অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান
১৬০০ সাল থেকে ১৮০০ সালের মধ্যবর্তী সময়টি বৃটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী কর্তৃক রচিত বাংলার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের এক মর্মান্তিক ইতিহাস। পালাশীর যুদ্ধ (২৩, জুন ১৭৫৭) কেবলমাত্র একটি সাধারন যুদ্ধ নয় বরং স্বাধীনতা হারিয়ে ১৯০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের কবলে পড়ার এক করুন কাহীনি। নবাব সিরাজউদ্দৌলার (১৭২৮-১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দ) বিরুদ্ধে পরিচালিত এই যুদ্ধএকদিনের হলেও নানা মাত্রায় ছাড়িয়ে ছিল ষড়রযন্ত্র। ইংরেজ বোনিয়ারা এই ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছিল দেশীয়দের হাত ধরেই। ১৭৫৬ সালের ১৫ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে মাতামহ নবাব আলীবর্দী খাঁ প্রদত্ত নবাবির দায়িত্ব পালনের শুরুতেই যুবক সিরাজউদ্দৌলা আক্রান্ত হন দেশীয় শত্রু দ্বারা। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ক’জন হলেন সেনা বাহিনীর প্রধান মীর জাফর, দেশীয় বণিক রায়দুলর্ভ, জগৎশেঠ, উর্মিচাঁদ এবং কতিপয় ঘরের শত্রæ, বিশেষ করে খালা ঘষেটি বেগম। ইংরেজ বণিকদের কুটচালে ধরা দিয়ে এরা নবাবের অভ্যন্তরীন শাসন দুর্বল করে। পলাশীর যুদ্ধের সেই দিনে এরা নবাবের বিরুদ্ধে ইংরেজদের পক্ষ নিয়ে স্বাধীন বাংলার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত করে। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেয়া এ প্রবন্ধের লক্ষ্য নয় বরং সেই সময়ের সাথে বর্তমান বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক কি কি কাঠামোগত মিল রয়েছে এবং এ থেকে কি শিক্ষা নেয়া দরকার সে বিষয়ে সংক্ষেপে কিছু কথা উপস্থাপনই এর মূল লক্ষ্য।
বৃটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী প্রথমে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৬৫১ সালে বাংলায় প্রবেশ করে। এই সালে তারা বাংলার সুবেদার শাহ সুজার কাছ থেকে অনুমতি লাভ করে এবং হুগলিতে তাদের প্রথম বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। এরপর ১৬৫৮ সালে তারা কশিম বাজার, পাটনা ও রাজমহলে বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে তোলে। সম্পদ নিয়ন্ত্রণ ও একচাটিয়া বাণিজ্যের মাধ্যমে তারা শক্তি বৃদ্ধি করে এবং এক পর্যায়ে দেশদ্রোহীদের সহায়তায় রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে বাংলারঔপনিবেশিক শাসক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
বর্তমানে পরাশক্তি এবং বহুজাতিক কোম্পানীগুলো বাংলাদেশের উন্নয়ন সহোযোগীতার আদলে দেশীয় বাণিজ্য ও অবকাঠামো নির্মাণে সম্পৃক্ত হচ্ছে। গবেষকগণ একে নব্য উপনিবেশবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। প্রশ্ন থেকে যায় এই বাণিজ্য ও অবকাঠামো নির্মাণ সহায়তার আড়ালে রাজনৈতিক ক্ষমতা বিলিন তথা দেশের সার্বভৌমত্ব হারানোর ঝুঁকি আছে কিনা? এগুলো কি কৌশলগত বিনিয়োগ? এগুলো কি ঋণ ফাঁদ? এসব নিয়ে ভাবতে হবে। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ইংরেজ বণিকদের বিনা শুল্কে বাণিজ্য সুবিধা দিয়েছিল যার অপব্যবহার করেছিল ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তারা বিনা অনুমতিতে ফোর্ট উইলিয়াম দূর্গের সংস্কারের নামে নিজেদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেছিল। পাশাপাশি নবাবকে ক্ষমতাচ্যূত করে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করার জন্য স্থানীয় বণিক ও অভিজাতদের আর্থিক সুবিধা ও দূর্নীতির লোভ দেখিয়ে তাদের পক্ষে নিয়ে গিয়েছিল। ষড়যন্ত্র ও পরনির্ভরশীলতার সেই কলঙ্কিত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি আমরা দেখেছি গত ১৬/১৭ বছর। বর্তমান সরকার ইতিহাসের অনাকাঙ্খিত পুন:রাবৃত্তির বিষয়ে কতটা সচেতন আছে- তার ওপর নির্ভর করবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ভবিষ্যৎ।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ের গবেষকগণ মনে করেন, পরাশক্তিগুলো বিশাল অংকের ঋণ প্রদান করে। সরকারী অব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় দুর্নীতিবাজদের কারণে সেই ঋণ এক পর্যায়ে মরন ফাঁদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বন্দর ও অবকাঠামো লিজ নেয়ার মাধ্যমে পরশক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে আর ঋণ গ্রহিতা দেশগুলো হারায় তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, এমনকি জীবন। নবাবের ক্ষেত্রে তাই ঘটেছিল। সিরাজউদ্দৌলার পরিবারেই মোহাম্মদী বেগ আশ্রিত হিসেবে ছিল। তাই নবাবের সাথে বেগের সখ্যতা ছিল। অথচ মীর জাফরের পুত্র মীরনের নির্দেশে ১৭৫৭ সালের ৩জুলাই মোহাম্মদী বেগ জাফরগঞ্জ প্রাসাদের একটি কক্ষে নবাবকে নির্মমভাবে হত্যা করে। সেদিন স্বার্থের কাছে সখ্যতা তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল।
নবাব সিরাজউদ্দৌলার সময়ের মতো ঢাল-তলোয়ার নিয়ে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ বর্তমানে নেই বলেলই চলে। তবে, ফ্রক্সি যুদ্ধ (Proxy war) বর্তমান সময়ের পরাশক্তিগুলোর একটি নতুন কৌশল হিসেবে পরিলক্ষিত হয়। রাজনৈতিক দল, উপদলগুলোর মধ্যে সংঘাত রচনা করে জনগনের ভোটে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে পুতুল সরকার বসিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাছিলকরাই তাদের লক্ষ্য। এই দুরীসন্ধীমূলক কৌশল জাতীয় স্বার্থের সাথে সর্বৈবভাবে সাংঘর্ষিক। অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ একটি ‘‘বাফার ষ্টেট’’। তাই প্রতিদ্ব›দ্বী পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের দ্বন্দের মধ্যবর্তী নিরপেক্ষ স্থানে এর অবস্থান। তাই ‘ফ্রক্সি যুদ্ধে’ পা দেয়ার কোন সুযোগ নেই বাংলাদেশের। প্রয়োজন কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ। তবে এ ক্ষেত্রে সাফল্যের বিষয়ে ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করাবাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করার ক্ষেত্রে ১/২টি ব্যতিক্রম ছাড়া কেবলই ব্যর্থতাও মাথা নত করার ইতিহাস।বর্তমান সরকারের এই দু:সাধ্যকে সাধন করার জন্য তাই প্রয়োজন ‘কৌশলগত স্বশাসন’ কুটনীতির চর্চা করা। এই কুটনীতি হলো কোন পক্ষের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে উভয় পক্ষের (তথা সকল পক্ষের) সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা।
বর্তমান সরকারকে মনে রাখতে হবে, নতুন বাংলাদেশের অঙ্গীকার এবং প্রত্যাশা নিয়ে ভোটারগন যে রায় দিয়েছে তাদের অন্যতম প্রধান একটি আকাঙ্খা সার্বভৌমত্ব রক্ষা। আর এর সিংহভাগ নির্ভর করছে এই সক্ষমতা অর্জনের ওপর।
বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হলো বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল। এটি ভারত মহাসাগরের উত্তর-পূর্ব অংশের একটি কৌশলগত ভৌগলিক এলাকা। এটি বাংলাদেশের সাথে ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা এবং ইন্দোনেশিয়াকে সংযুক্ত করে। বিশে^র বৃহত্তম এই উপসাগরটি আন্তর্জাতিক বানিজ্য, জ¦ালানি পরিবহন এবং পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগীতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে।
লক্ষ্য হলো বিশ্ব মঞ্চে আধিপত্য বিস্তার করা। অতীতেও তাই হয়েছে। ১৭৫৭ পরবর্তী সময়ে বঙ্গোপোসাগরীয় অঞ্চল ও বাংলার সম্পদ বৃটিশ উপনিবেশ শাসকদের বিশ^ মঞ্চে আধিপত্য এনে দিয়েছিল।বর্তমানে ওয়াশিংটন, বেইজিং এবং দিল্লীর নিকট এই উপসাগরীয় অঞ্চল সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই স্নায়ুযুদ্ধ চলমান। প্রশ্ন হলো, এই অঞ্চলের রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে পরাশক্তির কটুচাল সমালনোর ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার কতট প্রস্তুত?
উল্লেখিত সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, নবাব সিরাজউদ্দৌলার সময়কালীন বাংলার সাথে বর্তমান বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক কাঠামোগত অভিন্নতা রয়েছে। নবাবের আমলে অর্থনৌতিক ও বাণিজ্যিক নির্ভরতা বাংলার স্বাধীনতাকে বিপন্ন করে দিয়েছিল। এই পতনকে তরান্বিত করেছিল স্থানীয়দের অর্থ ও ক্ষমতার লোভ, চক্রান্ত ও বিবাদ। ইতিহাস প্রমাণ করে জাতীয় স্বার্থের বিপরীতে অর্থ, ক্ষমতা, লোভ সার্বভৌমত্বের জন্য মারাত্বক হুমকি স্বরূপ। তাই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়ার কোন বিকল্প নেই। ২০২৪ সালের জুলাই-আগষ্ট গণঅভ্যূত্থান ছিল বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরী। স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, একচাটিয়া বিদেশী নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশকে নিজস্ব স্বার্থ রক্ষায় দরকষাকষির সুযোগ তৈরী করে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা ও দেশের কৌশলগত স্বাধীনতা রক্ষা করা ছিল এই গণঅভ্যূত্থানের মূল লক্ষ্য। একটি সচেতন বৈশি^ক শক্তি হিসেবে ছাত্র-জনতা, বিশেষ করে তরুণরা উপলদ্ধি করতে পেরেছিল, একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ও মেরুদন্ডহীন সরকার বিশ^মঞ্চে দেশের জন্য কখনোই সম্মানজনক অবস্থান নিশ্চিত করতে পারবে না।
ঙ্গতকারণে বলা যায়, ১৭৫৭ সালের ২৩ জুনের পলাশীর যুদ্ধ ছিল বাংলার স্বাধীনতা হারানোর করুণ সূচনা, অন্যদিকে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান দেখিয়েছে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়ে ছাত্র-জনতার অধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার নতুন পথ। ইতিহাস বলে, ১৭৫৭ সালের বিশ্বাসঘাতকতা থেকে শিক্ষা নিয়ে, ২০২৪ সালের মতো জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে যেকোনো দেশি-বিদেশি চক্রান্ত রুখে দেওয়া সম্ভব। পলাশীর যুদ্ধ থেকে শিক্ষা হলো,বিশ্বাসঘাতকতা ধ্বংস ডেকে আনে। মীর জাফরের মতো লোভী ও স্বার্থান্বেষী মানুষের বিশ্বাসঘাতকতার ফলেই নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন এবং বাংলার স্বাধীনতা অস্তমিত হয়। আরো একটি শিক্ষা হলোঅভ্যন্তরীণ কোন্দল বহিরাগতদের সুযোগ করে দেয়। যেমন মীর জাফররা নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বিদেশি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছিল। মূল কথা হলো, একতা ছাড়া স্বাধীনতা রক্ষা অসম্ভব। ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐক্যে তৈরী করতে ব্যর্থ হলে একটি শক্তিশালী জাতিও পরাধীন হয়ে যেতে পারে। জুলাই অভ্যুত্থান শিক্ষা দেয়, ছাত্র-জনতার শক্তি অসীম। দেশের সংকটময় মুহূর্তে তরুণেরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের পতন ঘটাতে পারে।তবে কেবল শাসন পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়, বরং বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং দুর্নীতিমুক্ত কাঙ্খিত দেশ গড়তেহলে সরকারের দায়িত্ববোধ ও জনসচেতনতা অপরিহার্য্য। স্বৈরাচারমুক্ত নতুন বাংলাদেশ গড়তে প্রতিটি নাগরিককে তাই সর্বদা সজাগ থাকতে হবে, যেন কোনো নতুন সুবিধাভোগী গোষ্ঠী আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে।ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয়, ১৭৫৭ সালের মীর জাফরদের ষড়যন্ত্রের ফলে দেশ দীর্ঘ প্রায় ১৯০ বছর পরাধীন ছিল আবার ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান প্রমাণ করে, তরুণ প্রজন্ম ঐক্যবদ্ধ হলে ফ্যাসিবাদের পতন নিশ্চিত করা যায়। পলাশীর করুণ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি এড়াতে চাইলে ‘‘সবার আগে বাংলাদেশ” নীতির ধারক বর্তমান সরকাকে সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে। হতে হবে দূরদর্শী। জবাবদিহিতা ও দায়িত্ববোধের জায়গায় থাকতে হবে অঙ্গিকারাবদ্ধ ও অটল। তবেই ১৭৫৭ সালের পালাশীর গ্লানি মুছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ জুলাইয়ের অর্জনকে সুরক্ষা করা সম্ভব। এটিই হলো ইতিহাসের মূল বার্তা।
লেখক: উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
