এ টি এম মোস্তফা কামাল
প্রত্যেক সংসদীয় আসনে একটা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি আরো জানিয়েছেন, প্রত্যেক সংসদীয় আসনে ক্যাডেট কলেজের আদলে ৬০০ কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হবে। ৬০০ কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য মাউশি কর্তৃক ৬৮ হাজার ৪৪২ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বৈদেশিক ঋণ সহায়তা নেয়ার বিষয় নিয়েও আলোচনা চলছে। বৈদেশিক ঋণের অর্থে প্রকল্প গ্রহণ করে গর্ববোধ করাই যদি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তাহলে এ নিয়ে আমার বলার কিছু নেই। কারণ স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সরকারের শিক্ষামন্ত্রী দীপু মণিও বড় অংকের প্রকল্পের প্রতি অনেক বেশি আকৃষ্ট ছিলেন। তার আমলে ফিনল্যান্ড ভিত্তিক একটা বিশাল অংকের প্রকল্প গ্রহণ করে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিকের শিক্ষা ব্যবস্থার অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করা হয়েছে।
আর শিক্ষার মানোন্নয়ন তথা সেন্টার অব এক্সিলেন্স এবং শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির কথা বলে যদি এরূপ প্রকল্প গ্রহণের কথা বলা হয়, তাহলে এ বিষয়ে কিছু কথা বলার রয়েছে।
বাংলাদেশে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৬টি- তখনো পর্যন্ত বেসরকারী কোন বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো না। ১৯৮৩ সালে ৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বাজেট ছিল মাত্র ৩৩ কোটি টাকা। আর এখন ১টা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটই হাজার কোটি টাকার ঊর্ধ্বে। ১৯৯২ সালে দেশের জনসংখ্যা যদি হয় ১০ কোটি তাহলে ১০ কোটি জনসংখ্যার এই দেশেই মাত্র ৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে উচ্চ শিক্ষার চাহিদা মিটানো হয়েছে।
১৯৯০ পরবর্তী সময়ে সরকার প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমতি দেয়া শুরু করলে সমগ্র দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের হিড়িক পড়ে যায়। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সরকারের উপর প্রভাব খাটিয়ে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা শুরু করে দিল- সেজন্য বাসা বাড়ী ভাড়া করে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে দিল। উচ্চ শিক্ষা বাণিজ্যিক পণ্যের রূপ ধারণ করলো। লেখাপড়ার মানের ক্রমাবনতি হতে শুরু করে দিল।
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি সরকারও রাজনৈতিক কর্মসূচীর অংশ হিসেবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে থাকে। তাতে করে দেশে এখন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়াল ১১৬ আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৭।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ৬টা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যদি দেশের উচ্চ শিক্ষার প্রয়োজন মেটাতে পারে সেক্ষেত্রে ২০২৬ সালে ৫৭টা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১১৬টা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কেন দেশের উচ্চ শিক্ষার চাহিদা মেটাতে পারবে না? শিক্ষার্থীর অভাবে যেখানে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে পারছে না সেক্ষেত্রে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের যৌক্তিকতা কোথায়? যে ক্ষেত্রে দেশে স্নাতক/স্নাতকোত্তর ডিগ্রীধারী বেকারের সংখ্যা ৮ লাখ ৮৫ হাজার সেক্ষেত্রে স্নাতক/স্নাতকোত্তর ডিগ্রীধারী বেকারের সংখ্যা আরো বাড়ানোর দরকার আছে কি?
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ৮-১০টা বিশ্ববিদ্যালয় লেখাপড়ার কিছু মান বজায় রেখে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে – আর বাদবাকী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো লেখাপড়া শেখানোর উপর কোন গুরুত্ব না দিয়ে সার্টিফিকেট বিক্রিকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাদের নিজস্ব একাডেমিক ভবনে শিক্ষা কার্যক্রমস্থানান্তরে এবং একাডেমিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
উচ্চ শিক্ষিত বেকারদের পুনর্বাসন কিংবা বেকার ভাতা প্রদানের সরকারের কোন সুনির্দিষ্ট কর্মসূচী নেই। বিসিএস, ব্যাংকিং সেক্টর, স্বশাসিত কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকুরীর সুযোগ খুবই সীমিত। দেশে যদি ৯-১৫লাখ উচ্চ শিক্ষিত/সাটিফিকেটধারী বেকার লোক থেকে থাকে, তাদের পুনর্বাসনের কোন সরকারী উদ্যোগ না থাকে তাহলে তাদের কি করুণ পরিণতি ভোগ করতে হয় তার খবর কে রাখে? উচ্চ শিক্ষিত বেকারদের একটা অংশ আবার নি¤œমানের পদে চাকুরীর প্রতিযোগিতায় হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। স্বল্প শিক্ষিত/অর্ধ শিক্ষিত তরুণেরা স্থানীয় রাজনীতির সংগে জড়িয়ে একদিকে মা-বাবার অবাধ্য হচ্ছে আর অন্যদিকে অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে। এদেশে সঠিক নীতি ভিত্তিক শিক্ষাক্রম চালু না হওয়ায় প্রাথমিক-মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার মানেও ধস নেমেছে।
পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে দ্বাদশ মানের শিক্ষাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। কারণ সেসব দেশে দ্বাদশ মানের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েই প্রায় সকলেই কোন না কোন চাকুরীতে নিয়োজিত হবার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার মান সে রকম নহে আর দ্বাদশ শ্রেণী পাশ করে কর্মে বিনিয়োজিত হবারও সে রকম সুযোগ নেই।
আমাদের দেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার যে বেহাল অবস্থা তার কিছু তথ্য ভিত্তিক বাস্তব চিত্র নি¤েœ তুলে ধরা হলো-
১) ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী শিক্ষা বিভাগের অনুমোদন থাকা সারা দেশের ২ হাজার ৬৯৫ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম গত কয়েক বছরে বন্ধ হয়ে গেছে। তন্মধ্যে স্কুল ১২৭৪, স্কুল এন্ড কলেজ ৯১, কলেজ ১৯২, মাদ্রাসা ৭৪১, শিক্ষক প্রশিক্ষক প্রতিষ্ঠান ৩৭, কারিগরী প্রতিষ্ঠান ৩১৩, পেশাগত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ৪৪ এবং বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় ৩টি। সূত্র-জাতীয় দৈনিক ৮ এপ্রিল, ২০২৪।
২) প্রাথমিক শিক্ষা শুমারি অনুযায়ী ২০২১ সালে প্রাথমিকে ১৪ লাখ এবং ২০২৩ সালে ৮ লাখ ৩২ হাজার শিক্ষার্থী কমে গিয়েছিল। সুত্র প্রাথমিক শিক্ষা শুমারী ২০২৩।
৩) বাংলাদেশে প্রায় ৪১% তরুণ নিষ্ক্রিয়। তারা পড়াশোনায় নেই, কর্মসংস্থানে নেই; এমনকি কোন কাজের জন্যে প্রশিক্ষণও নিচ্ছেন না। মেয়েদের মধ্যে নিষ্ক্রিয়তার হার ৬১.৭১% আর ছেলেদের মধ্যে ১৮.৫৯%। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বাংলাদেশ Sample Vital Statistics, 2022 প্রতিবেদনে নিষ্ক্রিয় তরুণের এই হার তুলে ধরা হয়েছে। এই ক্ষেত্রে বয়স ধরা হয়েছে ১৫- ২৪। নিষ্ক্রিয় তরুণের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২৯ লাখ সুত্র- জাতীয় দৈনিক- ৪ ফেব্রæয়ারী, ২০২৪ ।
৪) দেশের ৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় ৪১ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার বাইরে ছিল। মোট জনসংখ্যার হিসেবে শিক্ষার বাইরে থাকা এই শিশু ও তরুণের সংখ্যা ২ কোটি ৬২ লাখের বেশি- সুত্র- জাতীয় দৈনিক, ২৭ মার্চ, ২০২৪।
৫) সমাজসেবায় ৩য় শ্রেণীর ইউনিয়ন সমাজকর্মীর ৩১২ পদে আবেদনকারী ১২ লাখ- এই পদে আবেদনের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা দ্বাদশ শ্রেণী হলে ও স্নাতক/স্নাতকোত্তর ডিগ্রী ধারীদের একটা বড় অংশ ও আবেদন করেছে সুত্র- জাতীয় দৈনিক- ১৭ জুলাই, ২০২৬।
৬) শ্রমশক্তি জরীপের তথ্য অনুযায়ী দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার তন্মধ্যে স্নাতক ডিগ্রীধারী বেকারের সংখ্যা ৮ লাখ ৮৫ হাজার- জাতীয় দৈনিক- ১৭ জুলাই, ২০২৬।
শিক্ষার এরুপ বিপর্যস্ত অবস্থায় জাতি পুরোমাত্রায় হতাশাগ্রস্ত। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ লাভের জন্য উন্নত দেশের আদলে কর্মভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে আমাদের নজর দিতে হবে- আমাদের দেশে ও যেন দ্বাদশ শ্রেণী উত্তীর্ণদের সকলেই কর্মে বিনিয়োজিত হতে পারে তার সুনিশ্চিত ব্যবস্থা থাকার আবশ্যকতা রয়েছে। সেজন্য আমাদের দেশে সিঙ্গাপুর/ যুক্তরাজ্য/ যুক্তরাষ্ট্র/ অস্ট্রেলিয়া/ জার্মানী এই ৫টি দেশের যে কোন একটির অনুকরণে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। এটা কোন কঠিন কাজ নহে- বাংলা/সমাজবিজ্ঞান/ধর্ম ব্যাতীত অন্যান্য বিষয়গুলো প্রায় একই ধরনের। ইউরোপিয়ান স্টান্ডার্ডে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সাজানো সম্ভব হলে আমাদের শিক্ষিত তরুণরা গ্লোবাল সিটিজেন হিসেবে নিজেদেরকে সক্ষম করে তুলতে পারবে। নিজের দেশে কর্মের সুযোগ পাওয়া না গেলে ইউরোপ অ্যামেরিকায় কর্ম খুঁজে নিতে সক্ষম হবে। লেখাপড়া করার জন্য তরণদের বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা হ্রাস পাবে।
জার্মানীতে দেখেছি ৫ম শ্রেণী অতিক্রম করার পূর্বে সাইকেল চালানো শিখতে হয়। ৭ম শ্রেণী অতিক্রম করার পূর্বে সাঁতার শিখতে হয়। ১০ম শ্রেণী অতিক্রম করার পূর্বে ডয়েস-ইংরেজী ছাড়া তৃতীয় ( ফ্রেন্স বা অন্য কোন ভাষা) কোন ভাষা শিখতে হয়। আমাদের দেশেও আমরা সক্ষমতার উপর ভিত্তি করে পর্যায়ক্রমে এই বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে পারি।
আমাদের শিক্ষা কারিকুলাম থেকে এমসিকিউ সিস্টেম পুরোমাত্রায় বাদ দিতে হবে। কারণ এমসিকিউ সিস্টেম আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে কলুষিত করেছে, বাণিজ্যকীকরণ করেছে, কোচিং সেন্টারের প্রসারতা বাড়াতে সাহায্য করেছে, লেখাপড়া না করে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে সহায়তা করেছে, শিক্ষার মানের অধপতন ঘটাতে সহায়তা করেছে, এমসিকিউ সিস্টেম শিক্ষকদেরকে শ্রেণী শিক্ষার পরিবর্তে কোচিং শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তুলেছে, এমসিকিউ সিস্টেমের কোন ধরণের ভাল অর্জন নেই।
আমাদের দেশে সংসদীয় আসন ভিত্তিক ক্যাডেট কলেজের সমমানের কলেজ স্থাপন কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রকল্প গ্রহণের পূর্বে প্রাথমিক স্কুল পর্যায়ে শিক্ষার্থীর এনরোলমেন্ট পর্যাপ্ত পরিমাণে বেড়েছে কিনা, বেড়ে থাকলে তারা ৫ম শ্রেনী অতিক্রম করে মাধ্যমিক পর্যায়ে ভর্তি হচ্ছে কিনা সেটা অত্যন্ত সতর্কতার সংগে পরিবীক্ষণ করে দেখার আবশ্যকতা অনস্বীকার্য। মাধ্যমিক পর্যায় অতিক্রম করে কলেজে ভর্তিচ্ছু পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী পাওয়া না গেলে ৬শত নতুন কলেজের জন্য শিক্ষার্থী পাওয়া যাবে কোত্থেকে? শিক্ষার্থী পাওয়া না গেলে সেগুলো অব্যবহৃত হিসেবে খালি পড়ে থাকার সম্ভাবনা থেকে যাবে। সেরুপ প্রেক্ষাপটে শিক্ষক কর্মচারীদেরকে বিনা কর্মে বেতন ভাতা পরিশোধ করতে হবে- সেটা তো জাতীয় অপচয় হিসেবে গণ্য হবে।সংসদীয় আসন ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলে সেগুলোর ক্ষেত্রেও একই অবস্থা ঘটতে পারে।
লেখাপড়া করার মুল উদেশ্য হচ্ছে একটা উপযুক্ত মানের কর্ম খুঁজে পাওয়া। যে ধরণের লেখাপড়া করে কোন কর্মের সন্ধান পাওয়া যাবে না সে ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার আবশ্যকতা নেই।
উপর্যুক্ত অবস্থার প্রেক্ষাপটে সরকারকে সংসদীয় আসন ভিত্তিক ক্যাডেট কলেজ মানের ৬০০ কলেজ এবং ৩০০ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ স্থগিত করে নিম্নরূপ কার্যক্রম গ্রহণ করার জন্য সুপারিশ করা যাচ্ছে-
১) প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত ইউরোপীয়ান স্ট্যান্ডার্ড শিক্ষা কারিকুলাম তৈরী করে সেটা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ইউরোপীয়ান স্ট্যান্ডার্ড বলতে যুক্তরাষ্ট্র- যুক্তরাজ্য- অস্ট্রেলিয়া-জার্মানী কিংবা সিঙ্গাপুর এই ৫টা দেশের যে কোন একটিকে স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে বেছে নিয়ে সে দেশের আদলে আমাদের দেশের শিক্ষা কারিকুলাম তৈরী করা যেতে পারে।
২) কমিউনিকেটিভ ইংরেজীর পরিবর্তে গ্রামার বেস্ড ইংরেজী চালু করা যেতে পারে। এমসিকিউ সিস্টেম শতভাগ পরিহার করা যেতে পারে। কোচিং সেন্টার শতভাগ নিষিদ্ধ করা যেতে পারে। স্কুল বেস্ড শিক্ষা কার্যক্রম হতে হবে ৮০ পার্সেন্ট আর বাকী ২০ পার্সেন্ট থাকতে পারে বাড়ীর জন্য। একাদশ শ্রেণী থেকে শিক্ষার মাধ্যম হতে পারে ইংরেজী। ধর্ম শিক্ষা থাকতে পারে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত (সিঙ্গাপুরের অনুরূপ)। রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাস- দেশের সরকার ব্যবস্থা- প্রতিবেশী ভারত/ মায়ানমারের সংগে সম্পর্ক- জুলাই বিপ্লবের ইতিকথা ইত্যাদি বিষয়গুলো ১০ম শ্রেণীর মধ্যে শেষ করতে হবে। যে কোন বিষয় সম্পর্কে ব্রিফিং/ প্রেজেন্টেশন দেবার দক্ষতা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করতে হবে। উল্লেখ্য, জার্মানীর এক জন প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী যে রূপ ব্রিফিং দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করে থাকে আমাদের দেশের স্নাতক ডিগ্রীধারীরাও সেটা পারে না।
৩) ইউরোপের সংগে মিল রেখে ইংরেজী এবং বাংলার পাশাপাশি তৃতীয় আর একটা ভাষা ১০ম শ্রেণীর মধ্যেই শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
৪) মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে আরবীর ১টা/২টা বিষয় দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত থাকতে পারে। অন্যান্য সকল বিষয় সাধারণ শিক্ষার মতোই চলতে পারে। তাদের ক্ষেত্রে বাংলা এবং আরবীর সংগে তৃতীয় ভাষা হতে পারে ইংরেজী। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ভাষা হিসেবে ভাল মানের আরবী জানা বাধ্যতামূলক। ফাজিল এবং কামিল পর্যায়ের মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয় আরবীর কয়েকটি বিষয় রেখে সাধারণ শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কিছু অতীব প্রয়োজনীয় বিষয়কে কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
৫) দ্বাদশ শ্রেনীর পাঠ শেষ করে ৮০ পার্সেন্ট শিক্ষার্থী যেন কর্মে নিয়োজিত হতে পারে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে তার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। দ্বাদশ পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক এবং বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। দ্বাদশ শ্রেণী শেষে সকলের ডাটাবেস সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ডাটাবেস সংরক্ষণের কাজ শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে করতে হবে।
৬) স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ও ইউরোপীয়ান স্ট্যান্ডার্ডে উন্নীত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা সমাপ্ত করে কেউ যেন বেকার না থাকে কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে তার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশকে ইউরোপ স্ট্যান্ডার্ডে উন্নীত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নিদেনপক্ষে বিইউপি/ এমআইএসটি এর পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারকে সচেষ্ট হতে হবে।
৭) যে সমস্ত বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব ক্যাম্পাসে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম স্থানান্তর করতে ব্যর্থ হয়েছে সেগুলো কালক্ষেপণ না করে বন্ধ করে দেয়া যেতে পারে।
৮) যেসব বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান ৬০ পার্সেন্ট এর নীচে সেগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া যেতে পারে।
দেশে যদি আমরা ইউরোপীয়ান স্ট্যান্ডার্ড শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে পারি তাহলে বেকারত্ব কমে আসবে, লেখাপড়া করার জন্য আমাদের ছেলে মেয়েরা বিদেশমুখী হবে না। সেরুপ অবস্থায় সবাই দেশকে বসবাসের উপযোগী দেশ হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করবে। শিক্ষা মন্ত্রী এবং দেশের সুযোগ্য প্রধানমন্ত্রী সুপারিশ সমুহ বিবেচনা করে দেখবেন সেই আশা করছি।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব।
