• রবিবার, ২৯ মে ২০২২, ০৫:০২ অপরাহ্ন

যুক্তরাষ্ট্রকে আমাদের এখনই দরকার: জেলেনস্কি

আমার কাগজ ডেস্ক: / ৪১ শেয়ার
প্রকাশিত : বৃহস্পতিবার, ১৭ মার্চ, ২০২২

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে তার দেশের এখনই দরকার। তিনি বলেন, রাশিয়াকে শাস্তি দিতে যুক্তরাষ্ট্রকে আরো কিছু করতে হবে। বুধবার (১৬ মার্চ) মার্কিন কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে বিশ্ব নেতা এবং বিশ্ব শান্তির নেতা বলেও উল্লেখ করেন। এদিকে ইউরোপের তিন প্রধানমন্ত্রী ইউক্রেন সফর শেষে পোল্যান্ডে ফিরেছেন। তারা ইউক্রেনকে সর্বাত্মক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। অন্যদিকে ক্রেমলিন জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সঙ্গে আলোচনা করতে প্রস্তুত রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন।

মার্কিন কংগ্রেসে যা বললেন জেলেনস্কি

এক মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো গতকাল মার্কিন কংগ্রেসে ভিডিও ভাষণ দিলেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। জেলেনস্কির ভাষণের পরে প্রেসিডেন্ট বাইডেন ইউক্রেনকে ৮০ কোটি ডলারের অতিরিক্ত সাহায্যের কথা ঘোষণা করেন। হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এর মাধ্যমে এক সপ্তাহের মধ্যে ইউক্রেনকে একশ’ কোটি ডলারের সাহায্য দেওয়ার ঘোষণা দিল যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির ভাষণের শুরুতে তাকে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান মার্কিন আইনপ্রণেতারা। এরপর প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেন, এখনই ইউক্রেনের এবং ইউক্রেনের জনগণের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেছে। তাই এখনই যুক্তরাষ্ট্রকে দরকার ইউক্রেনীয়ানদের। তিনি বলেন, এখন দেখার বিষয় যে, ইউক্রেন রুশ আগ্রাসন মুক্ত হবে কিনা এবং ইউক্রেনবাসী তাদের গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে পারবে কিনা।

প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি তার দেশের বর্তমান অবস্থা বোঝাতে পার্ল হারবার এবং নাইন ইলেভেনকে উদাহরণ হিসেবে টানেন। তিনি রুশ হামলার একটি গ্রাফিক ভিডিও দেখান মার্কিনীদের। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি মার্কিন আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে বলেন, রাশিয়াকে শাস্তি দিতে যুক্তরাষ্ট্রকে আরো কিছু করতে হবে। তিনি বর্তমান সময়কে ইউক্রেনের জন্য ‘অন্ধকার সময়’ উল্লেখ করে আবারো ইউক্রেনের আকাশে ‘নো ফ্লাই জোন’ করার দাবি জানান। তিনি জানান, রুশ হামলায় এ পর্যন্ত শতাধিক শিশুর প্রাণ গেছে। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি রুশ রাজনীতিক, রুশ জাহাজ এবং প্রতিরক্ষা সিস্টেম বন্ধ করে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানান। কৌতুক অভিনেতা থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া জেলেনস্কি একটা সমাধানের পথও বাতলে দেন। তিনি বলেন, বর্তমান যুদ্ধ থেকে রক্ষা পেতে দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের একটি ইউনিয়ন গঠিত হতে পারে যারা শক্তির মাধ্যমে এই সংঘাত দূর করতে পারে। তিনি এই ইউনিয়নের নাম দিয়েছেন ইউ২৪ যারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অস্ত্র থেকে শুরু করে মানবিকসহ যে কোনো সহায়তা দিতে সক্ষম হবে।

ইংরেজিতে দেওয়া ভাষণের শেষে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি সরাসরি প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট বাইডেন, আপনি একটি মহৎ জাতির নেতা, আমি মনে করি, আপনি সারা বিশ্বে নেতা। আর বিশ্ব নেতা হওয়া মানে বিশ্ব শান্তির নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা। তাই আমি আপনাকে আরো কিছু করার আহ্বান জানাচ্ছি।’

‘আপনারা একা নন’

রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে তীব্র সংঘাত চলছে। ইউক্রেনের একের পর এক শহরে ধ্বংসের ছবি সামনে এসেছে। তারই মধ্যে ট্রেনে করে মঙ্গলবার কিয়েভে যান পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র ও ‌স্লোভেনিয়ার প্রধানমন্ত্রীরা। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মোরাভিয়েত্স্কি সামাজিক মাধ্যমে ছবি শেয়ার করে লিখেছেন, ‘এখানে, এই যুদ্ধবিধ্বস্ত কিয়েভে, ইতিহাস তৈরি হচ্ছে। এখানেই স্বাধীনতা সংগ্রামীরা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়ছেন। আমাদের ভবিষ্যৎ একটা সরু সুতোর উপর ঝুলছে।’ মঙ্গলবার বিকেলে কারফিউ বলবৎ হওয়ার পর কিয়েভে ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রতিনিধি হিসাবে এই তিন প্রধানমন্ত্রী ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ব্রিফিং করেন তারা। তারা ইউক্রেনবাসীদের লক্ষ্য করে বলেন, আপনারা একা নন, ইউরোপ আপনাদের পাশে আছে। জেলেনস্কি তিন প্রধানমন্ত্রীকে তাদের সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানান।

সমঝোতার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে!

প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানান, রাশিয়ার সঙ্গে শান্তি আলোচনা এখন অনেক বেশি বাস্তবসম্মত জায়গায় এসেছে। তবে আলোচনা সফল হতে এখনো কিছুটা সময় লাগবে। মঙ্গলবার শেষ ফেসবুক ভিডিও ভাষণে জেলেনস্কি বলেছেন, ‘রাশিয়ার বিরুদ্ধে জয় পেতে ইউক্রেনের সব নাগরিককে কাজ করতে হবে। যে আলোচনাকারী দল রাশিয়ার সঙ্গে এখন কথা বলছেন, তাদেরও কাজ করে যেতে হবে।’ এই আলোচনা বুধবারও চলবে। আলোচনাকে এখন অনেক বেশি বাস্তবসম্মত বললেও জেলেনস্কি তার কোনো ব্যাখ্যা দেননি।

এদিকে হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান রাশিয়ার সিকিউরিটি কাউন্সিলের মহাসচিব নিকোলাই পত্রুশেভের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। ইউক্রেনে রুশ অভিযানের পর এই প্রথম দুটি দেশের উচ্চ পর্যায়ের মধ্যে কথা হলো। হোয়াইট হাউজ জানায়, সুলিভান বলেছেন, রাশিয়া যদি কূটনীতির ওপর জোর দেয় তাহলে তাদেরকে ইউক্রেনে অভিযান এখনই বন্ধ করতে হবে। অন্যদিকে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেছেন, প্রেসিডেন্ট পুতিন এবং প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির মধ্যে বৈঠকে কোনো বাধা নেই। তবে এজন্য একটি চুক্তি করার প্রস্তুতি নিতে হবে। তিনি বলেন, দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা চলছে। আশা করা হচ্ছে, একটা সমঝোতা হতে পারে। যদিও সেটা কঠিন হবে। এদিকে রাশিয়াকে কাউন্সিল অন ইউরোপের মানবাধিকার পরিষদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

শরীরে পচন আর ক্ষুধা

কিয়েভের মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, চেরনিহিভ শহরে রুটির জন্য লাইনে দাঁড়ানো ইউক্রেনের বাসিন্দাদের ওপর গুলি চালিয়েছে রুশ বাহিনী। এতে অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছে। দূতাবাসের ফেসবুক এবং টুইটারে দেওয়া পোস্টে এই কথা জানানো হয়েছে। তবে এর স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি পোস্টে।

রুশ যুদ্ধজাহাজ থেকে ইউক্রেনের উপকূলে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের অভিযোগ করেছে কিয়েভ। ইউক্রেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আন্তন গেরাশচেঙ্কো বলেছেন, মধ্যরাতে ওডেসার দক্ষিণে তুজলার কাছে ইউক্রেনের সমুদ্র উপকূলে রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও কামান নিক্ষেপ করা হয়েছে। ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী ডেনিস শিমহাল জানিয়েছেন, রাশিয়ার হামলার পর থেকে এখন পর্যন্ত ইউক্রেনের ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যুদ্ধপরবর্তী ইউক্রেন পুনর্গঠনে এ ব্যয় রাশিয়াকেই পরিশোধ করতে হবে। রাশিয়ার আরো একজন জেনারেলকে হত্যার দাবি করেছে ইউক্রেন। এ নিয়ে এ পর্যন্ত রাশিয়ার চার জেনারেলকে হত্যার দাবি করলো কিয়েভ।

ইউক্রেনের শহরগুলোতে রাশিয়ার যুদ্ধবিমান আর ট্যাংক থেকে গোলা আর বোমাবর্ষণ চলছেই। গতকাল বুধবার ভোরে কিয়েভের ১২তলা বিশিষ্ট একটি আবাসিক ভবনে গোলাবর্ষণ করে রুশ বাহিনী। রাশিয়ার যুদ্ধবিমান আর ট্যাংক থেকে অনবরত গোলা আর বোমা বর্ষণ হচ্ছে ইউক্রেনের শহরগুলোতে। মারিউপোলে বড় একটি ভবনের বেজমেন্টে আটকে আছেন শত শত মানুষ। সেখানে তীক্র খাদ্য সংকটের পাশাপাশি দরকার হয়ে পড়েছে জরুরি স্বাস্থ্য সেবা। সংক্রমণের কারণে অনেকের শরীরে পচন ধরেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় একজন শিক্ষক আনাসতাসিয়া পনমারেভা। যুদ্ধের শুরুতেই তিনি শহর ছাড়লেও শহরে থাকা অনেকের সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

শিক্ষক জানান, তারা বন্ধুরা পরিবারের সঙ্গে দিনের বেশিরভাগ সময় ভবনের বেজমেন্টেই অবস্থান করছেন। সূর্যের আলোর সংস্পর্শ পেতে কখনো কখনো ভবনের ওপরে উঠছেন কিন্তু ভবনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ বিরল। নিরাপত্তার অভাবে তারা আগেই তাদের বাড়িঘর ছেড়েছেন। শহরের পশ্চিমদিকের শহরতলীতে একটি হাসপাতালের কর্মীরা বলছেন তারা যেন রুশ সেনাদের হাতে জিম্মি হয়ে আছেন। একজন কর্মী জানিয়েছেন, আশেপাশের অন্তত চারশ’ জনকে রাশিয়ান সেনারা বাধ্য করেছে বাড়ি ছেড়ে হাসপাতালে আসতে। আঞ্চলিক গভর্নর পাবলো কিরিলেঙ্কো বলেছেন, সাম্প্রতিক গোলাবর্ষণে সব ধ্বংস হয়ে গেছে যদিও কর্মীরা হাসপাতালের বেজমেন্টেই লোকজনকে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে প্রায় দুই হাজার গাড়ি মানবিক করিডোর দিয়ে মারিউপোল ছাড়ার সুযোগ পেয়েছে। যুদ্ধের আগে চার লাখ মানুষ শহরে বাস করতো। সিটি কাউন্সিল বলছে, দু হাজারের বেশি মানুষ এরই মধ্যে মারা গেছে।

বাইডেনের সঙ্গে আলোচনায় প্রস্তুত পুতিন

রুশ সচিবালয় ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানিয়েছেন, ইউক্রেনে অভিযানের পর রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেনের মধ্যে আলাপ হয়নি। তবে প্রয়োজনে সেটি হতে পারে। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট বাইডেনসহ সিনিয়র মার্কিন কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা মানে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে সেটা নয়। এদিকে রাশিয়ার বিদেশ বিষয়ক গুপ্তচর সংস্থার প্রধান সের্গেই নারিশকিন বলেছেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই রাশিয়ার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যাবে। তিনি বলেন, রাশিয়া এখন একটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত পার করছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে বিশ্বে রাশিয়ার অবস্থান কী হবে তা কয়েকদিনের মধ্যে নির্ধারিত হয়ে যাবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ