কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে কথিত এক পীরের আস্তানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং পীরকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনার পর রোববার বেলা ১টা পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা হয়নি। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করলেও এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাউকে পুলিশ আটক করতে পারেনি।
গতকাল শনিবার দুপুরে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকায় কথিত পীরের তৈরি করা “কালান্দার বাবা শামিম জাহাঙ্গীর দরবার শরিফ” নামে পরিচিত স্থাপনাটিতে এ হামলার ঘটনা ঘটে।
ঘটনার পর থেকে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ, বিজিবি ও র্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পাশাপাশি স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
নিহত আব্দুর রহমান ওরফে শামীম জাহাঙ্গীর (৬০) ওই দরবার শরিফের প্রধান ছিলেন। হামলায় আরও তিন অনুসারী— খোকন আলী, জামিরুন্নেছা ও জুবায়ের আহত হয়ে দৌলতপুর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল হাসান তুহিন জানান, নিহত শামীমের মুখমণ্ডলে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানেও আঘাত করা হয়েছে।
এ ঘটনায় আজ রোববার দুপুর ১টা পর্যন্ত থানায় কেউ কোনো অভিযোগ দেয়নি। এ ঘটনায় জড়িত কাউকে আটকও করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
নিহতের মরদেহ কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রাখা আছে। বিকেলের মধ্যে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হবে বলে জানিয়েছে পরিবার। ময়নাতদন্ত শেষে আস্তানা-সংলগ্ন পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করার কথা রয়েছে।
নিহত পীরের দাফনের পর পরিবারের পক্ষ থেকে আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পীরের বড় ভাই ফজলুর রহমান।
দৌলতপুর থানার ওসি আরিফুর রহমান জানান, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। এখনো পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি, তবে এলাকায় পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে বলে জানান তিনি।
যেভাবে পীর হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীর
স্থানীয় ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে ঢাকায় উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন। পরে তিনি চাকরি ছেড়ে আধ্যাত্মিক চর্চায় যুক্ত হন। শামীম ২০১৮ সালের দিকে ফিলিপনগর ইউপির দারোগার মোড় এলাকায় পৈতৃক ভিটায় এ আস্তানা গড়ে তোলেন এবং নিজেকে ‘সংস্কারপন্থী ইমাম’ হিসেবে পরিচয় দিতেন।
২০২১ সালে এক শিশুর লাশ বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে দাফনের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তিনি আলোচনায় আসেন। একই বছরের সেপ্টেম্বরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছিল।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন জানান, পুরোনো একটি ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ তাকে উদ্ধার করলেও জনতার তুলনায় পুলিশ সদস্যসংখ্যা কম থাকায় পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তে কাজ চলছে।
জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান জানান, বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। বিজিবির টহলসহ সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ওই বাড়িতেও পুলিশি পাহারা থাকবে। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী দৌলতপুরের লালনশিল্পী বাউল শফি মণ্ডলের গ্রামের বাড়িতেও পুলিশ পাহারা রাখা হয়েছে। বাউল শফি মণ্ডল বর্তমানে ঢাকায় রয়েছেন।
এদিকে শনিবার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে স্থানীয় দৌলতপুর আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চুর মোল্লা গণমাধ্যমকে বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে যে-ই জড়িত থাকুক না কেন, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
