• বৃহস্পতিবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২১, ০৫:০৭ অপরাহ্ন

জামায়াত-শিবির পুনর্বাসিত হচ্ছে কল্যাণ পার্টিতে

আমার কাগজ প্রতিবেদকঃ / ৪৭ শেয়ার
প্রকাশিত : বৃহস্পতিবার, ৪ নভেম্বর, ২০২১

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি। সম্প্রতি দলটিতে যোগ দিয়েছেন জামায়াত-শিবিরের বেশ কয়েকজন নেতা। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে রাজনৈতিক মহলে। গুঞ্জন চলছে জামায়াত-শিবির পুনর্বাসন নিয়ে। দলটির চেয়ারম্যান বলছেন, চার শর্ত মেনে যে কোনো বাংলাদেশি তার দলে যোগ দিতে পারেন। কল্যাণ পার্টির অগ্রগতিতে অনেকে অসন্তুষ্ট হয়ে রাজনীতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছেন।

সূত্র মতে, নিবন্ধন রয়েছে এমন কয়েকটি রাজনৈতিক দলে নিজেদের কর্মী প্রবেশ করিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল নিয়েছে ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক, নিবন্ধন বাতিল হওয়া দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। উদ্দেশ্য ওই দলগুলোতে জামায়াতের প্রভাববলয় তৈরির পাশাপাশি দলের সমর্থক ও কর্মীবাহিনী রক্ষা করা।

একই সঙ্গে আগামী নির্বাচনে যদি কোনো কারণে জোট না থাকে আর একক নির্বাচন করতে হয়, অথবা বিএনপিকে বাদ রেখে নতুন কোনো রাজনৈতিক বলয় তৈরি করতে হয় তাহলে সেই দলের প্রতীক ব্যবহার করা। আর এই লক্ষ্যেই মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহম্মদ ইবাহিম বীরপ্রতীকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির উপর ভর করেছে তারা।

২০১৩ সালের ১ আগস্ট জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করে অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। দলটির ওপর ঝুলে আছে যুদ্ধাপরাধের দায়ে নিষিদ্ধঘোষিত হওয়ার খড়্গ। জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন আপিল নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে সরকার। দলটির রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে তাদের কর্মকাণ্ড ও নেতৃত্বের ওপর রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং দ্বিতীয় দফা বিচারের দাবি উঠতে পারে। দলের বিপুল সম্পদ বাজেয়াপ্তের আশঙ্কাও জোরালো হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

নিজেদের নিবন্ধন ও প্রতীক না থাকায় গত নির্বাচনে বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করেছে জামায়াত। এ নিয়ে তাদের মাঠ পর্যায়ে আছে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন আছে এমন কোনো দলে নিজেদের নেতাকর্মীদের ঢুকিয়ে দিয়ে সেই রাজনৈতিক দলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই তারা বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টিকে বেছে নিয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। ধারণা করা হচ্ছে, জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের নিজস্ব চিন্তায় গোপন এই পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, জামায়াতের আমির দলের মাঠ পর্যায়ের সাবেক দুই নেতা ও দলের প্রতি আস্থাভাজন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে এই দায়িত্ব দিয়েছেন। জামায়াত আমিরের মনোনীত একজন ক্লিন ইমেজের সাবেক শিবির নেতাকে কল্যাণ পার্টির মহাসচিব বানানোর প্রক্রিয়া নিয়ে তারা দীর্ঘ সময় কাজ করেছে। তারা তাদের সেই প্রক্রিয়া সফল করতে পেরেছে সম্প্রতি।

সম্প্রতি জামায়াত থেকে এবি পার্টির হয়ে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টিতে যোগ দিয়েছেন বেশ কয়েকজন নেতা। তাদের মধ্য থেকেই কল্যাণ পার্টির নতুন মহাসচিব নিযুক্ত হয়েছেন ইংল্যান্ড প্রবাসী সাবেক শিবির নেতা আবদুল আউয়াল মামুন। গত ১৬ সেপ্টেম্বর তাকে এই পদের জন্য মনোনীত করেন দলটির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম। তবে এখনো দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নুরুল কবির ভূঁইয়া পিন্টু। ডিসেম্বরে দলের জাতীয় কাউন্সিলের মধ্য দিয়েই পরিপূর্ণ দায়িত্ব নেবেন সাবেক শিবির নেতা আবদুল আউয়াল মামুন।

সূত্র জানায়, নতুন মহাসচিব আবদুল আউয়াল মামুন গত মাসে যুক্তরাজ্য থেকে ভার্চুয়ালি কল্যাণ পার্টিতে যোগ দেন। এরপর তাকে স্থায়ী কমিটির সদস্য ও মহাসচিবের দায়িত্ব দেন দলের চেয়ারম্যান।

পার্টির একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, গত ১০ ও ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রামে নতুনভাবে বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী যোগ দিয়েছেন দলে। তাদের মধ্যে প্রায় অধিকাংশ সদস্য জামায়াত ও শিবির থেকে আসা। মাঝে তারা কিছুদিনের জন্য এবি পার্টি (আমার বাংলাদেশ পার্টি) ঘুরে এসেছে।

দলের নতুন মহাসচিব আবদুল আউয়াল মামুন ইংল্যান্ডে সপরিবারে বসবাস করছেন। ২০০৬ সালে তিনি দেশটিতে যান। আবদুল আউয়াল মামুন কল্যাণ পার্টিতে যোগদানের আগে ‘জামায়াত-শিবির’ ছেড়ে আসা নেতাকর্মীদের সমন্বয়ে গঠিত আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন অল্প সময়ের জন্য। ২০০৩ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল করা হয়েছিল তাকে।

কল্যাণ পার্টির সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে কাজ করেছে, এমন একাধিক দলের নেতার দাবি, কল্যাণ পার্টির সঙ্গে জামায়াতের বোঝাপড়া চমৎকার। সেক্ষেত্রে আগামী নির্বাচনের আগে জোট ভেঙে গেলে কল্যাণ পার্টিকে সামনে রেখেই নতুন জোট গঠন করতে পারে জামায়াত। অন্যদিকে যদি জোট নাও ভাঙে আর নির্বাচনের সময় বিএনপির ধানের শীষ না পায় তাহলে কল্যাণ পার্টির প্রতীককে কাজে লাগাতে পারে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সংগঠনটি।

বিভিন্ন সূত্রের দাবি, জামায়াতের সঙ্গে কল্যাণ পার্টির রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছে। নানান সুবিধা আদান-প্রদান ও বিএনপি-জোট থেকে শেষমেষ বাদ পড়লে দলটির মার্কা নিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার বিষয়টিও এর মধ্যে রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কল্যাণ পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে অন্তত এক ডজন কেন্দ্রীয় নেতা রয়েছেন যাদের সবাই জামায়াত ও শিবিরের বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন। এর মধ্যে দলটির যুগ্ম মহাসচিব নুরুল আফসার ফেনী জেলা শিবিরের সাবেক সভাপতি, ভাইস চেয়ারম্যান জাকিউল হক জাকি জামায়াতের ঢাকা মহানগরের সাহিত্য বিভাগে এবং ভাইস চেয়ারম্যান আলী হোসেন ফরাজী পল্টন থানা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

সম্প্রতি যোগ দেওয়াদের মধ্যে পার্টির বর্তমান যুগ্ম-মহাসচিব (সমন্বয়কারী) আবদুল্লাহ আল হাসান সাকিব শিবিরের চট্টগ্রাম মহানগর উত্তরের ছাত্র কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পার্টির দায়িত্বশীল এক নেতা দাবি করেন, চট্টগ্রামে ‘হামজা ব্রিডেগ’ নামে একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে আটক হয়েছিলেন তিনি।

দলটির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকা মহানগর উত্তর মহানগর সভাপতি নাজমুল হুদা অপু সিলেট এমসি কলেজ শিবিরের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ভাইস চেয়ারম্যান এমদাদুল হক চৌধুরী সরাসরি জামায়াতের দায়িত্ব পালন না করলেও তিনি জামায়াত সমর্থিত সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবেই পরিচিত। এছাড়া কেন্দ্রীয় কমিটির আরও বেশ কয়েকজন নেতা বিভিন্ন সময় জামায়াত ও শিবিরের দায়িত্বে ছিলেন।

সূত্র জানায়, জামায়াত-শিবির করে এসে কল্যাণ পার্টিতে যোগ দিলেও বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সংগঠন জামায়াতেও ‘রোকন’ হিসেবে রয়েছেন বেশ কয়েকজন। এমনকী জামায়াতে নিয়মিত চাঁদা পরিশোধও করছেন।

কল্যাণ পার্টিতে জামায়াত নেতাদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক বলেন, এটা একান্ত অসাড় বক্তব্য। চার শর্তে আমরা যে কোনো তরুণকে নিতে রাজি। তিনি সৎ চরিত্রের অধিকারী হবেন, বাংলাদেশি প্রজন্ম হবেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ ও লালন করবেন। এসব শর্ত পূরণ করে যে কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টিতে চলে আসতে পারেন।

‘কল্যাণ পার্টির অগ্রগতিতে অনেকে অসন্তুষ্ট এবং বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা থাকে, বৈরিতা থাকে। যাদের নামে মামলা আছে আমরা তাদেরও দলে নিচ্ছি না।’

মামলা থাকা মানেই কি সে অপরাধী- এমন প্রশ্নে সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, না তা নয়, তবে আমরা ক্রিমিনাল মামলা যাদের আছে তাদের নিচ্ছি না। কারণ তখন আবার দোষারোপ করা হবে যে আমরা যাদের নামে মামলা আছে তাদের পুনর্বাসন করছি। এই শঙ্কা থেকে সতর্ক থাকা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ