পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত সড়ক
আমার কাগজ প্রতিনিধি
‘পার্বত্য চট্টগ্রাম’ নামটি শুনলেই বাংলাদেশের জনগণের মানসপটে ভেসে উঠে আকাশছোঁয়া পাহাড়, সবুজ বনরাজি এবং ঝর্ণার সমন্বয়ে গঠিত দুর্গম অঞ্চলের প্রতিচ্ছবি, যেখানে গমনাগমন অত্যন্ত দুরূহ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই অঞ্চল বাংলাদেশের প্রায় এক দশমাংশ আয়তন জুড়ে বিস্তৃত, যা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলা নিয়ে গঠিত। অসম্ভব সুন্দর এই প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যটনের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়।
জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড়, গিরিখাত এবং বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ি নদী ও ছড়ার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত সীমিত, যা দুর্গমতার প্রধান কারণ। এছাড়াও, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই দুর্গম সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চলে বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র সংগঠনের অপতৎপরতার কারণে নিরাপত্তার দিক থেকেও বাংলাদেশের অপরাপর এলাকা থেকে সমস্যাসংকুল হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
এই অঞ্চলে বাস করে বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জনগণ, যারা এই দুর্গমতা এবং অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পশ্চাতপদ জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং সার্বিক উন্নয়নের অংশীদার হতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের দূর্ভোগ লাঘব, পশ্চাতপদ জনগোষ্ঠী ও এই অঞ্চলকে সামগ্রিক উন্নয়নের ধারায় আনার জন্য প্রয়োজন উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ‘সীমান্ত সড়ক’ নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিতের লক্ষ্যে এই মেগা প্রকল্পের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পের অধীনে তিন পার্বত্য জেলার সীমান্ত সংলগ্ন এলাকা জুড়ে দীর্ঘ রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে এবং ইতিমধ্যে অনেকাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে।
প্রকল্পটি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হলে তিন পার্বত্য জেলার অধিকাংশ উপজেলার মধ্যে সংযোগ সড়কের মাধ্যমে উন্নত যোগাযোগ স্থাপিত হবে। যা পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান সড়ক নেটওয়ার্ককে অনেক শক্তিশালী করবে। প্রকল্পটি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হলে একটি দীর্ঘ সড়ক নেটওয়ার্ক স্থাপিত হবে, যা বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ সড়ক নেটওয়ার্ক হিসেবে বিবেচিত হবে। কয়েকটি ধাপে এই সড়কের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হবে। ইতিমধ্যে গত ২০২৫ সালের মধ্যভাগে প্রথম ধাপের সড়ক পথ নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে এবং দ্বিতীয় ধাপের সড়কের নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। সড়কটি বান্দরবানের কেওক্রাডং পাহাড়ের চূড়া স্পর্শ করেছে। এটিই হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু সড়ক।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড এবং এর অধীনস্থ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়নসমূহের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এই সড়ক নির্মাণ প্রকল্প সম্পাদন করা হচ্ছে। প্রকল্পের কাজের গুণগত মান বজায় রেখে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি না করে সেনাসদস্যগণ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। সুউচ্চ পাহাড়, সুগভীর গিরিখাত, প্রতিকূল পরিবেশ, বৈরি আবহাওয়া, যোগাযোগ সংকট, প্রকল্প এলাকায় নির্মাণ উপকরণ পরিবহন, আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনসমূহের অপতৎপরতা ইত্যাদি কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। কিন্তু বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চৌকস সদস্যগণ সকল ধরনের জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে অদ্যাবধি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের কাজ পরিচালনা করে আসছেন।
যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয় স্থানীয় জনগণের জন্য। তাই স্বাভাবিকভাবেই এই সীমান্ত সড়কের মূল উপকারভোগী হবে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী জনগণ। এর নির্মাণ কাজ শেষ হলে পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে। সীমান্ত সড়কের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে তারা নিজেরাই নিজেদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা তথা জীবনমান উন্নতি করতে সক্ষম হবে।
পূর্বে কোন স্থানে পৌঁছাতে ২–৩ দিন পায়ে হেঁটে পাহাড়ী পথে যেতে হতো, এখন সেখানে মাত্র ২০–৩০ মিনিট থেকে ১–২ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছানো সম্ভব। এর ফলে এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। দূর্গম এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়াবে। অসুস্থ রোগীদের দ্রুত উপজেলা বা জেলা শহরের হাসপাতালে স্থানান্তর সম্ভব হবে। এই অঞ্চলে উৎপাদিত কৃষিজ পণ্য দেশের অন্যান্য স্থানে সহজে পরিবহনের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতির উন্নয়ন হবে, এমনকি কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পাবে। এর মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং জীবনমান উন্নয়ন ঘটবে, যা দেশজ উন্নয়নেও এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে।
সীমান্ত সড়ক নির্মাণের প্রধান উদ্দেশ্য হলো যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন। এতে পাহাড়ের সাথে সমতলের যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে এবং পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষের যাতায়াত বৃদ্ধি পাবে। দূর্গম পাহাড়ী এলাকায় নাগরিক সেবা পৌঁছানো সহজতর হবে। এই সড়ক পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। যোগাযোগ অবস্থার উন্নয়নের ফলে পাহাড়ে নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগ ও উদ্যোক্তা তৈরির সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। স্থানীয় কাঁচামাল নির্ভর ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প গড়ে উঠবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনা ও সম্প্রসারণের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বিভিন্ন হস্তশিল্প ও কৃষিজ পণ্য শহরে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন সহজতর হবে। এতে করে স্থানীয় পণ্যের নতুন বাজার সৃষ্টি হবে। দেশের বিভিন্ন স্থানের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা এই সড়ক ব্যবহার করে পার্বত্য চট্টগ্রামে উৎপাদিত ফসল ও পণ্য সরাসরি সংগ্রহ করতে পারবে, যার ফলে কৃষক ও উৎপাদনকারীগণ পণ্যের ন্যায্য দাম পাবেন। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যবসার প্রসার ঘটবে। এতে করে সার্বিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সমাজের মূল ধারার সাথে সমন্বয়পূর্বক উপকৃত হবে।
পাহাড়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রধান অন্তরায় হলো অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যবস্থা। দূর্গমতার কারণে পাহাড়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা কঠিন। এছাড়াও যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষকগণও সেখানে যেতে অনাগ্রহী হন। যার ফলে অস্থায়ী এবং তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ শিক্ষক দ্বারা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে সেখানে যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব হবে, তেমনি যোগ্যতা সম্পন্ন দক্ষ শিক্ষকগণও পাঠদানে আগ্রহী হবেন। পার্বত্য জনপদের শিক্ষার্থীরাও দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসতে পারবে। এতে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাবে এবং এই অঞ্চলের অনগ্রসর জনগণ শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে নিজেদের কর্মসংস্থান নিশ্চিতপূর্বক জীবনমান উন্নয়ন ঘটাতে পারবে।
অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এই অঞ্চলে অদ্যাবধি মৌলিক চিকিৎসা সেবা অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। এছাড়াও বিদ্যমান হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহে ডাক্তারের অভাব প্রকট। উন্নত চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, যার ফলে যথাযথ চিকিৎসার অভাবে রোগী মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। সীমান্ত সড়ক নির্মাণের ফলে পাহাড়ী অঞ্চলে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং হাসপাতালসমূহে উন্নত চিকিৎসা সামগ্রী পৌঁছানো সম্ভব হবে। বিশেষত জরুরি প্রয়োজনে অসুস্থ রোগীদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা বা বিভাগীয় শহরে প্রেরণ সম্ভব হবে। দক্ষ চিকিৎসকগণ প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে সেবা প্রদানে আগ্রহী হবেন। এর ফলে পার্বত্য অঞ্চলে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং অনেক জীবন রক্ষা পাবে।
