আমার কাগজ ডেস্ক
ইরানের কট্টরপন্থী মহলে তেহরানের পারমাণবিক বোমা তৈরির পক্ষে দাবি ক্রমশ জোরালো, প্রকাশ্য এবং জেদি হয়ে উঠছে। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ায় ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ পুরোপুরি বদলে গেছে।
বর্তমানে দেশটির শাসনব্যবস্থায় রেভল্যুশনারি গার্ডস বা আইআরজিসি-র প্রাধান্য বৃদ্ধি পাওয়ায় পারমাণবিক অস্ত্র বিরোধী অবস্থান থেকে সরে আসার বিষয়টি এখন আলোচনার মূল কেন্দ্রে চলে এসেছে। এর আগে খামেনির একটি অলিখিত ফতোয়া এবং ‘নিউক্লিয়ার নন-প্রলিফারেশন ট্রিটি’ (এনপিটি)-র সদস্য পদের দোহাই দিয়ে ইরান সবসময় পারমাণবিক বোমা তৈরির বিষয়টি অস্বীকার করে আসলেও, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
ইরানের জ্যেষ্ঠ দুই সূত্রের মতে, যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক ডকট্রিন বা নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি, তবে শাসনব্যবস্থার ভেতরে প্রভাবশালী অনেক কণ্ঠস্বর এখন এনপিটি থেকে বেরিয়ে আসার এবং সরাসরি পারমাণবিক বোমা তৈরির দাবি তুলছেন। বিশেষ করে আমেরিকা ও ইসরায়েলের অব্যাহত বিমান হামলার মুখে ইরানি যুদ্ধকৌশলীরা মনে করছেন, পারমাণবিক অস্ত্র না থাকা বা এনপিটি-র সদস্য থাকা এখন আর তাদের জন্য লাভজনক নয়।
রেভল্যুশনারি গার্ডসের ঘনিষ্ঠ সংবাদ সংস্থা ‘তাসনিম’ সম্প্রতি একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে যেখানে বলা হয়েছে, ইরানের উচিত যত দ্রুত সম্ভব এনপিটি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেওয়া। কট্টরপন্থী রাজনীতিবিদ মোহাম্মদ জাভাদ লারিগানিও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এই চুক্তি স্থগিতের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এই চুক্তি ইরানের কোনো উপকারে আসছে কি না তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর ফলে তার দেওয়া পারমাণবিক অস্ত্র বিরোধী ফতোয়াটি এখন কতটা কার্যকর থাকবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। খামেনির সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে তার ছেলে মোজতবা খামেনির নাম শোনা গেলেও বাবার মৃত্যুর পর তাকে এখনো জনসমক্ষে দেখা যায়নি।
ইতিপূর্বে ইরানের কৌশল ছিল একটি ‘থ্রেশহোল্ড স্টেট’ বা এমন এক পর্যায়ে থাকা যেখানে প্রয়োজন হলে খুব দ্রুত বোমা তৈরি করা যাবে, কিন্তু সরাসরি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে পরিচিতি পাবে না। তবে বর্তমান যুদ্ধ যদি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তবে ইরান সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথে হাঁটতে পারে বলে আইআরজিসি কমান্ডাররা এর আগে সতর্ক করেছিলেন।
ইসরায়েল দীর্ঘ বছর ধরে দাবি করে আসছে যে ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে এবং তারা ইতিমধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রায় অস্ত্র তৈরির মানে নিয়ে গেছে।
যদিও গত কয়েক সপ্তাহে আমেরিকা ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবুও দেশটির অবশিষ্ট বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা দিয়ে কত দ্রুত বোমা তৈরি সম্ভব তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। তবে বর্তমানে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা এবং জনদাবির কথা প্রচার করা হচ্ছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তেহরান হয়তো তাদের দীর্ঘদিনের গোপনীয়তা ও সংযমের নীতি থেকে সরে আসার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে।
