আমার কাগজ ডেস্ক
ভারতীয় সংগীত জগ তের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হলো। সুরের জাদুতে দীর্ঘ আট দশক ধরে কোটি কোটি শ্রোতাকে মোহাবিষ্ট করে রাখা কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আশা ভোঁসলে আর নেই। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।
রবিবার (১২ এপ্রিল) আশা ভোঁসলের ছেলে আনন্দ ভোঁসলে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে বলেন, ‘মা আর নেই। আগামীকাল (সোমবার ১৩ এপ্রিল) বিকেল ৪টায় মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।
গত শনিবার (১১ এপ্রিল) শারীরিক অসুস্থতার কারণে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল এই প্রথিতযশা শিল্পীকে। তার নাতনি জুনাই ভোঁসলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) জানিয়েছিলেন যে, চরম ক্লান্তি এবং বুকে সংক্রমণের কারণে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
‘পিয়া তু আব তো আজা’, ‘কাজরা মহাব্বত ওয়ালা’, ‘রঙ্গিলা রে’ কিংবা ‘দিল চিজ ক্যায়া হ্যায়’—এমন অসংখ্য কালজয়ী গানের কারিগর আশা ভোঁসলে চলতি বছরের ৮ সেপ্টেম্বর ৯৩ বছরে পা দিতেন। তাঁর মৃত্যুতে সংগীত অঙ্গন ও ভক্তদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
১৯৪৩ সালে মারাঠি সিনেমা ‘মাঝা বাল’-এর ‘চালা চালা নব বালা’ গানের মাধ্যমে মাত্র ১০ বছর বয়সে সংগীত যাত্রা শুরু করেন তিনি। শুরুতে ‘ও হাসিনা জুলফনওয়ালি’র মতো চটুল নাচের গানের জন্য পরিচিতি পেলেও, পরবর্তীতে ‘দিল চিজ ক্যায়া হ্যায়’ বা ‘তোরা মন দর্পণ কেহলায়ে’র মতো শাস্ত্রীয় ও গজল ঘরানার গানে নিজের অসামান্য দক্ষতা প্রমাণ করেন।
সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকরের ছোট বোন হওয়া সত্ত্বেও আশা ভোঁসলে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন। লতা-আশার ব্যক্তিগত রেষারেষি নিয়ে মুখরোচক গল্প থাকলেও তারা কখনোই তা স্বীকার করেননি। এক সাক্ষাৎকারে আশা বলেছিলেন, মানুষ আমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করত, কিন্তু রক্ত সব সময় পানির চেয়েও ঘন। অনেক সময় অনুষ্ঠানে কেউ কেউ লতা দিদিকে তোষামোদ করতে আমাকে এড়িয়ে চলতেন। পরে দিদি আর আমি এসব নিয়ে হাসাহাসি করতাম।
পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর ও শেবন্তী মঙ্গেশকর দম্পতির ৫ সন্তানের মধ্যে আশা ছিলেন মেঝ। লতা, মিনা, আশা, ঊষা ও হৃদয়নাথ—সবাই সংগীতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন।
২০২৩ সালে নিজের ৯০তম জন্মদিনেও তিনি দুবাইতে লাইভ কনসার্ট করে চমকে দিয়েছিলেন সবাইকে। তিনি বলতেন, ‘গানই আমার নিঃশ্বাস। গানের মাধ্যমেই আমি সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠি।’ এমনকি ৯১ বছর বয়সেও তিনি ভিকি কৌশলের ভাইরাল গান ‘তওবা তওবা’ গেয়ে এবং নাচের মুদ্রা দেখিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন।
প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতেও পিছিয়ে ছিলেন না তিনি। এক্সে ৪২ লাখ, ইনস্টাগ্রামে ৭ লাখ ৬০ হাজার এবং ফেসবুকে ৮ লাখ ৭০ হাজার অনুসারী ছিল তার। ২০২২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত জ্যাকি শ্রফের ‘লাইফস গুড’ সিনেমায় তার শেষ হিন্দি গান শোনা যায়। এছাড়া সম্প্রতি প্রয়াত স্বামী আর ডি বর্মনের স্মরণে ‘সাইয়াঁ বিনা’ নামে একটি সিঙ্গেল ট্র্যাক মুক্তি দিয়েছিলেন তিনি।
আশা ভোঁসলে ১৯৮১ সালে ‘উমরাও জান’ এবং ১৯৮৮ সালে ‘ইজাজত’ চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। ২০০০ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে’ এবং ২০০৮ সালে ‘পদ্মবিভূষণ’ খেতাবে ভূষিত হন। সম্প্রতি নিজের ব্যক্তিত্বের অধিকার সুরক্ষায় বোম্বে হাইকোর্ট থেকে ঐতিহাসিক এক রায়ও পান তিনি।
পেশাগত জীবনে আকাশছোঁয়া সাফল্য পেলেও ব্যক্তিগত জীবনে তাকে অনেক ঝড় সইতে হয়েছে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে গণপতরাও ভোঁসলের সঙ্গে ঘর ছাড়েন তিনি। সেই সংসারে তার তিন সন্তান হয়। তবে ১৯৬০ সালে বিবাহবিচ্ছেদের পর ১৯৮০ সালে তিনি সুরকার রাহুল দেব (আর ডি) বর্মনকে বিয়ে করেন। জীবনের বড় ধাক্কা আসে যখন ২০১২ সালে মেয়ে বর্ষা আত্মহত্যা করেন এবং ২০১৫ সালে বড় ছেলে হেমন্ত ক্যানসারে মারা যান। তাঁর একমাত্র জীবিত সন্তান মেজ ছেলে আনন্দ ভোঁসলে।
একটি যুগের অবসান হলো ঠিকই, কিন্তু আশা ভোঁসলের কণ্ঠ বেঁচে থাকবে তার রেখে যাওয়া কয়েক হাজার গানের মাঝে।
