• রবিবার, ২৯ মে ২০২২, ০৫:১৪ অপরাহ্ন

‘দেশে রোহিঙ্গারা থাকার জায়গা পায়, আর আমরা পাই না’

আমার কাগজ প্রতিবেদকঃ / ৫১ শেয়ার
প্রকাশিত : শনিবার, ২২ জানুয়ারী, ২০২২

নদীর পাড় দখল করে অবৈধভাবে পাকা, আধা পাকা ও টিনশেডের স্থাপনা নির্মাণ করেছে প্রভাবশালী ও ভাসমান শ্রমজীবী মানুষ। শুক্রবার (২১ জানুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সদর উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। এতে পুনর্বাসন না করে উচ্ছেদের ফলে এখন খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন করছে ভাসমান শ্রমজীবী মানুষগুলো।

সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. শাহীন মাহমুদের নেতৃত্বে নদীর পাড় দখলমুক্ত করতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের সময় সঙ্গে ছিলেন বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য।

জানা গেছে, অভিযানের প্রথম দিনে লঞ্চঘাট বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে অভিযান কার্যক্রম শুরু করে চলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। লোহালিয়া নদীর তীরের জৈনকাঠি থেকে শুরু হয়ে লাউকাঠি নদীর ব্রিজ পর্যন্ত শত শত অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। এসব অবৈধ স্থাপনার মধ্যে প্রভাবশালীদের বহুতল ভবনও রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় প্রশাসন এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান করলেও কিছুদিনের মধ্যে আবারও দখল হয়ে যায়। এবারও হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকায় বহু প্রভাবশালীর বহুতল ভবন উচ্ছেদ করা হয়নি। তবে পুরোটাই উচ্ছেদ হবে, নাকি প্রভাবশালীরা এর বাইরে থাকবে, এ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে ভাসমান মানুষগুলো।

চায়ের দোকানি রাহিমা বেগম বলেন, আমার জন্মের পর থেকে দেখেছি এখানে আমাদের ঘরবাড়ি। প্রধানমন্ত্রী ভূমিহীনদের জন্য ঘর নির্মাণ করে দিচ্ছেন, আর আমরা নিজেরা ঘর স্থাপন করে বসে আছি, সেগুলো ভেঙে রাস্তায় নামিয়ে দিচ্ছে। এক দিন আগে মাইকিং করেছে আমাদের এখান থেকে চলে যেতে হবে।

স্বনির্ভর রোড এলাকার বাসিন্দা জাহানারা বেগম বলেন, উচ্ছেদের ফলে মাথা গোঁজার শেষ সম্বল শেষ। যারা বড়লোক প্রভাবশালী তাদের দালান ভাঙে না প্রশাসন ভাঙে খালি আমাগো টিনের ও পলিথিনের ঘর। গতকাল রাতে সরকারি জমির ঘরে আছিলাম আজ সরকার ভেঙে দিয়েছে। তাই পোলাপান সবাইরে নিয়ে শিশু পার্কে খোলা আকাশের নিচে রয়েছি। আমাগো তো ক্ষমতা নেই, টাকা নেই যে আদালত দিয়ে রায় আনমু। নিজের পেট চলে না কী আর করার।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাছের বলেন, আমাগো তো আর সম্পদ নাই। ভ্যান চালাইয়া সংসার চালাই। জন্মের পর থেকে নদীর তীরের এ চরে ঘর তুলে বসবাস করতাম। এখন সরকার আমাগো গরিবেরটা ভেঙে দিয়েছে। বড় লোকগোতা ভাঙে নাই।

শুক্রবার বিকেলে স্বনির্ভর রোড এলাকায় দেখা গেছে, রাস্তার পাশে এখন ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তিন কোনা ঢেউটিনের সারি। পুনর্বাসন না করে উচ্ছেদের ফলে বিপাকে পড়েছেন ভাসমান মানুষ। এসব পরিবার বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, শ্রমজীবীর স্ত্রী ও শিশুসন্তান নিয়ে শীত উপেক্ষা করে শহীদ আলাউদ্দিন শিশু পার্কের খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে। শিশু পার্ক মাঠে কয়েকটা থালাবাসন, একপাশে জড়ো করে রাখা কয়েকটা বালতি, বিছানা-তোশক নিয়ে নিচু হয়ে বস আছে। কেউ আবার অস্থায়ী চুলা তৈরি করে রান্না করছে। অনিশ্চিত ভবিষ্যতে ডুবে থাকা মানুষগুলো জানে না কোথায় মিলবে ঠাঁই।

দিনমজুর মো. শামছু মিয়া অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেন, আমি এখানে বড় হইছি। ছেলে-মেয়ে মানুষ করছি। সবাইকে এখানে বসে বিবাহ দিয়েছি। কাঠ কেটে সংসার চালাই। এখন কোথায় যাব? কার কাছে যাব? এই মাঘ মাসের শীতের মধ্যে বুড়া বয়সে স্ত্রী-সন্তান- নাতনিরে নিয়া কীভাবে দিন কাটাব? তিনি আরও বলেন, দেশে রোহিঙ্গারা থাকার জায়গা পায়, আর আমরা পাই না।
এ সময় ভাসমান বাসিন্দা আলেয়া বেগম বলেন, আমাগো মাথা গোঁজার ঠাঁই দেন আর না হয় আমাগো মেরে ফেলেন।

সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহীন মাহমুদ জানান, নদীর তীরের সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে। যারা উচ্চ আদালতের স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার কাগজপত্র দেখাতে পারবেন, শুধু তাদের ঘরগুলো ভাঙা আপাতত স্থগিত রাখা হবে। সদর উপজেলার সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না করা পর্যন্ত এ অভিযান চলবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ