• বুধবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২২, ১১:০০ অপরাহ্ন

বাউল ছদ্মবেশী সিরিয়াল কিলার সেলিম ধরা পড়লেন যেভাবে

আমার কাগজ প্রতিবেদকঃ / ১০৮ শেয়ার
প্রকাশিত : বৃহস্পতিবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০২২

একাধিক হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধের পর আত্মগোপনে যাওয়া ছদ্মবেশী বাউল ও বাউল গানের মডেল হেলাল হোসেন ওরফে সেলিম ফকির ওরফে খুনি হেলালকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ‘ভাঙা তরী ছেড়া পাল’ গানের বাউল মডেল হিসেবে অভিনয়ের পর তার পরিচয় নিশ্চিত হয় স্থানীয়রা। এরপর তার বিষয়ে র‌্যাবকে জানানো হয়। ছয় মাস ধরে র‌্যাবের গোয়েন্দারা তার অবস্থান শনাক্ত করে। পরবর্তীতে গতকাল রাতে কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলস্টেশন এলাকা থেকে হেলালকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এলিট ফোর্স র‌্যাবের দাবি, হেলালের বিরুদ্ধে তিনটি হত্যা মামলা ছাড়াও আরও দুটি মামলা আছে। একটি হত্যা মামলায় তার সাজাও হয়েছে।

৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করা হেলালের বাড়ি বগুড়ায়। একসময় মুদি দোকানি থাকলেও পরবর্তীতে হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। নিজের গ্রেপ্তার এড়াতে ছদ্মবেশে বিভিন্ন মাজার ও রেলস্টেশনে থাকা শুরু করেন। কেউ যেন চিনতে না পারে সেজন্য রাখেন বড় দাঁড়ি ও চুল। একটি বাউল গানের শুটিংয়ের সময় তাকে মডেল হিসেবে অভিনয় করানো হয়। সেই গানের ভিডিও দেখে স্থানীয়রা বাউল ছদ্মবেশ ধারণ করা সিরিয়াল কিলার হেলাল ফকিরকে শনাক্ত করেন।

বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজার র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এলিট ফোর্সটির মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, র‌্যাবের অভিযানে বাউল ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ানো সিরিয়াল কিলার খ্যাত দুর্ধর্ষ ফেরারি আসামি ও ‘ভাঙা তরী ছেড়া পাল’ গানের বাউল মডেল হেলাল হোসেন সেলিম ফকির ওরফে বাউল সেলিম ওরফে খুনি হেলালকে গ্রেপ্তার করা হয়। ছয়মাস আগে একজন ব্যক্তি ইউটিউবে প্রচারিত একটি গানের বাউল মডেল সম্পর্কে র‌্যাবের কাছে তথ্য দেয়। তখন জানানো হয়, এই বাউল মডেল সম্ভবত বগুড়ার বিদ্যুৎ হত্যা মামলার আসামি। পরবর্তীতে র‌্যাব ছায়া তদন্ত শুরু করে। এক পর্যায়ে ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে র‌্যাব নিশ্চিত হয়।

যত অপরাধ বাউলের

২০০১ সালের বগুড়ার চাঞ্চল্যকর বিদ্যুৎ হত্যা মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি সেলিম। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে আরও দুইটি হত্যা মামলা রয়েছে। যার একটি ১৯৯৭ সালে বগুড়ার বিষ্ণু হত্যা মামলা এবং ২০০৬ সালে রবিউল হত্যা মামলা রয়েছে। চাঞ্চল্যকর বিষ্ণু হত্যা মামলায় হেলাল ২১ বছর বয়সে এজাহারনামীয় আসামি ছিলেন। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছিল। এলাকায় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে দুর্ধর্ষ হেলাল নামে পরিচিতি পায়।

এছাড়া ২০১০ সালে বগুড়া সদর থানায় একটি চুরির মামলায় ২০১৫ সালে গ্রেপ্তার হন হেলাল ওরফে বাউল হেলাল। তাছাড়া নারী নির্যাতন আইনেও তার বিরুদ্ধে একটি মামলা রয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০০১ সালে বগুড়ায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মাহমুদুল হাসান বিদ্যুৎকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ভিকটিমের পরিবার বাদী হয়ে বগুড়া সদর থানায় হত্যা মামলা করেন। এই মামলায় আদালত তাকে যাবজ্জীবন সাজা দেয়। এছাড়া ২০০৬ সালে রবিউল নামে এক ব্যক্তিকে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সেই মামলারও চার্জশিটভুক্ত আসামি হেলাল।

প্রতিপক্ষের হামলায় আহত হন নিজেও

২০০০ সালে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বগুড়ায় দুইপক্ষের সংঘর্ষ হয়। প্রতিপক্ষের ধারালো দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে হেলালের বাম হাতে মারাত্মক জখম হয় এবং বাম হাত পঙ্গু হয়। এই ঘটনার পর সে লুলা হেলাল নামে পরিচিতি পায়।

যেভাবে ফেরারি জীবনে হেলাল

৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করে পরবর্তীতে মুদি দোকানি শুরু করেন র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হেলাল। ২০১০ সালে চুরির মামলা এবং ২০১৫ সালে জামিন পাওয়ার দিনে বিদ্যুৎ হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজা হলে সু-কৌশলে এলাকা ত্যাগ করেন হেলাল।

এরপর ফেরারি জীবন যাপন শুরু করেন। প্রথমে বগুড়া থেকে ট্রেনে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে আসেন। পরবর্তীতে কমলাপুর থেকে ট্রেনে চট্টগ্রামে চলে যান। সেখানে আমানত শাহ মাজারে ছদ্মবেশ ধারণ করে বেশ কিছুদিন অবস্থান করেন। পরে ট্রেনে সিলেটের শাহজালাল মাজারে চলে যান। সেখানে ছদ্মবেশ ধারণ করে আরও কিছুদিন অবস্থান করেন। এভাবে বিভিন্ন রেলস্টেশন ও মাজারে ছদ্মবেশে অবস্থান নেন। কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলস্টেশনে নাম-ঠিকানা ও পরিচয় গোপন রেখে সেলিম ফকির নাম ধারণ করে। ৫ বছর আগে হেলাল নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশনে কিশোর পলাশ ওরফে গামছা পলাশের একটি গানের শুটিং চলাকালে রেললাইনের পাশে বাউল গান গাচ্ছিল। তখন শুটিংয়ের একজন ব্যক্তি তাকে গানের মিউজিক ভিডিওতে অভিনয়ের প্রস্তাব দিলে বহুল জনপ্রিয় ‘ভাঙা তরী ছেড়া পাল’ শিরোনামের গানের বাউল মডেল হিসেবে তাকে দেখা যায়।

চার বছর ভৈরব স্টেশনে

সাত বছর দেশের বিভিন্ন জায়গায় ফেরারি জীবনযাপনের পর সবশেষ চার বছর কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলস্টেশনের পাশে একজন মহিলার সঙ্গে সংসার শুরু করেন। রেলস্টেশনে বাউল গান করে মানুষের কাছ থেকে জীবিকা নির্বাহ করতেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ