• বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ০৯:৫৭ পূর্বাহ্ন

সিত্রাংয়ের তাণ্ডবে ঝরলো ৩৩ প্রাণ

আমার কাগজ ডেস্ক: / ১৩ শেয়ার
প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২২

ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের তাণ্ডবে সারা দেশে এ পর্যন্ত ৩৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বিভিন্ন জায়গায় গাছ ভেঙে পড়ে, দেয়াল ধসে এবং পানিতে ডুবে দেশের ১৪ জেলায় ৩৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।

সোমবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে এসব মৃত্যুর খবর এসেছে।

রাতের প্রথম ভাগে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের কেন্দ্র বাংলাদেশের উপকূল অতিক্রম করেছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে নোয়াখালী, ভোলা, বরিশাল ও কক্সবাজারসহ উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় ৯ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হয়েছে। উপকূলের ১৫টি জেলার নদ-নদীর পানি হঠাৎ বৃদ্ধি পেয়ে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ থেকে ৫ ফুট উচ্চতা নিয়ে দুই তীরবর্তী এলাকায় আছড়ে পড়ে।

বালু তোলার ড্রেজার ডুবে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপকূলের সন্দ্বীপ চ্যানেলে আট শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে গতকাল সোমবার রাতে উপজেলার সাহেরখালী ইউনিয়নের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরের ৩ নম্বর জেটি এলাকার পশ্চিমে এ ড্রেজারডুবির ঘটনা ঘটে। মারা যাওয়া শ্রমিকদের সবার বাড়ি পটুয়াখালী সদর উপজেলার জৈনকাঠী এলাকায়।

ভোলায় চারজনের মৃত্যু হয়েছে। ভোলার পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম বলেন, গতকাল রাতে ঘূর্ণিঝড়ের দমকা হাওয়ায় গাছের চাপায় প্রাণ যায় বিবি খাদিজা (৬৮) নামের এক নারীর। চরফ্যাশন উপজেলায় ঘূর্ণিঝড়ের সময় মোটরসাইকেলে করে দুজন যাওয়ার পথে গাছের ডাল পড়ে ঘটনাস্থলে মারা যান স্বর্ণ ব্যবসায়ী মো. মাইনুদ্দিন (৪৫)। ভোলা সদর উপজেলার চেউয়াখালী গ্রামের মফিজুল ইসলাম (৭০) ঘরচাপায় এবং লালমোহন উপজেলার ফাতেমাবাদ গ্রামের ফরিদুল ইসলামের স্ত্রী রাবেয়া বেগম (২৫) পানিতে ডুবে মারা যান।

সড়ক দুর্ঘটনায় টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলায় পুলিশের দুই কনস্টেবল ও এক আসামি নিহত হয়েছেন। মধুপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল আমীন বলেন, জামালপুর সদর উপজেলার নারায়ণপুর তদন্তকেন্দ্রের পুলিশ সদস্যরা দুই আসামির ডিএনএ পরীক্ষার জন্য একটি মাইক্রোবাসে করে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। পথে প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির মধ্যে মাইক্রোবাসটি রাত সাড়ে আটটার দিকে গোলাবাড়ী বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাককে ধাক্কা দেয়। এতে দুই পুলিশ সদস্য কনস্টেবল নুরুল ইসলাম ও মো. সোহেল এবং আসামি লালন নিহত হন।

টাঙ্গাইল শহরের সাবালিয়া পাঞ্জাপাড়া এলাকার শরীফ ফকির ঘরে বৃষ্টির পানি ঢুকে তলিয়ে যাওয়া আইপিএস সরাতে গিয়ে বিদ্যুৎপৃষ্টে মারা যান। সদর থানার ওসি মোহাম্মদ আবু ছালাম মিয়া এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, স্বজনদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ তাদের কাছে দেয়া হয়েছে।

সোমবার রাতে ঘরের ওপর গাছ পড়লে কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলা হেসাখাল গ্রামের পশ্চিমপাড়ায় এক পরিবারের তিনজন নিহত হয়েছেন। নাঙ্গলকোট থানার ওসি ফারুক হোসেন বলেন, নিহত তিনজন হলেন নিজাম উদ্দিন, তার স্ত্রী শারমিন আক্তার ও তাদের চার বছরের মেয়ে নুসরাত আক্তার।

সোমবার রাতে গাছের ডাল ভেঙে পড়ে নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলা পরিষদ চত্বরে মারা যান মর্জিনা বেগম (৪০) নামের এক নারী। তাঁর বাড়ি বাগেরহাট সদর উপজেলার অর্জনবাহার গ্রামে।

বরগুনা সদর উপজেলার সোনাখালী এলাকায় একটি ঘরের চালে গাছ পড়লে আমেনা খাতুন নামের এক নারী মারা যান। সোনাখালী এলাকার সমাজকর্মী এনামুল হক ওরফে শাহীন বলেন, ঘূর্ণিঝড়ে নিহত আমেনা খাতুনের বয়স ১০০ বছরের বেশি। ওই নারী রাত আটটার দিতে ঘরের ভেতর খাবার খাচ্ছিলেন। ঝড়ের সময় একটি গাছ তার ঘরের ওপর পড়ে। এ সময় চাপা পড়ে তিনি মারা যান।

সিরাজগঞ্জে নৌকাডুবিতে মা ও ছেলের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার রাত নয়টার দিকে জেলা সদরের সয়দা ইউনিয়নের মোহনপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানিয়েছে, নিহত দুজন হলেন মোহনপুর গ্রামের খোকন হোসেনের স্ত্রী ও শিশুসন্তান। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের নাম জানা যায়নি।

ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে গাছচাপায় গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় দুই নারীর মৃত্যু হয়েছে। টুঙ্গিপাড়া থানার ওসি মুহাম্মদ আবুল মনসুর বলেন, এই দুই নারী হলেন উপজেলার পাঁচকাহনিয়া গ্রামের রেজাউল খার স্ত্রী শারমিন বেগম (২৫) ও বাঁশবাড়ির চরপাড়া গ্রামের হান্নান তালুকদারের স্ত্রী রোমেছা বেগম (৫৮)।

নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার পূর্ব চরবাটা গ্রামে ঝড়ের সময় রান্নাঘরের ওপর গাছ উপড়ে পড়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সানজিদ আফ্রিদি নামের শিশুটির বয়স ১১ মাস। সানজিদ ওই গ্রামের বাসিন্দা আইনজীবী মো. আবদুল্লাহর ছেলে। নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক দেওয়ান মাহবুবুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

গাছের নিচে চাপা পড়ে শরীয়তপুরে সাফিয়া বেগম (৬৫) নামের এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। তিনি জেলার জাজিরা উপজেলার সিডারচর এলাকার হালান মুসল্লির স্ত্রী। জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামরুল হাসান এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, সাফিয়ার পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে গেলে মৃত্যুটা এড়ানো যেত।
কক্সবাজারের টেকনাফে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। মিয়ানমার থেকে টেকনাফ বন্দরে পণ্য নিয়ে আসা জাহাজ ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়লে ডেক থেকে পড়ে শৌমিং (৭১) নামের একজনের মৃত্যু হয়। তিনি মিয়ানমারে নাগরিক। তিনি ওই জাহাজের বাবুর্চি ছিলেন। এ ছাড়া ঝড়ের সময় নিখোঁজ এক শিশুর লাশ পরে টেকনাফ পৌরসভার একটি পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়। সোহেনা (৯) নামের শিশুটি টেকনাফ পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের জালিয়াপাড়ার বাসিন্দা জাফর আলমের মেয়ে। টেকনাফ মডেল থানার ওসি মো. হাফিজুর রহমান দুজনের মৃত্যুর খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেন।

পটুয়াখালী সদর উপজেলার প্রতাপপুর খেয়াঘাট এলাকায় লোহালিয়া নদীতে ইটবোঝাই ট্রলার ডুবে নিখোঁজ হন ট্রলারের শ্রমিক নুরুল ইসলাম (৪৫)। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পটুয়াখালী নদী ফায়ার স্টেশনের ডুবুরিরা তার লাশ উদ্ধার করেন। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় ট্রলারটি নোঙর করতে গেলে সেটি ডুবে যায়। ফায়ার স্টেশনের লিডার মজিবুর রহমান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার ইকুরিয়া গ্রামে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের সময় ঘরচাপায় আনিসুর রহমান (৯) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। কাপাসিয়ার ইউএনও এ কে এম গোলাম মোর্শেদ খান বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের সময় মাটির ঘর ধসে গিয়ে পাশের টিনের ঘরকে চাপা দেয়। এতে ওই ঘরে থাকা শিশু আনিসুরের মৃত্যু হয়।

মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলায় ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের তাণ্ডবের সময় বসত ঘরে গাছ ভেঙে পড়লে মা ও মেয়ের মৃত্যু হয়। লৌহজং থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল তায়েবীর বলেন, নিহত দুজন হলেন উপজেলার কনকসার এলাকার আব্দুর রাজ্জাকের স্ত্রী আসমা বেগম (২৮) ও তার মেয়ে সুরাইয়া আক্তার (৩)।

উল্লেখ্য, রোববার বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, পূর্ব মধ্য বঙ্গোপসাগর এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত নিম্নচাপটি উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর ও ঘণীভূত হয়ে প্রথমে গভীর নিম্নচাপ এবং পরে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং-এ পরিণত হয়ে আজ সন্ধ্যা ৬টায় পূর্ব মধ্য বঙ্গোপসাগর এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছিল। এটি আরও ঘণীভূত হয়ে অগ্রসর হতে পারে। এর ফলে ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা ও ঝড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি এবং বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে সারাদেশে কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ