• মঙ্গলবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২২, ১০:১৪ অপরাহ্ন

পাঁচ যুগের প্রতীক্ষার রাস্তাটি ধসে গেল ১৫ দিনেই!

আমার কাগজ প্রতিবেদকঃ / ১২৯ শেয়ার
প্রকাশিত : বৃহস্পতিবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

পাঁচ যুগেরও বেশি সময় ধরে কয়েক হাজার অবহেলিত মানুষ চলাচল করছিলেন একটি গ্রামীণ কাঁচা রাস্তায়। যাদের বৃষ্টিতে জুতা হাতে নিয়ে কাঁদা মাড়িয়ে আর বন্যায় কোমর পানি বা নৌকাই ছিল ভরসা। বদলেছে একের পর সরকার, বদলেছে স্থানীয় প্রতিনিধি। আশ্বাসের উপরে আশ্বাসে ভেসে গিয়েছিল বিশ্বাস। তবুও তা আবার উঁকি দিল গ্রামবাসীর মনে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরে ভাগ্য খোলে এলাকাবাসীর। মনে বুনছিল একটি পাকা রাস্তার স্বপ্ন, যার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাবে এলাকাটি। কিন্তু স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু অসাধু কর্মকর্তা আর ঠিকাদারের যোগসাজেশে নিম্নমানের কাজে ভেস্তে গেছে গ্রামবাসীর সেই স্বপ্ন। এমনই অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা।

নানা সময়ে নানা জায়গায় যুগের পর যুগ ধর্ণা দিয়ে অবশেষে মেলে সেই বহুল প্রতীক্ষিত রাস্তাটি। কিন্তু সেটাও যেন ভাগ্যে সইছে না গ্রামবাসীর। নির্মাণ শেষ হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যেই ধসে গেছে সেটিও। রাস্তাটি যেন আরও কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের। পাকাকরণের আগে রাস্তা থাকায় যোগাযোগব্যবস্থা মোটামুটি অক্ষুণ্ন থাকলেও এখন পাকাকরণের পরে রাস্তা ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার উপক্রম। পায়ে হাঁটা ছাড়া এখন কোনো বিকল্প অবস্থা না থাকায় সেই স্বপ্নের ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে একরাশ হতাশা আর মানসিক কষ্ট। কিন্তু এতকিছুর পরেও দায় নিচ্ছে না স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে অনিয়মের কারণে কিছুদিন কাজ বন্ধ রাখা হয়েছিল বলছেন উপজেলা প্রকৌশলী।

৮০ লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে সদ্যনির্মিত একটি রাস্তার এমন বেহাল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার মাগুড়া বিনোদ ইউনিয়নের ঘরগ্রাম পূর্বপাড়ায়। রাস্তাটি দেখতে গেলে অভিযোগ ও হতাশা ছুড়তে থাকেন এলাকাবাসী।

স্থানীয়রা বলেন, আমাদের জীবনটাই কেটে গেল একটা রাস্তার আশায়, তবুও হচ্ছিল না। তারপরে অসংখ্য জায়গায় ধর্ণা দিয়ে মেলে রাস্তাটির অনুমোদন। এরপরে রাস্তার কাজ শুরু হওয়ার পরেই নিম্নমানের কাজ হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকার পরে খুব দ্রুত সময়ে তরিঘরি করে কাজ শেষ করেন ঠিকাদার। এই সুযোগে কোনো রকমে রাস্তার কাজ শেষ করে যাবার ১৫ দিনের মধ্যেই কয়েক জায়গায় ভেঙে পড়ে রাস্তাটি। এর মধ্যে এক জায়গায় প্রায় ৪০-৪৫ মিটার রাস্তা ভেঙে পুকুরে পড়ে গেছে। সেখান দিয়ে রাস্তা কাঁচা থাকাবস্থায় ভ্যান ও অটোগাড়ি চলাচল করলেও এখন সাইকেল ছাড়া কোনো যান চলে না। এখন আবার সেই পায়ে হেঁটে যাওয়াই ভরসা। মানুষজন অসুস্থ হলেও ঘাড়ে করে নিয়ে আসা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। তাহলে এই রাস্তা দিয়ে কী করবো আমরা!

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের এই রাস্তাটি সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, শুধু এক জায়গার বৃহৎ ভাঙাটিই নয়, ভেঙে যাচ্ছে রাস্তাটির আরও কয়েকটি স্থানে। তবে ৮৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত রাস্তাটি ১৫ দিনও না টেকায় ক্ষোভ জমেছে এলাকার সবার মনেই। এমনকি কিছু কাজ না করেই বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। তবে বিল তুলে নেওয়ায় রাস্তাটি আর মেরামত হবে কি না এটা নিয়েও তাদের মনে দেখা দিয়েছে সংশয়।

তাড়াশ উপজেলা প্রকৌশলী অফিস সূত্রে জানা যায়, ৮৫ লক্ষাধিক টাকা ব্যয় ধরে ১১৫০ মিটার রাস্তাটির কাজ পান তন্ময় এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ৫০ মিটার বাদ দিয়ে ১১০০ মিটার রাস্তার কাজ করে তন্ময় এন্টারপ্রাইজ। তখন এলজিইডি বাকি ৫০ মিটার রাস্তা বাদ দিয়ে বিল কষে, এতে অল্প রাস্তা থেকেই গ্রামবাসীর হারাতে হয় আরও ৫০ মিটার রাস্তা।

আরও জানা যায়, গত বছরের ১৫ মে কাজ শুরু হয়ে চলতি বছরের ৩০ জুলাই শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু গত বছরের ১৫ মে কাজ হওয়ার কথা থাকলেও কাজ শুরু করা হয় অনেক দেরিতে। এরপর তরিঘড়ি করে কোনো রকমে নিম্নমানের কাজ করে দ্রুততার সাথে চলতি বছরের ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে কাজ শেষ করা হয়। এমনকি সেই একই দিনে কাজ হস্তান্তর করে তুলে নেওয়া হয় শতভাগ বিলও।

এর ১৫ দিন যেতে না যেতেই প্রায় ৫০ মিটার রাস্তার সিংহভাগ ধসে পড়ে যায়। এমনকি সেই জায়গায় গাইড ওয়াল দেওয়ার কথা থাকলেও দেখা যায় সেখানে কোনো গাইডওয়াল না দিয়ে নামমাত্র কিছু খুঁটি দেওয়া হয়। এখন পানি চলে আসায় সেই জায়গাটির আর সংস্কারও করতে পারছেন না ঠিকাদার ও কর্তৃপক্ষ। যার ফলে তাদের এই অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়টি আরও বেশি প্রকাশ্যে চলে আসে। এখন বলছেন বর্ষার পরে ঠিক করে দেওয়া হবে রাস্তা। কিন্তু এরই মধ্যে ভাঙতে শুরু করেছে রাস্তার আরও কয়েকটি অংশ। যা নিয়ে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে এলাকাবাসীর মনে। সবার মুখে মুখে এখন দায়িত্বরত উপ-সহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তন্ময় এন্টারপ্রাইজের অনিয়ম দুর্ণীতির বিষয়টি আলোচ্য হয়ে উঠেছে।

এবিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের রাস্তাটির দায়িত্বরত উপ-সহকারী প্রকৌশলী (এসডি) মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, রাস্তাটির কাজের মান নিয়ে সমস্যা নেই, কিন্তু নতুন রাস্তা বলে ভেঙে পড়েছে।

তবে গাইডওয়ালের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে ৪০ মিটার গাইডওয়াল না দিয়ে প্যালাসাইটিং করা হয়েছে। কিন্তু সেটাও নেই বললে তিনি আর কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে বর্ষা শেষ হলে আবার কাজ করে দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। রাস্তার অনিয়ম ও নিম্নমানের কাজের ব্যাপারে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

এ ব্যাপারে তাড়াশ উপজেলা প্রকৌশলী মো. আবু সাঈদ বলেন, রাস্তাটিতে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে ও কাজে কিছু অনিয়ম হওয়ায় আমরা মাঝখানে কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলাম। পরবর্তী সময়ে আবার কাজ শেষ করা হয়েছে।

তবে ধসে পড়া জায়গা বর্ষা শেষে মেরামত করে দেওয়া হবে জানিয়ে গাইড ওয়ালের ব্যাপারে বলেন, সেখানে নিয়ম অনুযায়ী গাইডওয়াল দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু এক্ষেত্রে উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেনের বক্তব্যের সঙ্গে তার বক্তব্যে অমিল পাওয়া যায়।

রাস্তার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তন্ময় এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী এম.এ আল বাকি বলেন, যেহেতু বর্ষার মৌসুম তাই রাস্তাটি ধসে গেছে। আমার জামানত এখনো আছে, তাই বর্ষার পরে আমি রাস্তাটি আবার সংস্কার করে দেব। তবে নিম্নমানের কাজের জন্য কিছুদিন নাকি কাজ বন্ধ রাখা হয়েছিল এবিষয়ে জানতে চাইলে এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

এবিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের সিরাজগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, বিষয়টি আমি জানি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তন্ময় এন্টারপ্রাইজকে এবিষয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। যেহেতু এখন মাটি পাওয়া যাচ্ছে না তাই বর্ষার পরে রাস্তাটি আবার করে দেওয়া হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ