• বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২, ১০:২৪ অপরাহ্ন

ছয় দফা টাইপ করে দিয়েছিলেন হানিফ : প্রধানমন্ত্রী

আমার কাগজ ডেস্ক: / ২৭ শেয়ার
প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ৭ জুন, ২০২২

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ছয় দফা নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলেন। ছয় দফার প্রণয়ক বঙ্গবন্ধু নিজেই। তিনি তখন আলফা ইন্সুরেন্সে চাকরি করতেন। হানিফ সাহেব তখন বিএ পাস করেছেন। তাঁকে নিয়ে আসেন জাতির পিতা। বঙ্গবন্ধু যখন বলতেন, তখন হানিফ সাহেব ছয় দফা ড্রাফট করতেন। ছয় দফা সম্পর্কে জানলে শুধু জানতেন হানিফ। কারণ, তিনিই এই ছয় দফা বাংলা ও ইংরেজিতে টাইপ করে দিয়েছিলেন।’

আজ মঙ্গলবার ঐতিহাসিক ৬ দফা দিবস উপলক্ষে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আলোচনা সভায় যুক্ত হন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

গ্রামের মানুষ ভালো আছে দাবি করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কয়েকদিন আগে দেখতে পাচ্ছি গার্মেন্ট শ্রমিকরা আন্দোলন করে। আন্দোলন করে কারখানা ও কাজ বন্ধ করে দেয় তাহলে তো চাকরি চলে যাবে।

তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্য রপ্তানির বিষয়ে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কয়েকদিন আগে দেখতে পাচ্ছি গার্মেন্ট শ্রমিকরা আন্দোলন করে। আন্দোলন করে, ঠিক আছে। কিন্তু যেসব দেশ আমাদের তৈরি পোশাক কিনবে। আমরা ভালো সুবিধা পাচ্ছি। উৎপাদন বাড়ছে। এই সমস্ত শ্রমিকদের বেতনতো বন্ধ হয়নি। আমরাতো প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়েছি। ভর্তুকি দিয়ে পোশাক কারখানার শ্রমিকরা যাতে বেতনটা সরাসরি পায়, সেই ব্যবস্থাটা করেছি। সরাসরি ফোনের মাধ্যমে টাকা দিয়েছি। মালিকদের হাতে তো দিইনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আজকে বেতন বাড়া, এটা সেটাসহ নানা ধরনের আন্দোলন করতে যায়। এই রপ্তানি যদি বন্ধ হয়, তাহলে পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। তখন ‘আমও যাবে, ছালাও যাবে’। বেতন আর বাড়বে না, তখন চাকরিই চলে যাবে। ঘরে ফিরে যেতে হবে। তখন কি করবে? যে নেতারা উসকানি দিচ্ছেন। তারা কাদের প্ররোচনায় দিচ্ছেন, তাও ভেবে দেখতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি খুব খোলাখুলি বাস্তব কথাটাই বললাম। কারণ যারা কিনবে ক্রয় ক্ষমতাও নেই। ক্রয় ক্ষমতাও সীমিত হয়ে যাচ্ছে। দিনে দিনে আরও খারাপ হচ্ছে। আমেরিকা, ইউরোপসহ বিভিন্ন জায়গায় জিনিসের দাম বেড়ে গেছে। সেখানে মানুষ দুরাবস্থায় আছে, কত মানুষ না খেয়ে তিন কাটাচ্ছে। সেই তুলনায় বাংলাদেশে সকলের খাদ্য, টিকা, ওষুধসহ সবকিছু দিতে পারছি।

তিনি বলেন, কেউ আশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করলে, আমি বলবো শেষে এ কূল, ও কূল, দু কূল হারাতে হবে। এটাও সবাইকে মনে রাখতে হবে। বাংলাদেশের ইতিহাস আওয়ামী লীগ সরকারের আসার পরেই দেশে স্থিতিশীলতা এসেছে। আজকে আমরা আন্দোলন, সংগ্রাম, জেল-জুলুম যাই ভোগ করি না কেন, দেশে স্থিতিশীলতা আমরাই আনতে পেরেছি। তারপরেও বার বার প্রচেষ্টা, আমাদের সরকারকে উৎখাতই করতে হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে এই প্রথম ২০০৮ সালের নির্বাচনের পরে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত আছে বলেই দেশের উন্নতি হয়েছে।

এ সময় ক্ষমতায় থেকে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের সুযোগ দেওয়ায় জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে বৈশ্বিক মন্দা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে উন্নত দেশগুলোও হিমশিম খাচ্ছে। ইউরোপ ও আমেরিকায় মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে। ওইসব দেশে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘ইংল্যান্ডের মানুষ তিনবেলা খেতো, এখন একবেলা খাবার বাদ দিয়েছে। তাদের সীমিত আকারে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে বলা হয়েছে, ভোজ্যতেল এক লিটারের বেশি কেউ কিনতে পারবে না। এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া আছে।’

তিনি বলেন, বাংলাদেশে ভর্তুকি দিয়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে। আমরা প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়েছি। রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে তুলেছিলাম। সেই টাকা ভেঙে ভেঙে বিদ্যুৎ, গ্যাস, কৃষি ও স্বাস্থ্যের জন্য ভর্তুকি ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছি। কারণ এইভাবে কোন দেশ করেনি।

বিনামূল্যে করোনা টিকা ও করোনা পরীক্ষা করার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারপরেও কেউ যদি গোলমাল করার চেষ্টা করে, তাহলে এই দেশটা একেবারে স্থবির হয়ে যায়, সাধারণ মানুষের কি অবস্থাটা হবে? গ্রামের মানুষের অবস্থা এখনো অনেক ভালো আছে। সেটা যাতে ভালো থাকে, সেইদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিচ্ছি। যে কারণে আমি আহ্বান করেছি, এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে। কারণ বিশ্বব্যাপী খাদ্যাভাব, খাদ্য মন্দা। যেখানে নিজের মাটি আছে, মানুষ আছে, সেখানে ফসল ফলাতে হবে। নিজের খাবারের ব্যবস্থাটা অন্তত আমরা নিজেরা করবো।

সবাইকে মিতব্যয়ী ও খাদ্য অপচয় না করার অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবতো আর সরকার করতে পারবে না। নিজেকেও করতে হবে। এটা আমি আমাদের নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণকে বলবো। আন্দোলন করে যদি কারখানা ও কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয় তাহলে তো চাকরি চলে যাবে। সেটা কিন্তু মাথায় রাখতে হবে। তখন বেতন আর বাড়বে না, বেতনহীন হয়ে যেতে হবে।

ছয় দফা দাবির প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, বিরোধী দলগুলোর একটা গোলটেবিল বৈঠক ডাকা হয়। ওই গোলটেবিল বৈঠকেই তিনি এই ছয় দফা দাবি পেশ করেন। ছয় দফা কে প্রণয়ন করেছে, কে লিখেছে, এটা নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলে। আপনারা জানেন যে ৫৮ সালে জাতির পিতা শেখ মুজিব মার্শাল ল হবার পর গ্রেপ্তার হন। ৭ অক্টোবর মার্শাল ল হয় ১১ অক্টোবর তাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ১২ অক্টোবর তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এরপর তো একটার পর একটা মামলা। প্রায় ১৫টা মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, উচ্চ আদালতে সোহরাওয়ার্দী সাহেব নিজে রিট করেন এবং তারপরে ১৯৫৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু মুক্তি পান। তাঁর রাজনীতি নিষিদ্ধ। ঢাকার বাইরে তিনি যেতে পারবেন না। যেতে গেলে পুলিশ স্টেশনে খবর দিয়ে যেতে হবে, পারমিশন নিয়ে যেতে হবে। এই অবস্থা ছিল। তিনি আলফা ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে চাকরি নেন। এই আলফা ইন্সুরেন্সে তিনি চাকরি নেবার পরেই তখন তাজউদ্দিন সাহেব ফতুল্লাতে একটা চাকরি করতেন। বঙ্গবন্ধু নিজে গাড়ি নিয়ে সেখানে গিয়ে তাজউদ্দিন সাহেবকে নিয়ে আসেন। মোহাম্মদ হানিফ, সে কেবল বিএ পাস করেছে। তাঁকে তার (বঙ্গবন্ধুর) পিএ হিসেবে এই আলফা ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে নিয়ে আসেন।

তিনি বলেন, যখন ছয় দফা প্রণয়ন করেন বঙ্গবন্ধু নিজে এটা বলতেন, লিখতেন এবং হানিফ সেটা টাইপ করতো। কাজেই ছয় দফার মূল প্রণয়ক তিনি নিজেই এবং এটা একমাত্র মোহাম্মদ হানিফ জানতো। কারণ সে এটা ইংরেজি ও বাংলা টাইপ করে ওনার হাতে দেন। তিনি যখন করাচিতে এই ছয় দফা পেশ করতে যান, বিরোধী দলের সম্মেলনে ৫ ফেব্রুয়ারি। সেখানে তাকে তীব্র বাধা দেওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানি নেতাদের পক্ষ থেকে। দুর্ভাগ্যের বিষয় যে আমাদের পূর্ববঙ্গেরও যারা ছিল কিছু বাঙালি তো সব সময় ওই যে দালালি করার একটা অভ্যাস থাকে। তারাও এটা দিতে দেয় না। তখন এই ছয় দফার কিছু দফা ওখানে প্লেস করে দেন। যার ফলে তার জীবনের ওপর হুমকিও আসে। এরপর তিনি যখন ফিরে আসেন এয়ারপোর্টে, প্রথম এই ছয় দফা সম্পর্কে তিনি জানান এখানকার প্রেসকে। পরদিন আবার প্রেস কনফারেন্স করে এটার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে এই ছয় দফা উপস্থাপন করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, আমার মনে হয় পৃথিবীর ইতিহাসে কোথাও পাওয়া যাবে না যে, কোনো একটা দাবি এত অল্প সময়ে এত জনপ্রিয়তা পেতে পারে। কারণ ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি দিলেন। স্বাধীনতার ইতিহাসের কথা বলতে গেলে বলতে হয় ৬১ সালের কথা। ৬১ ও ৬২ সাল এই সময়ে। ৬১ সালে তিনি আমাদের ছাত্র নেতাদের ডেকে তাদেরকে দিয়ে একটা নিউক্লিয়াস ফর্ম করেন। প্রত্যেকটা জেলা ও থানায়। তখন উপজেলা ছিল না, মহকুমা ছিল। সেখানে একেকটা নিউক্লিয়াস ফর্ম করা এবং স্বাধীনতার যে বার্তাটা সেটা মানুষের কাছে পৌছে দেওয়া হয়। কিন্তু সেটা এমনভাবে যাতে মানুষ ধীরে ধীরে প্রস্তুতি নেয়। ছাত্রলীগকে দিয়েই কিন্তু সেটা তিনি শুরু করিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, শেখ ফজলুল হক মনি বিএম কলেজ থেকে পাস করে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়। তাকে দিয়েই কিন্তু এটা শুরু। সেই সময় বোধহয় আরেকজন ছিলেন, সে এখন আমাদের পার্টিতে নেই, অন্য পার্টিতে চলে গেছেন। নামও আমি নিতে চাই না আর। ওগুলো ভুলে গেছে তারা। কিন্তু আসলে এখানে এটা মনি ভাইকে দিয়ে নিউক্লিয়াস ফর্ম করার কথা বলা হয়। আমু ভাই একমাত্র এখানে আছেন। আর লতিফ সিদ্দিকী আছেন। এ রকম কয়েকজন আছে। আর যেগুলো বিএনপিতে গেছে ওই দুর্বৃত্তদের নাম আমি নিতে চাই না। ওগুলো সব বেঈমানি করছে। এইভাবেই কিন্তু সমস্ত বাংলাদেশে ছাত্রলীগকে দিয়ে এটা করানো হয়েছিল। ৬২ সালে একটা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল যে, সশস্ত্র বিপ্লবের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা আনা যায় কি না। কিন্তু সে বিপ্লবটা হয়নি।

আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। সঞ্চালনা করেন প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ