ডলার বা ৫ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
পাঁচ সপ্তাহ পর এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রি করে বাজার স্থিতিশীল রাখার পরিকল্পনা করছে। যদিও ব্যাংকগুলোর কাছে দায় বাদ দিয়ে গত মার্চের তুলনায় দ্বিগুণ বিদেশি মুদ্রা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে আমদানি-রপ্তানি ব্যয়ে বাড়তি চাপ পড়ায় বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হারে টাকার অবমূল্যায়ন হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে ব্যাংক খাতে।
সেই সুযোগে কয়েকটি ব্যাংক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ডলারের দর বাড়িয়ে নিচ্ছে বলে গত সোমবার গভর্নরের কাছে অভিযোগ করেছিল ব্যবসায়ীদের শীর্ষ গঠন এফবিসিসিআই।
গভর্নরের সঙ্গে সভা শেষে এফবিসিসিআই মহাসচিব মো. আলমগীর বলেন, “ডলারের অভাব না থাকায় বিনিময় হার না বাড়ানোর জন্য বলেছি। টাকার মান যেন আর না কমানো হয়।
“গভর্নর আমাদের বলেছেন, দেশে ডলারের কোনো অভাব নেই। এক্সচেঞ্জ রেট বাড়ানোর কোনো সুযোগে নাই। কেউ যদি বাড়িয়ে দেয় তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তারপরও ডলারের দর বাড়তে শুরু করায় ব্যাংকি খাতের বিদেশি লেনদেনে তদারকিতে নেমেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
রোজার পর আমদানি দায় পরিশোধ কমে যাওয়ার পাশাপাশি গত মার্চে ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিটেন্স দেশে এসেছে।
তাতে বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে। আর গ্রস হিসাবে ৩৪ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে।
বর্তমানে রিজার্ভ ও বিনিময় হার স্থিতিশীল রয়েছে মন্তব্য করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র ও পরিচালক মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী গণমাধ্যমকে বলেন, “বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা বাজারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাজার স্থিতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ রয়েছে। টাকার অবমূল্যায়নের তাৎক্ষণিক কোনো চাপ নেই।’’
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমানে ব্যাংক খাতে ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের সম পরিমাণ বিদেশি মুদ্রার তারল্য আছে। এক মাস আগেও যা ছিল ২ দশিমিক ৩ বিলিয়ন ডলার।
বৈদেশিক দায় বাদ দিয়ে হিসাব করলে ব্যাংকগুলোর বিদেশি মুদ্রার নেট ওপেন পজিশন (এনওপি) রয়েছে ১ বিলিয়ন ডলার।
সাধারণত এনওপি ৬০-৭০ কোটি ডলার হলেই বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার কিনে নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু এখন এনওপি ১ বিলিয়ন ডলার হওয়ার পরও ব্যাংকগুলোর কাছে থেকে ডলার কিনছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, এখন বাজারে টাকার চাহিদা বেশি না থাকায় ব্যাংকগুলোও উদ্বৃত্ত ডলার বিক্রি করছে না।
শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, “বিনিময় হার অস্থিতিশীল হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনে রাখত। তাতে রিজার্ভ বেড়ে যেত। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক তো ডলার কেনেনি।”
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, প্রয়োজনে ২০ কোটি ডলার বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছে বিক্রি করে হলেও ডলারের দর স্থিতিশীল রাখবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, টাকার অবমূল্যায়নে যাবে না।
“অর্থনীতির যে কোনো ক্রাইসিস দেখা দিলে একটি গোষ্ঠী মুনাফা করার সুযোগ খোঁজে। এবার তো মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির মত সুযোগ, তারা হাতছাড়া করতে চায় না। তারাই গুজব ছড়িয়ে আতঙ্ক তৈরি করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার সকল লেনদেন পর্যালোচনা করছে, কোনো অনিয়ম পেলে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেবে।”
এনওপি বাড়ানোর তালিকায় এগিয়ে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলো। সামনের দিনে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যেতে পারে–এই ধারনা থেকে সোনালী ব্যাংকও বৈদেশিক মুদ্রার এনওপি বাড়িয়ে চলছে। ইতোমধ্যে প্রায় ২ লাখ ডলার তারা সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।
এ বিষয়ে বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক লিড ইকোনোমিস্ট জাহিদ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, “ভবিষ্যতে বিনিময় হারের গতিবিধি নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। এ কারণে ব্যাংকগুলো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ডলার ধরে রাখছে।
“যখন এমন ধারণা তৈরি হয় যে বিনিময় হার বাড়তে পারে, তখন যারা ডলার ধরে রেখেছেন তারাও তা ছাড়তে দ্বিধা করেন। ব্যাংকগুলো ভবিষ্যৎ দায় এবং বৈশ্বিক ঝুঁকি সামাল দিতে এখন ডলার বিক্রি না করে উল্টো মজুদ বাড়াতে যাবে। এটাই স্বাভাবিক, এ কারণেও হয়ত কারো মনে হতে পারে বিনিময় হারে পরিবর্তনটা আসবে।”
