• বুধবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২২, ০৭:৪৪ পূর্বাহ্ন

অস্ট্রেলিয়া না নিউজিল্যান্ড, শিরোপা উঠবে কার হাতে?

স্পোর্টস ডেস্ক: / ৩৮ শেয়ার
প্রকাশিত : রবিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২১

বিশ্বকাপ এলেই একটা কমন প্রশ্ন থাকে সবার, এবার চ্যাম্পিয়ন হবে কে? এই প্রশ্নটা শুধু সাধারণ ভক্ত-সমর্থকরাই নন, অনেক বোদ্ধাও করেন। টিভি, পত্রিকা, অনলাই, ইউটিউব- সম্ভাব্য প্রতিটি জায়গায় চলে বিশ্লেষণ, কাটাছেঁড়া। কে কেমন দল গড়েছে, কেমন প্রস্তুতি নিয়েছে- এসবই থাকে সেসব আলোচনার বিষয়বস্তুতে।

স্বাভাবিকভাবেই এবারের বিশ্বকাপের আগেও ছিল সেই আলোচনা। বিশ্বকাপ চলাকালীন আলোচনা চলেছে। থেমে ছিল না। এখনও চলছে। চলবে, আজ (রোববার) রাতে ফাইনাল ম্যাচের শেষ বলটি না হওয়া পর্যন্ত। এরপরই নির্ধারণ হয়ে যাবে, কার হাতে উঠবে টি-টোয়েন্ট বিশ্বকাপের সপ্তম আসরের শিরোপা। আগামী এক বছরের জন্য বিশ্বচ্যাম্পিয়নের তকমা সেঁটে থাকবে কার ওপর?

এবারের বিশ্বকাপের আগে যত আলোচনা-সমালোচনা হয়েছিল, সেখানে কী কেউ জোর দিয়ে অস্ট্রেলিয়া ফেবারিট, বলতে পেরেছিল? প্রশ্নেই আসে না। কীভাবে বলবে? যে দলটি বিশ্বকাপের আগে টানা ৫টি টি-টোয়েন্টি সিরিজে হেরেছিল, তাদের কোন সাহসে ফেবারিটের তালিকায় নিয়ে আসবে কেউ?

টি-টোয়েন্টিতে সাম্প্রতিক ফর্ম (বিশ্বকাপের আগে) যাচ্ছেতাই। বাংলাদেশের কাছে হেরে গেছে ৪-১ ব্যবধানে। তার আগে হেরেছে ওয়েস্ট ইন্ডিহের কাছে। বাংলাদেশ সফরে দলের সবাই ছিলেন না। কিন্তু অনেকেই তো ছিলেন! সেই ওয়েড, জাম্পা, স্টয়নিজ, স্টার্ক, হ্যাজেলউড, মার্শ- সবাই তো বাংলাদেশ সফরে খেলে গেছেন।

সেই দলটি বিশ্বকাপে এসে নিজেদের খোলনলচে পুরোপুরি বদলে ফেলতে পারবে, তা কে ভেবেছিল? এক ডেভিড ওয়ার্নারের কথাই ধরুন না। সর্বশেষ আইপিএলে বাজে ফর্মের জন্য তাকে একাদশ থেকে বাদ দিয়েছিল সানরাইজার্স হায়দরাবাদ। যে কারণে ব্রেট লি পর্যন্ত হায়দরাবাদের সমালোচনা করেছিলেন। বলেছিলেন, ওয়ার্নার এবং অস্ট্রেলিয়া দলের জন্য এটা খুব খারাপ হবে।

সেই ওয়ার্নার কীভাবে নিজেকে ফিরে পেলেন বিশ্বকাপে! কী অসাধারণ ব্যাটিং করছেন! দুটি হাফ সেঞ্চুরি করেছেন। শুধু তাই নয়, পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলেছেন ঝড়ো (৩০ বলে) ৪৯ রানের ইনিংস।

বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জয় দিয়ে অভিযান শুরু। পরের ম্যাচ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। যদিও তৃতীয় ম্যাচে গিয়ে হেরে গেছে ইংল্যান্ডের কাছে। এই একটি ম্যাচ হেরে হতাশায় ভেঙে পড়েছিলেন অসিরা। নিজেদের মধ্যে কী দারুণ স্পিরিট তৈরি হলে এমন হতাশায় ভেঙে পড়তে পারে?

অধিনায়ক অ্যারোন ফিঞ্চ জানিয়েছেন, ‘ইংল্যান্ডের কাছে হারের পর আমরা হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। তবে কয়েক দিনের গ্যাপটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমরা সে সময়ে আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম।’

সেই দলটি বাংলাদেশকে পেয়ে নিজেদের সব ক্ষোভ যেন ঢেলে দিলো। ৭৩ রানে অলআউট করে দিয়ে জিতেছে ৩৮ বলে (৮২ বল হাতে রেখে) ৮ উইকেটের ব্যবধানে। বড় ব্যবধানে ওই জয়টাই অস্ট্রেলিয়াকে সেমিতে তুলে দিয়েছিল। না হয়, রান রেটে পিছিয়ে পড়ে বিদায় নিতে হতো, দক্ষিণ আফ্রিকা উঠে যেতো। কিন্তু প্রোটিয়াদের এই ভাগ্যবরণ করতে হয়েছে শেষ পর্যন্ত।

সেমিতে প্রতিপক্ষ বিশ্বকাপে উড়তে থাকা পাকিস্তান। কিন্তু ভাগ্য সঙ্গে থাকলে যা হয় আরকি। টস ভাগ্যটা জিতলেন অসি অধিনায়ক ফিঞ্চ। আর যায় কোথায়, চোখ বন্ধ করে ফিল্ডিং। ব্যাট করতে নেমে পাকিস্তান ১৭৬ রান করলো। যদিও শেষ মুহূর্তে অসি বোলারদের দৃঢ়তায় অন্তত ২০ রান কম করতে পেরেছে পাকিস্তান।

জবাবে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ওভারে শাহিন শাহ আফ্রিদির এক একটি আগুনের গোলা মোকাবেলা করতে হয়েছে যেন। এরপরই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে। শেষ মুহূর্তের ইতিহাস তো সবার জানা। ম্যাথ্যু ওয়েড সেই শাহিন আফ্রিদিকেই টানা তিনটি ছক্কা মেরে অস্ট্রেলিয়াকে তুলে দিলেন ফাইনালে।

২০১০ সালেও অস্ট্রেলিয়া ফাইনালে উঠেছিল। কিন্তু সেবার ইংল্যান্ডের কাছে হেরে শিরোপা জেতা হয়নি অসিদের। ওয়ানডে বিশ্বকাপ জিতেছে সর্বোচ্চ ৫বার। কিন্তু এখনও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতা হয়নি অস্ট্রেলিয়ার। দ্বিতীয়বার সুযোগ পেয়ে সে আক্ষেপ কী ঘোচাতে পারবে অ্যারোন ফিঞ্চের দল?

অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয়বার ফাইনাল হলেও নিউজিল্যান্ড তো এবারই প্রথম উঠলো ফাইনালে। ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপের পর এ নিয়ে চারটি আইসিসি ইভেন্টের ফাইনাল খেলছে নিউজিল্যান্ড। এর মধ্যে চলতি বছর আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছে তারা। এর আগে ২০১৫ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার কাছেই হেরেছিল কিউইরা। আর ২০১৯ বিশ্বকাপে সুপার ওভারের নাটকীয়তায় ইংল্যান্ডের কাছে শিরোপা হারাতে হয় তাদের।

এবার আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে। এবার কী তবে কিউইদের ভাগ্যের সিকে ছিঁড়বে? অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসন সে লক্ষ্যেই বলে দিয়েছেন, ‘আমরা নিজেদের সেরা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটটাই উপহার দিতে চাই।’ আর কে না জানে, নিউজিল্যান্ড যদি দিনটা নিজেদের বানিয়ে নিতে পারে, তাহলে সেটা অন্য কারো হওয়া একেবারেই অসম্ভব।

বিশ্বকাপের আগে কেউ কেউ কিউইদের ফেবারিটের তালিকায় রেখেছিলো। তবে গ্রুপে যেহেতু ভারত এবং পকিস্তান ছিল, সে ক্ষেত্রে তাদের ব্যাপারে সন্দেহও ছিল কারো কারো। আবার পাকিস্তানের কাছে হার দিয়ে নিউজিল্যান্ডের বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হওয়ায় অনেকের মধ্যে সে শঙ্কাটা মাথাছাড়া দিয়ে ওঠে।

কিন্তু পরের ম্যাচেই ভারতকে হারিয়ে দিয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে নেয় নিউজিল্যান্ড। গ্রুপের বাকি তিন সহজ প্রতিপক্ষ আফগানিস্তান, স্কটল্যান্ড এবং নামিবিয়াকে হারিয়ে সেমিফাইনালে নাম লিখে কিউইরা। বিদায় নেয় ভারত। সেমিতে মুখোমুখি উড়তে থাকা আরেক দল ইংল্যান্ডের।

কিন্তু এখানে টসভাগ্যটা গেলো উইলিয়ামসনের পক্ষে। চোখ বন্ধ করে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত। ১৬৬ রান করে ইংল্যান্ড। জবাব দিতে নেমে শুরুতে মন্থর গতির ব্যাটিং করলেও শেষ মুহূর্তে মাঠে নেমে মাত্র ১১ বল খেলে ম্যাচের চিত্র বদলে দেন জিমি নিশাম। পরের কাজটুকু সারেন ড্যারিল মিচেল। ১ ওভার বাকি থাকতেই ম্যাচ জিতে ফাইনালে জয়গা করে নেয় কিউইরা।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিউজিল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া মোট ১বারই মুখোমুখি হয়েছিল। ২০১৬ সালে ভারতের ধর্মশালায় ওই ম্যাচে নিউজিল্যান্ড জিতেছিল ৮ রানে। এ ক্ষেত্রে কিউইরা এগিয়ে থাকলেও মোট টি-টোয়েন্টিতে ১৪ বার মুখোমুখি হয়ে ৯বারই হেরেছে নিউজিল্যান্ড। জিতেছে কেবল ৫টিতে। একটি হয়েছিল টাই।

তবে, দুই দলেরই ক্রিকেটাররা রয়েছেন দারুণ ফর্মে। নিউজিল্যান্ডের জন্য যদিও বড় দুঃসংবাদ হচ্ছে ব্যাটিংয়ে অন্যতম নির্ভরতার প্রতীক ডেভন কনওয়ে দুর্ভাগ্যজনক ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়েছেন। ফাইনাল খেলতে পারবেন না তিনি। তবে, মার্টিন গাপটিল, ড্যারিল মিচেল, কেন উইলিয়ামসন, গ্লেন ফিলিপস, জিমি নিশাম, ইশ শোধি কিংবা মিচেল সান্তনার- ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারেন যে কেউ, যে কোনো মুহূর্তে।

বোলার ট্রেন্ট বোল্ট, টিম সাউদি, সান্তনার, শোধি কিংবা অ্যাডাম মিলনেরা আবার যে কারো ইনিংসকে গুঁড়িয়ে দেয়ার সামর্থ্য রাখেন। কিন্তু কম যান না অসি ব্যাটাররাও। অ্যারোন ফিঞ্চ আর ডেভিড ওয়ার্নার দিয়ে শুরু। দুর্ধর্ষ ওপেনিং জুটি হতে পারে তারা নিজেদের দিনে। এরপর মিচেল মার্শ, স্টিভেন স্মিথ, মার্কাস স্টয়নিজ, ম্যাথ্যু ওয়েড, গ্লেন ম্যাক্সওয়েল- এক একজন টি-টোয়েন্টির জায়ান্ট। যে কোনো একজনই ম্যাচের চিত্র পাল্টে দিতে পারেন।

সঙ্গে রয়েছেন মিচেল স্টার্ক, জস হ্যাজেলউড, অ্যাস্টন অ্যাগার, অ্যাডাম জাম্পা, মিচেল মার্শ- যে কোনো ব্যাটিং শক্তিতে থামিয়ে দিতে সক্ষম।

সুতরাং, টি-টোয়েন্টির ফাইনালে যে ব্যাটে-বলের দারুণ একটি লড়াই হতে যাচ্ছে, তা চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায়। আপাতত সেই লড়াই দেখার অপেক্ষায়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ