• বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ১০:৫৭ পূর্বাহ্ন

ভাগিনার খোলা চিঠি (১১)

এ বি সিদ্দিক / ১৯৪ শেয়ার
প্রকাশিত : শনিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২২

মামা,
আপনি অপেক্ষার প্রহর গুণছেন। পাঠক সমাজ তাড়া দিচ্ছে লেখা এতো দেরী কেন? সম্পাদক সাহেব লেখার অপেক্ষায়। বারবার তাগাদা দেয়ার পরও আমার সায় পাচ্ছেনা। কিন্তু সবাই ভালোবাসে, আমিও ভালোবাসি। লেখালেখি করবোনা মনে মনে স্থির করেছিলাম। কারণ নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করার কোন কারণ খুঁজে পাইনা। সময় সব সময় অনুক‚লে থাকে না। ভাল জিনিস ভাল চোখে দেখার লোকের বড়ই অভাব।
তারপরও বলব, অপেক্ষা হল- শুদ্ধতম ভালোবাসার চিহ্ন। সবাই ভালোবাসি বলতে পারে কিন্তু সবাই অপেক্ষা করে সেই ভালোবাসা প্রমাণ করতে পারেনা। পাঠক সমাজ আমাকে ভালোবাসেন। আমার লেখার প্রতি রয়েছে আগ্রহ। তাদের এ ভালোবাসা পিথাগোরাসের উপপাদ্য দিয়ে প্রমাণ করার কোন প্রয়োজন নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া থেকে সহজেই অনুমেয়।
নোবেল বিজয়ী কবি নাজিম হিকমতের “জেলখানার চিঠি” কবিতা অথবা রবিঠাকুরের “শেষের কবিতা” উপন্যাসের অথবা কৃষ্ণপ্রেমী মীরা বাঈর মত নির্ভেজাল ভালোবাসা দিয়ে পাঠক সমাজ আমাকে অনুপ্রাণিত করছে। এতে আমি মুগ্ধ যার কারণে লেখা থেকে আলাদা হতে পারলাম না। ধন্যবাদ মামা, আন্তরিক শুভেচ্ছা পাঠক সমাজ।

মামা,
সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়। আমরা দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বুঝি না। ভাঙ্গা সিন্দুকে কেউ টাকা রাখে না। নষ্ট ঘড়ির কেউ যতœ নেয় না। ট্রেন একবার মিস করলে আফসোসের অন্ত থাকে না। চেয়ার থাকা অবস্থায় চেয়ারের মর্যাদা বুঝি না। বুঝি অবসরে গেলে। ক্ষমতা থাকতে ক্ষমতার মর্ম বুঝিনা। বুঝজ্ঞ্যান আসে ক্ষমতা হারালে। যা করবেন, ফলাফল তাই আসবে। [ As you sow, so you reap] জীবন কিন্তু ফুলশয্যা নহে। [ Life is not a bed of roses] শান্তিনগরে এখন শান্তি নেই। কাঁঠালবাগানে কাঁঠাল নেই, হাতিরপুলে হাতি নেই। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়। যখন হজ্ব করার সময়, হজ্বের চিন্তা করিনি। আর যখন হজ্ব করি, হজ্ব করার শক্তি হারিয়ে ফেলি। হজ্বের নিয়ম কানুন পালনে হিমশিম খাই। নিম গাছের নিচে জীবনের মূল্যবান সময় কাটিয়েছি, আর এখন যদি বলি জীবন এত তিতা কেন? তাহলে জীবনের স্বাদ কি বুঝব? ঐদিন দেখলাম কথা সাহিত্যিক হূমাছুন আহমেদের অনবদ্য আবিষ্কার কুদ্দুস বয়াতি, কবি জসীম উদ্দীনের “আসমানী” কবিতার আসমানীর মত একেবারে জীর্ণ শীর্ণ হয়ে নুয়ে পড়েছেন। তার সেই বিখ্যাত গানটি– “এদিন দিন না, আরো দিন আছে” মাঝেমধ্যে আমার কানে বেজে উঠে। এ কণ্ঠে এ গান আর হয়ত বাজবে না। কারন পপ তারকা ফিরোজ সাঁই “হায়রে মানুষ রঙ্গিন ফানুস, দম ফুরাইলে ঠুস”- স্টেজে গাইতে গাইতে চিরবিদায় নিলেন। তারপরও আমরা বুঝিনা। আমাদের আত্মঅহংকারের শেষ নেই, আর্তচিৎকারের জুড়ি নেই। রসিকতার কমতি নেই। আসলে কবির ভাষায় বলতে হয়,

কত মানুষ বিদায় নিচ্ছে, তোর কি কোন খবর নাই?
কাল যে ছিল, আজ সে কোথায়, হয় সে
মাটি, নয় তো ছাই।
চারিদিকে নৃত্য করে জীবন নামের মৃত্যু দানব,
তুই ছুটেছিস ঘূর্ণিবেগে, তোর কেনরে
সবর নাই?

মামা,
চীনের দুঃখ হলো হোয়াংহো নদী। আর বর্তমানে কুমিল্লার দুঃখ হলো খন্দকার মোস্তাক আহমদ ফলে অত্র এলাকাবাসীর ললাটে বদনামের কালিমা ঝিকমিক করছে।
৫০ লাখের অধিক কুমিল্লাবাসী রাগে ক্ষোভে, দুঃখ কষ্ট যাতনা আর বেদনায় তুষের আগুনে জ্বলছে। নিজেদের বড় অপরাধী মনে করছে এ জেলায় জন্মগ্রহণ করে। কারন কু নামে কোন বিভাগ হবেনা। কুমিল্লার নাম আসলে খন্দকার মোস্তাকের নাম চলে আসে। ’৭৫ এর ১৫ আগস্টের অন্যতম কুশীলব খন্দকার মোস্তাক। তাই কুমিল্লা বিভাগ হবে মেঘনা নামে। একইভাবে, ফরিদপুর বিভাগ হবে পদ্মা নামে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ৭০ এ আমাদের শ্লোগান ছিল, “তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা”। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা বাহার সাহেব অনুনয় বিনয় করে যুক্তিতর্ক দিয়ে বলার পরেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কোন সায় দেননি।

আসলে জাতীয় শোক দিবসে কোন ছেলে বা মেয়ে জন্ম নিলে বিড়ম্বনার যেমন শেষ থাকেনা তেমনি কুমিল্লাবাসীদের জন্য এক বিব্রতকর অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কুমিল্লার বন্ধুবান্ধব আত্মীয় স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা যায় যে, তারা এ ব্যাপারে অনুতপ্ত কিন্তু করার কিছু নেই। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। বঙ্গবন্ধুর খুনীদের অধিকাংশই কুমিল্লার যা সত্যিই দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক। বলতে গেলে এখানে গুণীরও অভাব নেই, খুনীরও ঘাটতি নেই। এদের যুক্তি হল শিক্ষা দীক্ষায়, জ্ঞ্যান গরিমায় কুমিল্লা কোন অংশেই পিছিয়ে নেই।
ঐতিহাসিক নিদর্শন ছাড়াও এ জেলায় রয়েছে নানা ঐতিহ্য যা বৃটিশদের কাছেও ছিল সমাদৃত। জ্ঞানীগুণী, বিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবি, কবি সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, সচিবসহ দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে আসীন ব্যক্তিবর্গের কমতি নেই। দেশ অগ্রযাত্রায় এদের ভূমিকা প্রশংসনীয়। মুক্তিযুদ্ধে আহত নিহতের সংখ্যা অগণিত। ভাষা সৈনিক শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, প্রথম মহিলা নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী, মেজর আব্দুল গনি, বেগম সুফিয়া কামাল, ডাঃ প্রাণ গোপাল দত্ত, কবি বুদ্ধদেব বসু, ডঃ আখতার হামিদ খান, শ্রমিক নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদ, সুরকার ও সংগীত পরিচালক শচীন দেব বর্মণ- আরো অনেক দেশ বরেণ্য ব্যক্তিবর্গের জন্ম কুমিল্লাতে। শিল্পপতি লতিফুর রহমান কুমিল্লার গর্বিত সন্তান। এরা যেমন দেশের আশীর্বাদ, তেমনি খন্দকার মোস্তাকেরা হল অভিশাপ। এই অবস্থায় কুমিল্লাবাসী এখন বিভাগ চায় না। চায় কুমিল্লা নামে জেলা থাকুক, নামটি যাতে মুছে না যায়। দুধের স্বাদ ঘোলেই মিটে গেল। আসলে বাংলা ভাষায় সনেট, অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ফ্রান্সের ভার্সাইনগরীতে বসে তার জন্মভূমি যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত কপোতাক্ষ নদকে ভুলতে পারেনি। তিনি লিখেছেন,
“সতত হে নদ, তুমি পড় মোর মনে,
সতত তোমারি কথা ভাবি এ বিরলে।”
সৈয়দ মুজতবা আলীর “প্রবাসবন্ধু” প্রবন্ধে কাজের ছেলে আবদুর রহমানের বিখ্যাত সেই উক্তি “ইন হাস্তা ওয়াতানামা” অর্থাৎ সেইতো আমার জন্মভূমি। আফগানিস্তানের পানশির যতই বরফে ঢাকা থাকুক কিন্তু পানশির তো তার জন্মভূমি। আসলে জননী ও জন্মভূমি ভোলার নয়। মায়া মমতায় ভরা শৈশবকালের সকল স্মৃতি আর বিস্মৃতি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কুমিল্লা নামটির সাথে যে মায়া মমতা জড়িয়ে রয়েছে, তা একমাত্র কুমিল্লায় বেড়ে ওঠা ওই লোকটি বুঝতে পারে।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগর সরকারের ৬ উপদেষ্টার মধ্যে অন্যতম একজন ছিলেন ন্যাপ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ। ২০১৫ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেও এ পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছেন সবিনয়ে। তিনি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “রাজনীতি হল দেশ সেবা, পদকের জন্য রাজনীতি করিনি। পদক দিলে বা নিলেই সম্মানিত হয় এ দৃষ্টিভঙ্গিতে আমি বিশ্বাসী নই।“ এ গুণধর মহান ব্যক্তির জন্ম কুমিল্লাতে। যেমনিভাবে সিরিয়াল কিলার (১১ জনের খুনী) রসু খাঁ-র বাড়ি চাঁদপুরের ফরিদ্গঞ্জে। তেমনিভাবে ঢাকার হাতিরঝিলের নকশাবিদ ইকবাল হাবিবের বাড়ি চাঁদপুরের মতলবে। কুমিল্লাবাসী মেঘনা নামে বিভাগ মেনে নিতে পারছেনা। এ ক্ষেত্রে ফেনী বা নোয়াখালী বিভাগ হলেও তাদের আপত্তি থাকবেনা। তবে এক ব্যক্তির অপকর্মের দায়ভার কুমিল্লাবাসী সইতে পারছেনা।

মামা,
সর্বত্রই ভাল-মন্দ, আলো-আঁধার, সুন্দর-অসুন্দর এমনকি সাধারণের মাঝে অসাধারণ জিনিসটি লুকিয়ে থাকে। পৃথিবীর সপ্তমাশ্চর্যের অন্যতম হল আগ্রার তাজমহল। মোগল সম্রাট বাদশাহ শাহজাহানের অমর কীর্তি প্রেমের অপূর্ব নিদর্শন। তাজমহলকে নিয়ে নানা উপমা, গল্প নাটক, সিনেমা আর কবিতার অন্ত নেই। বিশ্বের পর্যটকদের আগ্রহের শেষ নেই। উপস্থিতির কমতি নেই। প্রতিদিন ১২-১৫ হাজার পর্যটক তাজমহল দেখতে আসে। এ তাজমহলের অন্তরালেও কিছু নোংরা ইতিহাস রয়েছে। সম্রাট শাহজাহান প্রথম খুন করেন তার অন্ধ ভাইকে। বাবার বিরুদ্ধে তিনবার বিদ্রোহ করেন ক্ষমতার জন্য। মমতাজকে পাওয়ার জন্য তার আগের স্বামীকে খুন করেন। বিবিকে বানান সন্তান পয়দার মেশিন। একে একে ১৪ সন্তান জন্ম দিয়ে অবশেষে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন মমতাজ। তাজমহলের স্থপতি ও কারিগরদের হাত কেটে দিলেন। মমতাজ মারা যাবার পর শাজাহান তার আপন বোনকে বিয়ে করলেন। তাজমহলের নির্মাণ ব্যয়ের জন্য গুজরাটে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এতকিছুর পরও বলতে হয় যমুনা নদীর তীরে দন্ডায়মান তাজমহলের অপূর্ব সৌন্দর্য আর আকর্ষণের বিন্দুমাত্র বিচ্যুতি ঘটেনি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আশ-পাশের কুমিল্লার দেশ বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ যদি সামগ্রিক বিষয়টি বুঝাতে সক্ষম হন, তাহলে কুমিল্লা বিভাগ ঘোষণা হতেও পারে। তবে জনগণ এখনও আশাবাদী। একটু মাত্র ক্ষীণ আশা নিয়ে কুমিল্লাবাসী মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কৃপা দৃষ্টির অপেক্ষায় আছেন।

মামা,
পেটে খেলে পিঠে সয়। একজন রিকশাওওয়ালা বা কুলি/মুজুর জিডিপি কি বুঝে? সে বুঝে চাল আটা তেল নুন আর নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রীর দাম তার ক্রয় সাধ্যের মধ্যে আছে কিনা। তার কাছে মাথা পিছু আয়, উন্নয়নের রোল মডেল অথবা দেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশ এ নিয়ে তার কোন চিন্তা ভাবনা নেই। সে শুধু চিন্তা করে তার হাতে নগদ কত টাকা আছে।
মাথা পিছু আয়ের কথা শুনে একজন কৃষক বা শ্রমিকের কোন লাভ নেই তার কাছে তা শুধু মুখরোচক। গড় আয় সে এক শুভংকরের ফাঁকি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অনেক সময় নাখোশ হয়ে যান উন্নয়নের কথা না বলার জন্য। যারা সমালোচক তারা উন্নয়ন দেখেন না। তারা উন্নয়ন চায়না, তাদের দেশপ্রেম নিয়ে সন্দেহ করেন। দেশের অনেকগুলো মেগা প্রজেক্ট এর মধ্যে রয়েছে পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেস, ঢাকা বিমানবন্দর তৃতীয় টানেল। এসব কাজের দীর্ঘসূত্রতা আর বার বার বাজেট পরিবর্তনের কারণে জনমনে চরম অসন্তোষ। এসব বিষয়ে লিখতে গেলে পাবলিক ভাল চোখে দেখেনা। বরং সাংবাদিকদের সূর্যমুখী ফুলের সাথে তুলনা করে। সরকার যা বলে সাংবাদিকরা তাই লেখে। সাংবাদিকরা সরকারমুখী। তারা মনে করে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বা বিদেশী সাহায্য বা শর্ত সাপেক্ষে ঋণের টাকা দিয়ে এসব উন্নয়ন হচ্ছে। বিদেশে এতো উন্নয়ন হচ্ছে তারা তো এতো ঢাকঢোল পিটেনা। বাপ দাদাদের আমলে ধুতি বা গামছা পরার রেওয়াজ ছিল আর আমরা প্যান্ট শার্ট পরিধান করছি। চট্টগ্রামে মহিলারা এক সময়ে কাপড় পড়ত দোপাট্টা দিয়ে কিন্তু বর্তমানে খুব কম দেখা যায়। সভ্যতার অগ্রগতিকে উন্নয়ন বলা যায়না। আলোচনা সমালোচনা দুটোই থাকতে হবে এক তরফা কোন কিছুই গ্রহণযোগ্য নহে।

আমাদের জিডিপি বাড়ছে , বাড়ছে মাথাপিছু আয়। ভারত পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে যাচ্ছি। জনগণ এ নিয়ে মাথা ঘামায় না। আমজনতা নির্বাচন নিয়ে তেমন চিন্তা করেনা। কারণ জনগণ ২০১৪ ও ২০১৮ এর সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচন আর ২০১৮ সালের দিনের ভোট আগের রাতে সম্পন্নের নমুনা দেখে জনগণ ভোট বিমুখ হয়ে পড়েছে। সাবেক নির্বাচন কমিশনার মাহাবুব তালুকদারের ভাষায় নির্বাচন আইসিইউতে আর গণতন্ত্র লাইফ সাপোর্টে আছে। অথচ আমাদের একজন নেত্রী হলেন গণতন্ত্রের মানসকন্যা আরেকজন হলেন আপোষহীন নেত্রী ও মাদার অফ ডেমোক্রেসি। মাত্র তিন মিনিটের ২৭২ শব্দের এক ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের ষোড়শ রাষ্ট্রপতি, আব্রাহাম লিংকন ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন। এখনও ১৫০ বছর পরও, রাজনীতি বিজ্ঞানী গবেষকদের চোখে গণতন্ত্রের মোক্ষম সংজ্ঞাদাতা হিসেবে শ্রদ্ধার আসনে আছেন। বক্তৃতা শেষ করেন তার সেই ঐতিহাসিক উক্তি যা গণতন্ত্রের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সংজ্ঞা হিসেবে বিবেচিত। উক্তিটি হলো, “জনগনের সরকার, জনগনের দ্বারা সরকার, এবং জনগনের জন্য সরকার“ [ Government of the people by the people for the people ] যা পৃথিবী থেকে কখনও হারিয়ে যাবেনা। বাকরুদ্ধ জনতা হাত তালি দিতেও ভুলেযান। এ গণতন্ত্র থেকে আমরা দিনে দিনে সরে আসছি। যার কারণে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের গণতন্ত্র রাষ্ট্র সম্মেলনে বাংলাদেশ অংশগ্রহন করতে পারেনি। তিনটি উদ্দেশ্য নিয়ে ৯ ও ১০ ডিসেম্বর এই সম্মেলন হয়েছিল। উদ্দেশ্যগুলো হলো-
১.কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াই,
২. দুর্নীতি মোকাবিলা ও দমন,
৩.মানবাধিকার প্রসার।

পাকিস্তান আমলে মাত্র একজন মোনেম খান ছিলেন, এখন মোনেম খানের সংখ্যা অগণিত। এই মোনেম খানেরা সমাজের কোন সমস্যা দেখেনা। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সহিংসতায় শতাধিকলোক প্রান হারাল। শাসকেরা এ নিয়ে কোন চিন্তা করেনা। বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতাদের সম্পর্কে অমার্জিত ভাষায় কথা বলার দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিলেন, পাকিস্তানের উজিরে আযম লিয়াকত আলী খান। পরবর্তী শাসকেরা এখন পর্যন্ত একই ভাষা ব্যবহার করে চলেছেন। তারা চোখে তাদের সমালোচক ছাড়া অন্য কোন সমস্যা দেখেনা।

মামা,
সরকার কোন কিছুর তোয়াক্কা করেনা। কারণ সরকার মনে করে তাদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত। আন্দোলন করে বা সমালোচনা করে এ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব নয়। একাধারে তিনবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকে দেশ শাসন করছেন। অর্জন যেমন আছে তেমন ব্যর্থতাও আছে। তাদের যুক্তি হল স্বৈরাচার এরশাদ অবৈধভাবে ৯ বছর শাসন যদি করতে পারে তাহলে আমরা কেন এত সুসংগঠিত দল হয়েও দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারবোনা। আসলে আশা থাকতে পারে কিন্তু সব কিছু করা সম্ভব হয়ে উঠেনা। দীর্ঘদিন সরকারী দলের অনুগত বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টি তার অবস্থান ধরে রেখেছে। ১৪ দলীয় জোটে আছে এবং থাকবে বলে প্রতিশ্রæতিবদ্ধ। তারপরেও কেন এই সমালোচনা, তা বোধগম্য নহে। তবে অনেকে বলে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য একটা কৌশল মাত্র। অথবা দেশের সঠিক অবস্থা তুলে ধরে রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করতে চায়। ক্ষমতার অংশীদার এবং সরকার থেকে এত সুবিধা পাবার পরেও জাতীয় পার্টি কোন কারনে সরকারের ভালোবাসার দাম ন দিল। আসলে রাজনীতি এখন গণধিকৃত আস্থাহীনতার পেশায় পরিণত হয়েছে। আমলারা দুর্নীতিবাজ, কর্মীরা চাঁদাবাজ। পন্ডিতেরা মান-সম্মান ও সামাজিক মর্যাদা বিসর্জন দিয়ে অর্থ-বিত্ত ও ক্ষমতার ইঁদুর দৌড়ে ধাবমান। খুন ধর্ষণ নিত্যদিনের ঘটনা। নিরাপদ নিদ্রা ও নিশ্চিন্ত জাগরণের স্বপ্নগুলো দুর্লভ থেকে দুর্লভতর হয়ে উঠছে। নির্বিঘœ জীবনযাপনের উপাদানগুলো ক্রমাগত সাধারন মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। শিল্প-সাহিত্য, সঙ্গীত, ক্রীড়াঙ্গন- সবখানে চরম স্থবিরতা নেমে এসেছে। দুর্নীতির ভারে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো নড়বড় করছে। প্রতিবাদের উপায় নেই। পরিবর্তনের আশা নেই। তারপরও দেশের শতভাগ বিদ্যুতায়নে মানুষের মনে ক্ষীণ আশার আলো জ্বলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ সেলিম রায়হান এক সাক্ষাৎকারে বলেন, (প্রথম আলো, ৩ এপ্রিল ২০২২) “শ্রীলংকা সঙ্কটে রয়েছে। বিদেশী মুদ্রার যে রিজার্ভ রয়েছে তা দিয়ে মাত্র ১০ দিনের আমদানীমূল্য পরিশোধের ক্ষমতা নেই। বিভিন্ন দেশের সংস্থা থেকে যে ঋণ নিয়েছে তা পরিশোধের সক্ষমতা নেই। শোচনীয় পরিস্থিতি।“ তিনি বলেন, “ ভুল অর্থনীতি, ক্ষমতায় টিকে থাকার রাজনীতি, গোষ্ঠীতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র ও দুর্নীতি একটি দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে তার প্রমান শ্রীলংকা। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলংকাই সবচেয়ে বেশি এগিয়ে ছিল।“ দেশের দ্রব্যমূল্যের পরিস্থিতি-দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উপর চাপ সামাল দিতে ব্যর্থ হলে আমাদের জন্য অশনি সঙ্কেত বলা যেতে পারে। সরকারকে সতর্কতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একাদশ জাতীয় সংসদের ১৭ তম অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে বাংলাদেশের পরিণতি শ্রীলংকার মত হতে পারে এমন আশংকা নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, “ দেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত। সরকার অত্যন্ত সতর্ক।“ আমাদের জন্য আশার আলো।

মামা,
তুমি ইতিহাসের সাক্ষী। আমার আবেগ অনুভূতির এক বাতিঘর। আমার এ খোলা চিঠি মলাটে বাঁধা উপন্যাস হলে হয়ত বুঝাতে পারতাম কতটা তোমায় ভালোবাসি।

ইতি
তোমারই ভাগিনা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ